আন্তর্জাতিক বর্জ্য শূন্য দিবস ও বর্জ্য সংকটে হিমালয়

সুফল তর্কলঙ্কার: আজ ৩০ মার্চ। আজকের দিনটি সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শূন্য বর্জ্য দিবস। এই দিনটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর সংকটের প্রতি সতর্কবার্তা। বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলির মধ্যে একটি হল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য, খাদ্যবর্জ্য এবং শিল্পবর্জ্য আমাদের পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছে। শহর হোক বা গ্রাম—কোথাও এই সমস্যার বাইরে নয়। নদী ভরাট হচ্ছে আবর্জনায়, সমুদ্র প্লাস্টিকের স্তূপে পরিণত হচ্ছে, আর বাতাসে মিশছে বিষাক্ত গ্যাস।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল, এই সংকটের মূল কারণ আমরা নিজেরাই। উন্নয়ন, ভোগবাদ এবং অযৌক্তিক ব্যবহার আমাদের এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে আমরা নিজের অজান্তেই নিজেদের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করছি। আমরা যত আধুনিক হচ্ছি, ততই প্রকৃতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছি। আর প্রকৃতি তার প্রতিক্রিয়াও দেখাচ্ছে—অস্বাভাবিক আবহাওয়া, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ—সবই তারই বহিঃপ্রকাশ।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত অঞ্চল হিসেবে হিমালয় শুধু কয়েকটি দেশের নয়, প্রায় দুই বিলিয়নেরও বেশি মানুষের জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। এই পর্বতমালা থেকেই উৎপন্ন হয় গঙ্গা সহ বহু প্রধান নদী। কিন্তু সাম্প্রতিককালে পর্যটন, ট্রেকিং এবং বাণিজ্যিক কার্যকলাপের বৃদ্ধির ফলে এখানে বর্জ্যের পরিমাণ যে হারে বেড়ে চলেছে তা ভয়ঙ্কর ও উদ্বেগজনক। বিশেষ করে মাউন্ট এভারেস্টের মতো জনপ্রিয় অভিযাত্রিক গন্তব্য এখন “বিশ্বের সর্বোচ্চ আবর্জনার স্তূপ” হিসেবেও পরিচিত হতে শুরু করেছে। পর্বতারোহীদের ফেলে যাওয়া খালিঅক্সিজেন সিলিন্ডার, প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট এবং অন্যান্য বর্জ্য আজ মাউন্ট এভারেস্টের মাথায় এনে দিয়েছে নতুন শিরোপা “বিশ্বের সর্বোচ্চ আবর্জনার স্তূপ”। বরফের নিচে জমে ওঠা বিপুল পরিমাণ আবর্জনার স্তুপ বরফ গলতে শুরু করায় এখন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে, যা পরিবেশবিদদের কাছে গভীর উদ্বেগের বিষয়। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক শূন্য বর্জ্য দিবসের তাৎপর্য আরও গভীর হয়ে ওঠে।

 

২০২২ সালে ইউনাইটেড নেশনস এই দিনটি ঘোষণা করে, যার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল বর্জ্য হ্রাস এবং টেকসই জীবনযাত্রা গড়ে তোলা। হিমালয়ের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে এই বার্তা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ এখানে সামান্য দূষণও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হতে পারে। পরিবেশবিদদের মতে, হিমালয়ের এই বর্জ্য সংকট শুধুমাত্র স্থানীয় সমস্যা নয়, কারণ, এখানে জমে থাকা বর্জ্য নদীর মাধ্যমে নীচের সমতলে ছড়িয়ে পড়ে, যা জল দূষণ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে এর সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক ও অন্যান্য অজৈব বর্জ্য মাটির গুণগত মান নষ্ট করছে এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের উপর তার খারাপ প্রভাব পড়ছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। নেপাল ও ভারতের বিভিন্ন সংস্থা পর্বতারোহীদের জন্য ‘ক্যারি-ব্যাক’ নীতি চালু করেছে, যেখানে প্রত্যেক অভিযাত্রীকে নিজের বর্জ্য নিজেকেই নিচে নিয়ে আসতে হয়। এছাড়াও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলি নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাচ্ছে এবং পর্যটকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কাজেই হিমালয়কে রক্ষা করতে হলে ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধের সঙ্গে প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ।

আন্তর্জাতিক শূন্য বর্জ্য দিবসে আমাদের ভাবা উচিত, পৃথিবীটা শুধু আমাদের নয়, আগামী প্রজন্মেরও। তাই এখনও সময় আছে, অভ্যাস বদলে প্রকৃতির সঙ্গে এক সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলার। না হলে সেই দিন আর বেশি দূরে নেই যখন আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হব, যেখান থেকে ফেরার পথ আর থাকবে না।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Powered by Joinchat