বৃষ্টির বাধা উপেক্ষা করেও জমজমাট বসন্ত উত্‍সব

নিজস্ব সংবাদদাতা, হুগলি: বসন্তের শেষ প্রহরে রবিবাসরীয় এক স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় হুগলি জেলার প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত শহর বৈদ্যবাটি-র বাদামতলা দুর্গোৎসব প্রাঙ্গণ যেন আবারও নতুন প্রাণ ফিরে পেল। ঋতুর শেষ বাসন্তী আবেশ, প্রকৃতির নবীনতার আহ্বান এবং শিল্প-সংস্কৃতির রঙিন মেলবন্ধনে সেখানে আয়োজিত হল এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান— বসন্ত উৎসব। আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘চুঁচুড়া অর্বাক’-এর কর্ণধার বিশিষ্ট আবৃত্তিকার পিয়ালী ঘোষ-এর আন্তরিক উদ্যোগ ও পরিকল্পনায় এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

সন্ধ্যার শুরুতেই উপস্থিত দর্শক, অতিথি ও শিল্পীদের উষ্ণ অভ্যর্থনার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। প্রাঙ্গণজুড়ে ছিল বসন্তের আবহ, সাংস্কৃতিক আবেশে ভরা এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। প্রকৃতির নবজাগরণ ও মানবমনের রঙিন অনুভূতিকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছিল অনুষ্ঠানের প্রতিটি পর্ব। কবিতা আবৃত্তি, সঙ্গীত এবং নৃত্য—এই তিন ধারার শিল্প একত্রে মিলিত হয়ে সন্ধ্যাকে করে তোলে সুরেলা ও বর্ণময়।

 

আবৃত্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘চুঁচুড়া অর্বাক’-এর শিল্পীরা তাঁদের অনবদ্য আবৃত্তির মাধ্যমে তুলে ধরেন বসন্ত, প্রকৃতি ও মানুষের অন্তর্জগতের নানা আবেগ-অনুভূতির রূপ। কবিতার প্রতিটি শব্দে ফুটে ওঠে ঋতুর রূপান্তর, নতুন জীবনের আহ্বান এবং জীবনচক্রের সজীব ছন্দ। দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন এই আবৃত্তি পরিবেশনা, যা সন্ধ্যার আবহকে আরও গভীর ও হৃদয়স্পর্শী করে তোলে।

অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল কবি রামচন্দ্র পাল-এর উপস্থিতি এবং তাঁর নিজস্ব কণ্ঠে কবিতা পাঠ। তাঁর কাব্যপাঠে ধরা পড়ে বসন্তের সজীবতা, মানুষের অন্তর্লোকের বেদনাবোধ ও আশার আলো। উপস্থিত দর্শকরা তাঁর কবিতার আবৃত্তিতে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হন।

এছাড়াও সন্ধ্যার আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ ছিল ধ্রুপদী নৃত্যশিল্পী মৌসুমী শীল-এর পরিচালনায় ‘গান্ধর্বী’-র শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনা। তাঁদের সাবলীল ভঙ্গিমা, নৃত্যের ছন্দ এবং অভিব্যক্তির মাধ্যমে বসন্তের সৌন্দর্য যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে মঞ্চে। সঙ্গীত ও নৃত্যের মেলবন্ধনে সেই পরিবেশনা দর্শকদের হৃদয়ে বিশেষ ছাপ ফেলে।

তবে প্রকৃতির নিজস্ব রুদ্ররূপও এদিন উপস্থিত সকলের পরীক্ষা নিয়েছিল। অনুষ্ঠান চলাকালীন হঠাৎই শুরু হয় অঝোর বৃষ্টি। কিন্তু সেই বৃষ্টিও দমাতে পারেনি উপস্থিত শিল্পী ও দর্শকদের উৎসাহ। ঝরঝর বর্ষণের মধ্যেও অর্বাক-এর সদস্য, শিল্পী এবং দর্শকরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আবহে মগ্ন ছিলেন। বৃষ্টিকে উপেক্ষা করেই আবৃত্তি, সঙ্গীত ও নৃত্যের ধারাবাহিক পরিবেশনা চলতে থাকে, যা অনুষ্ঠানের প্রতি সকলের গভীর ভালোবাসা ও নিষ্ঠারই পরিচয় বহন করে।

এই বাসন্তিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এলাকার বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাহিত্যপ্রেমী ও শিল্পমনস্ক মানুষজন। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানের মর্যাদা ও গুরুত্বকে আরও বৃদ্ধি করে। দর্শকদের উচ্ছ্বসিত অংশগ্রহণ এবং আন্তরিক সমর্থন প্রমাণ করে যে, বর্তমান সময়েও এই ধরনের সাংস্কৃতিক উদ্যোগ মানুষের মনে গভীরভাবে স্থান করে নিতে সক্ষম। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে, বৃষ্টি থেমে গেলে যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় উৎসবের মাঠ। অর্বাক-এর সকল সদস্য-সদস্যারা তখন বসন্তের রঙে নিজেদের রাঙিয়ে নিয়ে মেতে ওঠেন সমবেত নৃত্যে। হাসি, আনন্দ ও উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে বাদামতলা দুর্গোৎসব প্রাঙ্গণ। সেই সমবেত নৃত্য যেন ছিল বসন্তকে বিদায় জানানোর এক আনন্দমুখর মুহূর্ত।

সব মিলিয়ে বাদামতলা দুর্গোৎসব প্রাঙ্গণের সেই রবিবাসরীয় সন্ধ্যা হয়ে উঠেছিল এক স্মরণীয় সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্র। বসন্তের শেষ লগ্নে এমন এক সুরভিত, সৃজনমুখর সন্ধ্যা উপস্থিত সকলের মনে দীর্ঘদিন ধরে অমলিন স্মৃতি হয়ে থাকবে—যেখানে প্রকৃতি, কবিতা, সুর ও নৃত্য একসূত্রে গেঁথে তৈরি করেছিল এক অপূর্ব সাংস্কৃতিক আবহ।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading