তারকেশ্বর, শ্রাবণে ভক্তির তীর্থ, শিবের নিত্য আবাহন

আত্রেয়ী দো: আজ শ্রাবণ মাসের প্রথম সোমবার। রাস্তায় বেরোলেই চারিদিক মুখরিত “ভোলে বোম, তারক বোম” কিংবা “ভোলে বাবা পার করেগা” ইত্যাদি ধ্বনিতে।  আমি সিঙ্গুরের বাসিন্দা। ছোট থেকেই দেখতাম, শ্রাবণ মাসের সোমবারগুলোতে স্কুল ছুটি থাকতো। থাকবে নাই বা কেনো,এই সময়টাতে রাস্তা পারাপার করা বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তবে দলে দলে ভক্তরা যখন কাঁধে বাঁক নিয়ে শিবের মন্ত্রধ্বনি দিতে দিতে বা বিভিন্ন মজার ছড়া কেটে তারকেশ্বরে বাবার মাথায় জল ঢালতে যেতো, তখন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। এখনো একই রকম মুগ্ধ হয়েই তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, সত্যিই যেন স্বয়ং মহাদেব এনাদের সহায়, নইলে উপবাস করে এতখানি পথ পায়ে হেঁটে যাওয়া কম কথা নয়। শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউই পিছিয়ে নেই এই তীর্থযাত্রায়।

পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ছোট্ট শহর তারকেশ্বর। শ্রাবণ এলেই এই ছোট্ট শহরটি রূপ নেয় ভক্তির মহাসমুদ্রে। শহর জুড়ে শোনা যায় “ভোলে বোম”,“হর হর মহাদেব” ধ্বনি। হাজার হাজার পুণ্যার্থী বাঁকে করে গঙ্গাজল কাঁধে নিয়ে আসে—শিবলিঙ্গে জলাঞ্জলি দিতে। শ্রাবণ মাস, তারকেশ্বর মন্দির আর মহাদেব—এই ত্রয়ী যেন পরস্পরের সঙ্গে অটুটভাবে জড়িয়ে।

তারকেশ্বর শিবমন্দির: ইতিহাস ও ঐতিহ্য

তারকেশ্বর মন্দিরের ইতিহাস জড়িয়ে আছে ১৭৩২ সালের আশেপাশের সময়ে। কথিত আছে, এক সাধু স্বপ্নাদেশে এক পবিত্র শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ পান। পরবর্তীকালে জমিদার রামচন্দ্র চৌধুরী সেই স্থানেই একটি স্থায়ী শিবমন্দির নির্মাণ করেন। মন্দিরে অধিষ্ঠিত শিবলিঙ্গটির নাম “তারকনাথ”।

মন্দিরের মূল গর্ভগৃহে বিরাজ করছেন শ্রী তারকনাথ—মহাদেবেরই এক বিশেষ রূপ। এই ‘তারক’ শব্দের অর্থ – যিনি সংসার সাগর থেকে পার করে দেন। মন্দিরটি নাগর শৈলীর স্থাপত্যে নির্মিত, যার প্রধান শিখর (চূড়া) দেখে আজও স্থাপত্যবিদরা মুগ্ধ হন। আশেপাশে রয়েছে নাটমন্দির, স্নানঘাট এবং সাধুদের আশ্রম। সব মিলিয়ে এক ঐতিহাসিক সৌন্দর্য। বহু সাধু-সন্ন্যাসী এখানে বাস করেন, আশ্রম চালান।

শ্রাবণ মাসের তাৎপর্য

শ্রাবণ মাস (জুলাই-আগস্ট) শিবের অন্যতম প্রিয় মাস। পুরাণ মতে, এই সময়েই সমুদ্র মন্থনে উঠে আসে হলাহল বিষ, যা ভোলেনাথ নিজের কণ্ঠে ধারণ করে হয়ে ওঠেন নীলকন্ঠ এবং সমগ্র বিশ্বকে বিষের প্রভাব থেকে রক্ষা করেন। সেই জন্য এই মাসে তাঁকে ঠান্ডা রাখার জন্য গঙ্গাজল, দুধ, বেলপাতা, ধুতুরা, ভাঙ দিয়ে পূজা করা হয়। বিশেষ করে “শ্রাবণ সোম”—সোমবারগুলিকে শিবের উদ্দেশ্যে উপবাস, ব্রত ও আরাধনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।

কাওড়িয়া ভক্তদের যাত্রা

“কাওড়িয়া” শব্দটি এসেছে “কাঁওড়” (এক ধরনের বাঁশের কাঠামো যেটিতে দুই পাশে জলভর্তি পাত্র ঝোলে অর্থাৎ চলতি কথায় আমরা যাকে বাঁক বলি) থেকে। কাওড়িয়া ভক্তরা সাধারণত শেওরাফুলিঘাট থেকে গঙ্গাজল সংগ্রহ করে এই কাঠামো কাঁধে নিয়ে বহু মাইল পায়ে হেঁটে তারকেশ্বর মন্দিরে আসেন।

তাদের রীতিনীতির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত: উপবাস পালন, খালি পায়ে দীর্ঘ পথ হাঁটা, সমগ্র যাত্রাপথে শিবের নাম উচ্চারণ, শিবলিঙ্গে জল ঢালার আগে পর্যন্ত মুখে নির্জলা থাকা। এ যেন শুধু ভক্তি নয়—এক ধরনের “তপস্যা”।

 তারকেশ্বর মন্দিরে শ্রাবণ উৎসব

শ্রাবণ মাসে তারকেশ্বর মন্দিরে বসে বিশেষ মেলা ও বার্ষিক উৎসব। লক্ষাধিক ভক্ত জড়ো হন, এবং প্রশাসন নিরাপত্তা, মেডিক্যাল সাপোর্ট, বিশ্রামাগার, ও খাবার জল সরবরাহের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করে। বর্তমানে , তারকেশ্বর থেকে শেওড়াফুলি অবধি শ্রাবণ মাসের জন্য স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থাও আছে।

পথের ধারে সেবা ক্যাম্প বসে—যেখানে স্থানীয় মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী দল ও ধর্মীয় সংস্থা কাওড়িয়া ভক্তদের খাবার, জল ও ওষুধ দিয়ে সাহায্য করেন।

লোকবিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক প্রভাব

ভক্তদের মতে, তারকেশ্বরের শিব খুব সহজে প্রসন্ন হন—তাই তাঁকে “ভোলানাথ” বলা হয়। অনেকেই বলেন, এই মন্দিরে জল দিলে— রোগমুক্তি ঘটে, চাকরি বা পরীক্ষায় সাফল্য আসে, সংসারে শান্তি ফিরে আসে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি বেড়ে যায়।

পরিশেষে বলা যায়, তারকেশ্বর শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়—এটি শ্রাবণের প্রাচীনতম প্রাণস্পন্দন। কাওড়িয়া যাত্রা আমাদের শেখায় ত্যাগ, শৃঙ্খলা ও নিঃস্বার্থ ভক্তি কীভাবে জীবনকে বদলে দিতে পারে। আর ভোলেনাথ? তিনি আজও অপেক্ষা করে থাকেন—প্রতিটি ভক্তের পদধ্বনির জন্য।

তারকেশ্বর শুধু এক স্থান নয়, এক আশ্রয়—যেখানে বিশ্বাসই শেষ সত্য।

তথ্যসূত্র :অন্তর্জাল
error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Powered by Joinchat