কাঙাল হরিনাথ ও হরিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়

এইচ.এম. আদ্যাক্ষরের দুই সাংবাদিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামীর জন্ম এই জুলাই মাসেকাঙাল হরিনাথ ও হরিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় এই দুই মহান মানুষদের নিয়ে লিখলেন কিশলয় মুখোপাধ্যায়

সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালি সিনেমায় চুনিবালা দেবী বসে গান গাইছেন ‘হরি দিনতো গেল সন্ধে হল–‘ গানটি লিখেছেন হরিনাথ মজুমদার। তাঁকে সবাই চেনে কাঙাল হরিনাথ নামে। কাঙাল হরিনাথ আরেক হরি’র কাগজে লিখতেন। সেই কাগজটি হল হিন্দু পেট্রিয়ট। আর এই হরি হলেন হরিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়। এই দুই এইচ.এম॰ আদ্যাক্ষরের সাংবাদিকের জন্ম এই জুলাই মাসে। হরিনাথ মজুমদার ১৮৩৩ সালের ২০ জুলাই তৎকালীন নদীয়া জেলার কুমারখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে কুমারখালী বাংলাদেশে অবস্থিত। হরিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ১৮২৪ সালের ২৪ জুলাই কলকাতার ভবানীপুরে জন্মগ্রহণ করেন। দুজনেরই শৈশবে অর্থ সংকটের সমস্যার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বেশিদূর এগোয়েনি। কিন্তু অদম্য জ্ঞান পিপাসা, নিষ্ঠা আর অধ্যবসায়ে দুজনে দিকপাল সাংবাদিক হয়েছিলেন। হরিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে বলা হয় ভারতীয় সাংবাদিকতার জনক।

মিলিটারি অডিটর জেনারেল অফিসে ক্লার্ক ছিলেন হরিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়। গিরিশ চন্দ্র ঘোষ প্রতিষ্ঠিত কাগজ ‘বেঙ্গল রেকর্ডার’ পরে নাম হয় হিন্দু পেট্রিয়ট। কিছুদিন পরে হরিশচন্দ্র এই পত্রিকাটির মালিক ও সম্পাদক হলেন। এই পত্রিকাকে বলা হয় প্রথম জাতীয় কাগজ। প্রতি বৃহস্পতি বার প্রকাশিত এই কাগজে নীলকর অত্যাচারের সমস্ত সংবাদ ছাপা হত। ১৮৬০ সালে ৩০ জুলাই সাক্ষ দিতে তিনি বলেছিলেন ‘ এই নীল হাঙ্গামার বিষয়টি আমি খুবই সতকর্তা এবং যত্নের সঙ্গে পর্যালোচনা করে নিঃসন্দেহ হয়েছি যে নীল চাষ প্রজাদের অনিষ্টই করছে’। তিনি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পাশ করে করনিকের চাকরিটা পেয়েছিলেন এবং উচ্চ পদে প্রমোশন পেয়েছিলেন। সিপাই বিদ্রোহ কে হিন্দু পেট্রিয়ট প্রথম  জাতীয় মহাবিপ্লব বা দি গ্রেট রিভোল্ড অ্যাখ্যা দেয়।১৮৫৮ সালে ২৯ জুলাই লিখেছিলেন ‘বর্তমানে নীলচাষ ব্যাবস্থা যে ভাবে চালু আছে তা নিঃসন্দেহে শোষণ ও ঠকবাজ নীতি’।নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনী প্রকাশ করে আর নীল চাষিদের পক্ষে দাঁড়িয়ে তিনি যে সংগ্রামটি করেছিলেন তা অনস্বীকার্য। সেই সময় তাঁর ভবানীপুরের বাড়ি নীলচাষিদের ভরসার আশ্রয়স্থল তথা ধর্মশালায় পরিণত হয়েছিল।। নীলকরদের বিরূদ্ধে লড়াই করার জন্য গ্রাম বাংলায় একদল শিক্ষিত সাংবাদিক বাহিনী গঠন করেছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন নদীয়ার দীনবন্ধু মিত্র, রাধিকাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়, যশোরের শিশির ঘোষ, কৃষ্ণনগরের মনমোহন ঘোষ ও গিরিশ বসু এবং কুমারখালীর হরিনাথ মজুমদার।

একটি নীলকুঠিতে শিক্ষানবিশের কাজে যোগ দিলেন হরিনাথ মজুমদার। তিনি খুব কাছ থেকে দেখলেন নীলকরদের সীমাহীন অত্যাচার। নীলচাষিদের দুর্দশা। তিনি স্বভাবত কাজ ছাড়লেন। এটাই টার্নিং পয়েন্ট। তিনি ঠিক করলেন লিখে এর প্রতিবাদ করবেন। তিনি লিখতে শুর করলেন ঈশ্বর গুপ্তের সংবাদ প্রভাকরে। তারপর হিন্দু পেট্রিয়টে। তাঁর ছিল অসাধারন স্মৃতি শক্তি আর সুন্দর হাতের লেখা। তিনি ছিলেন সুরকার, গীতিকার ও লেখক। অনেক ঐতিহাসিক গবেষক কাঙাল হরিনাথের বিজয়স্তম্ভ উপন্যাসকে প্রথম বাংলা উপন্যাস অ্যাখ্যা দিয়েছেন।  তিনি ৪০টি বই লিখেছেন। কিছু পাণ্ডলিপি রয়়েছে। আর রয়েছে রোজকার দিনলিপি। তিনি শেষ জীবন পর্যন্ত ডায়েরি লিখেছেন।

১৮৬৩ সালে এপ্রিল মাসে বা পয়লা বৈশাখ প্রকাশ করলেন গ্রামবার্তা প্রকাশিকা। তিনি বলেছিলেন, ‘ আমার ইচ্ছা হইল এই সময় একখানি সংবাপত্র প্রচার করিয়া গ্রামবাসি প্রজারা যে যে ভাবে অত্যাচারিত হইতেছে তাহা গবর্ণমেন্টের কর্ণগত করিলে অবশ্যই তাহার প্রতিকার এবং তাহাদিগের নানা প্রকার উপকার  সাধিত হইবে সন্দেহ নাই।’ প্রথমে মাসিক, তারপর পাক্ষিক তারপর সাপ্তাহিকে পরিণত হয় এই কাগজ। ২২ বছর চলেছিল এই পত্রিকা। তৎকালীন ইংরেজ সরকার সমীহ করত এই পেপারটিকে। প্রথম দিকে কলকাতায় মুদ্রিত হত আর কুমারখালী থেকে প্রকাশিত হত। তারপর কুমারখালী থেকেই মুদ্রিত ও প্রকাশি হতে লাগলো। নীলচাষীদের প্রতি সমর্থনে বিভিন্ন সংবাদ, গ্রামের কথা তথা গ্রামের মানুষের কথা, গ্রামীণ ব্যবসা বাণিজ্যের খবর, ইতিহাস, সাহিত্যের লেখা প্রকাশিত এই পত্রিকায়। ১৮৬০ সালে বালিকা বিদ্যালয় ১৮৬৪ সালে শিশু পাঠশালা স্থাপন করেন। একটি গ্রামে তখনকার দিনে একটি বালিকা বিদ্যালয় চালু হওয়া একটি ব্যতিক্রমি ঘটনা। একটি  নৈশ বিদ্যালয়ও চালু করেন। ভারতে ডাকঘরে মানি অর্ডার প্রচলনের প্রস্তাব তিনিই প্রথম উত্থাপন করেছিলেন।

হরিশ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় মাত্র ৩৭ বছর বয়সে ও হরিনাথ মজুমদার ৬৭ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। দু’জনেরই মৃত্যদিন ১৬ তারিখ। হরিশ চন্দ্র ১৮৬১ সালে ১৬ জুন এবং কাঙাল হরিনাথ ১৮৯৬ সালে ১৬ এপ্রিল। এক পল্লী কবি লিখলেন-

নীল বানরে সোনার বাংলা

করল এবার ছারখার

অসময় হরিশ ম’ল

লং এর হল কারাগার

প্রজার প্রাণ বাঁচানো ভার।

দু’জনে শুধু সাংবাদিক ছিলেন না, ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামীও।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading