অসম্পূর্ণ বুনন

 

জীবনের এক কঠোর অথচ সত্যের অনুসন্ধানে সত্যি অথচ কাল্পনিক গল্পের বুননে আত্রেয়ী দো

জীবন আসলে একফালি সাদা কাপড়। কেউ রঙিন সুতোয় বুনে সেটাকে সুন্দর করে সাজিয়ে তোলে, কেউ আবার কালো রঙ ছিটিয়ে দিয়ে চলে যায়। আমাদের জীবনে ভালোবাসার রঙ থাকলেও বেশিরভাগই সেটা অসম্পূর্ণ, একতরফা। কিন্তু এই বুননটাই আমাদের বাঁচতে শেখায়।

মুর্শিদাবাদ জেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম ভগবানগোলা। তারই এক প্রান্তে অপর্ণা তার একমাত্র অবলম্বন ,তার মেয়ে ছোট্ট রানীকে নিয়ে থাকে। ছোট্ট একটা এক কামরার ঘর, ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন, কিছু সুখের স্মৃতি নিয়েই অপর্ণা প্রতিদিনের জীবনযুদ্ধে লড়াই করে চলেছে। ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে অনাথ অপর্ণা মানুষ হয় তার মামার বাড়িতে। টানাটানির  সংসারে উড়ে এসে জুড়ে বসায় খুব স্বাভাবিকভাবেই মামীর বিষ নজরে পরে অপর্ণা। অষ্টম শ্রেণীতে পড়তেই পড়াশোনায় ইতি টানতে হয়।

অপর্ণার বরাবরই সেলাইয়ের প্রতি আগ্রহ ছিল। নিজের ভালো লাগার তাগিদেই ছুটে যেত স্কুলের সেলাই দিদিমনির কাছে। এমনকি স্কুলের পাট মিটে যাবার পরেও দিদিমনির সাথে তার যোগাযোগ একটুও কমেনি বরং তার সমস্ত দিনের ক্লান্তি, মন খারাপ দূর করতে যেন ওই সেলাই ছিল এক টুকরো মুক্ত বাতাস। ছোটোবেলার অপর্ণা অপটু হাতেই রংবাহারি সুতো দিয়ে বুনে তুলতো নিজের কল্পনার জগত।

১৮ বছরে পা দিতে না দিতেই বাড়ি থেকে দেখাশোনা করে অপর্ণার বিয়ে হয়ে যায়। স্বামীর নাম বিজয়। শহরের এক ছোট খাটো কোম্পানিতে চাকরি করত বিজয়। সংসারে অভাব থাকলেও সুখ ছিল অফুরান। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় অপর্ণার কোল জুড়ে আসে ছোট্ট রানী। অপর্ণার সেই ছোট্ট সংসার যেন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। সুখ বলতে কী বোঝায় তা যেন অপর্ণা এতদিনে উপলব্ধি করতে পারল। তবে ওই যে কথায় আছে না সুখের সময় ক্ষণস্থায়ী। এক পথ দুর্ঘটনায় মারা যায় বিজয়। ভেঙে যায় সুখের স্বপ্ন , শুরু হয় এক নতুন যুদ্ধ। দুই বছরের ছোট্ট রানীকে নিয়ে শুরু হয় অপর্ণার নতুন করে পথ চলা।

স্বামী মারা যাওয়ার পর শ্বশুর বাড়িতে ঠাঁই হয়নি অপর্ণার। ছোট্ট রানীকে কোলে নিয়ে মামা মামীর কাছে ফিরে আসলে, কিছুদিন পর থেকে মামীর গঞ্জনা তার নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠে। এর মাঝে হঠাৎই একদিন অপর্ণার মামা মারা যান। মামা-মামী নিঃসন্তান হওয়ায় সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে অপর্ণার ঘাড়ে। নিজের ছোট্ট মেয়েকে সামলে সংসার কিভাবে চালাবে সে চিন্তায় উদগ্রীব হয়ে ওঠে অপর্ণা।

বেশিদূর পড়াশোনা এগোয়নি ,তাই চাকরির চেষ্টা করা বৃথা । অপর্ণা ছুটে যায় তার সেই ছোট্টবেলার স্কুলের সেলাই দিদিমণির কাছে। দিদিমণি বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের কথা বলেন। তার পরামর্শে অপর্ণা ব্লকের ‘শিশু ও মহিলা উন্নয়ন’ দপ্তরের অন্তর্ভুক্ত একটি স্ব-নির্ভরতা প্রকল্পে সেলাই শেখার কোর্স করে। নিজের দক্ষতায় এবং পরিশ্রমে কোর্স শেষ করার কিছুদিনের মধ্যেই ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ প্রকল্পে সেলাই প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যায় অপর্ণা।

ছয় বছর বয়স হলে গ্রামেরই এক প্রাথমিক স্কুলে ছোট্ট রানীকে ভর্তি করে দেয় অপর্ণা। রানী ছোট থেকেই ভীষন মেধাবী এবং পরিশ্রমী। রানীর সূত্র ধরেই অপর্ণার সাথে আলাপ হয় রক্তিমের। রক্তিম ছিল সেই প্রাথমিক স্কুলেরই শিক্ষক। রানীর মুখে তার মায়ের সংগ্রামের কথা শুনে রক্তিম মনে মনে অপর্ণাকে শ্রদ্ধা করতে শুরু করে। একদিন রানীর অসুস্থতায় তার খোঁজ নিতে বাড়িতে গিয়ে রক্তিম দেখে একচিলতে ঘরে কয়েকটা মেয়ে বসে মেশিন চালাচ্ছে, অপর্ণা তাঁদের শেখাচ্ছে। তাঁর চোখে ক্লান্তি থাকলেও মুখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা ।সেই দৃশ্য রক্তিমের মনে গেঁথে গেল। দিন যেতে লাগল। রক্তিম প্রায়ই রানীর খোঁজখবর নিত, অপর্ণার পাশে দাঁড়াত নানা কাজে। ধীরে ধীরে রক্তিম আর অপর্ণার মধ্যে মিস্টি বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তবে গ্রামের লোকজনের কাছে অপর্ণা আর রক্তিমের বন্ধুত্ব মুখরোচক গল্প হয়ে ওঠে।

রক্তিম ব্যাপারটা গায়ে না মাখলেও অপর্ণা বোঝে , এই বন্ধুত্বের ইতি টানতে হবে। ছোট্ট মেয়েটাকে মানুষের মতো মানুষ করতে হবে। আরও পাঁচটা মেয়েকে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের নিজের পরিচয় তৈরি করাটা ভীষন জরুরী। ধীরে ধীরে অপর্ণা সরে আসে রক্তিমের থেকে। রক্তিম বুঝল—অপর্ণার চোখে সে কেবল একজন শ্রদ্ধার মানুষ, ভালো বন্ধু,এর বেশি কিছু নয়। অপর্ণার সমগ্র পৃথিবীজুড়ে আছে শুধু তার মেয়ে আর জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। নতুন করে প্রেম নিয়ে ভাবার জায়গা সেখানে নেই। নিজের অজান্তেই রক্তিমের মনে জন্ম নেয় নিঃশব্দ,নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। রানীর সরল কথাগুলো রক্তিমের বুকে বাজতো—“স্যার, মা আপনাকে খুব মানে। আপনি থাকলে মা হাসে।”

রক্তিম তখন অপর্ণাকে দেখত দূর থেকে, আর মনে মনে ভাবতো—“তোমার জীবনের গল্পে হয়তো আমার নাম লেখা থাকবে না, তবু আমি তোমার প্রতিটি যন্ত্রণার পৃষ্ঠা পড়ে যাব নীরবে। তোমার লড়াইয়ে পাশে থাকা, তোমাকে সম্মান করা—এইটুকুই হয়তো আমার ভালোবাসার পূর্ণতা।”

সরকারি প্রকল্পের শিক্ষকতার পাশাপাশি ,অপর্ণা নিজের একটা সেলাই স্কুল খুলেছে। সেখানে গ্রামের বহু মেয়ে, বউরা সেলাই শিখতে আসে। অপর্ণার সেলাইকেন্দ্র আজ গ্রামের অনেক মেয়েকে স্বনির্ভর করেছে। রানী এখন ৭ বছরের, অপর্ণার লড়াই আরও শক্তিশালী হচ্ছে। অপর্ণার মামীও এখন তার নিজের ভুল বুঝে অপর্ণার পাশে দাঁড়িয়েছে। আর রক্তিম?সে দাঁড়িয়ে ছিল আড়ালে—একতরফা প্রেমিক, নিঃশব্দ সহযোদ্ধা হয়ে।

অপর্ণার জীবনে প্রেমের নতুন অধ্যায় হয়তো আসবে না, কিন্তু তাঁর সংগ্রামের গল্পে রক্তিমের নীরব ভালোবাসা এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা রয়ে যাবে।

বছর দশেক পরে,এক সন্ধ্যায় বাড়ির উঠোনে বসে অপর্ণা সেলাই করছিল। পাশে বই নিয়ে পড়ছিল রানী। রানী এখন প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। হাওয়ায় শিউলি ফুলের গন্ধ ভেসে আসছিল। হঠাৎ দূর থেকে রক্তিমকে দেখা গেল—নিজের স্ত্রী,সন্তানের হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখে অপর্ণার বুকটা হাহাকার করে উঠল।

মুহূর্তের জন্য মনে হলো, তার হৃদয়ের একফালি অংশ যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। চোখ মুছে, মেয়ের দিকে তাকাল অপর্ণা। রানীর চোখে একরাশ ভরসা। অপর্ণা আস্তে করে বলল—“রানী, মনে রেখো—জীবনে ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে পাওয়া নয়। ভালোবাসা মানে সাহস, শক্তি, আর নিজের পথ খুঁজে নেওয়া। আমার ভালোবাসা হয়তো একতরফা, অপূর্ণ—কিন্তু এই অপূর্ণতাই আমায় সম্পূর্ণ করেছে।”

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading