রবীন্দ্রনাথের শহরে বসে নতুন কিছু করার তাগিদে বার বার তাঁকে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছি, তখন তা একটু হলেও হৃদয়ে লাগছে

সাম্প্রতিক কালে বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নাচের রিয়েলিটি শো’র একটি নাচের কোরিওগ্রাফি ও আবহসংগীতের ব্যবহার নিয়ে সরগরম সামাজিক মাধ্যম, এই বিষয়ে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের নানা পেশার মানুষেরা সোচ্চার। চলছে নানা চাপান-উতোর। এই বিষয় নিয়ে সোচ্চার নৃত্যশিল্পীদের একাংশ। আমরা এই বিষয় নিয়ে কথা বলেছিলাম আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন প্রখ্যাত নৃত্য গুরু রাজদীপ ব্যানার্জী’র সঙ্গে।

সংবাদ প্রতিখন : এই মুহূর্তে বেসরকারি চ্যানেলের নাচের রিয়েলিটি শো’র একটি নাচকে কেন্দ্র করে সরগরম সামাজিকও মাধ্যম এই বিষয়ে আপনার মত

রাজদীপ ব্যানার্জী : এই বিষয় গুলি নিয়ে আমি আগেও কথা বলেছি, কিন টু এবার একটু হলেও মাত্রাটা বেশিই চারিয়েছে বলে আমার মনে হয়। যদিও আমরা অন্য মাধ্যমে কাজ করি, আমরা বৈদ্যুতিক মাধ্যমে কাজ করি না। আমরা মূলত মঞ্চেই আমাদের অনুষ্ঠান পরিবেশন করে থাকি, কিন্তু যখন প্রসঙ্গ আসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি, তখন চুপ করে থাকা যায় না। চুপ করে থাকলে কোথায় একটা নিজের কাছেই অপরাধ বোধ জাগ্রত হয়। এতটাই কী নীরব আমাদের থাকা কী উচিত নিজেদের কাজ নিয়ে। তখন কিছুটা বাধ্য হয়েই কিছু কথা বলতেই হয়।

সংবাদ প্রতিখন : আপনি বললেন আপনারা বৈদ্যুতিক মাধ্যমে নয়, মঞ্চই আপনাদের মূল। দুটি মাধ্যমের মধ্যে অনেকটাই পার্থক্য। দেখতে গেলে মঞ্চে অনুষ্ঠান পরিবেশন অনেকটাই কঠিন।

রাজদীপ ব্যানার্জী : একদমই। সকল ক্ষেত্রেই কিছু কিছু সমস্যা দেখা যায়, কারণ ধরুন যখন এক ঘণ্টার একটি শাস্ত্রীয় নৃত্যের অনুষ্ঠান পরিবেশনের জন্য যে আট নয় ঘন্টার যে অনুশীলন তা এখন অনেকটাই কমে যাচ্ছে। এখন রিলের জন্যে হয়তো তিন মিনিটের প্রেজেন্টেশন দিতে হয়। আমি ঠিক সঠিক টাইম টাও জানি না। তো সেই রকম টাইম এর জন্যে যতটুকু নাচ প্র্যাকটিস করার দরকার ততটুকু নিয়ে ছেলে মেয়েরা করছে। কিন্তু সমস্যাটা যেখানেই হয়ে যায়, যখন মাধ্যমটা চেঞ্জ হয়ে যায় তখন এক মাধ্যমে এক ভাবে এখানকার কোরিওগ্রাফারা গ্রুম হয়, তারপর অন্য একটা মাধ্যমে কাজ করে। সে তখন নিজে বুঝতেও পারে না যে কিভাবে আমি ওই মাধ্যমটা কে হ্যান্ডেল করব। তার জন্যে একটু অভিজ্ঞ কোরিওগ্রাফার প্রয়োজন। আর এখন যেটা হয়ে গেছে যে হাত পা নাড়লে নাচ যেমন হয়না তেমন নাচ করলেই কোরিওগ্রাফার হওয়া যায় না। যে ডান্সার সে কিন্তু সবসময় কোরিওগ্রাফার নয়।

সংবাদ প্রতিখন : এই মুহূর্তে যে বিষয়টা নিয়ে আমরা কথা বলব বলে বসেছি, আজকে এটা সত্যি কথা, বাঙালি হিসেবে প্রত্যেকের মনে একটা নাড়া দিয়ে গেছে। এটা কি বলবেন?

রাজদীপ ব্যানার্জী : এটা তো নাড়া দেওয়ারই কথা। এটা না। কেননা আমাদের ডান্স ইন্ড্রাস্ট্রিতে এই বিষয় নিয়ে ঠিক আলোচনা হয় না। আপনি অভিনয়ের দিকে দেখুন, সিরিয়াল দেখুন। আপনি মুভির ব্যাপারে বলুন সেই সব জায়গায় একটা কোনও ছোট বিষয় হলে আমরা প্রচুর কথা দেখতে পাই, কথা শুনতে পাই এবং ফেসবুকে আমরা সেগুলো আমরা পড়তেও পাই। অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা এটা পড়তে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু ডান্স নিয়ে, আমাদের নৃত্যের জগৎ নিয়ে কিন্তু কোনও আলোচনা হয় না। যেখানে সব জায়গার সংস্কৃতি, সব জায়গায় যে বেনোজল ঢুকছে, সেটা কি আমাদের সংস্কৃতিতে ঢুকছে না? এটাই তো আমার কাছে একটা বড় প্রশ্ন যে সামাজিক অবক্ষয় এরকম তো হতে পারে না যে নাচটাকে বাদ দিয়ে অন্যান্য জায়গায় হচ্ছে। আর যে সমস্যাটা তৈরি হচ্ছে, যে যখনই কোনও মুভিতে কাজ করে কোনও অভিনেতা অভিনেত্রী, তারা একটা, বিশেষ করে অভিনেত্রীরা যখন একটা সময় তাদের কাজ পায় যারা কাজ করে একটা ছয় মাসের একটা শুটিং চলছে, একটা রেকর্ডিং চলছে। সেই সময় সে মুভির সঙ্গে যুক্ত বা ওয়েব সিরিজের সঙ্গে যুক্ত বা সিরিয়ালের সঙ্গে যুক্ত। আফটার শুটিং। তারপরে আবার যখন তারা ফ্রি হয়ে যায় তখন গিয়ে তারা একটা নাচের স্কুল খুলে নিচ্ছে। এই যে একটা একটা ধারাবাহিকতা থাকছে না আর ছেলেমেয়েদের তারা, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সেই প্রলোভনে পড়ে যাচ্ছে। ফলে মনে করছে যে এখানে গেলে বোধহয় আমি সঠিক নাচের শিক্ষা পাব। কিন্তু এই যে অবক্ষয়, এটা নিয়ে যদিও বেশি কথা বলি না, কিন্তু আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে আমাকে বলতেই হচ্ছে।

সংবাদ প্রতিখন : যে রিয়েলিটি শো নিয়ে আজকে যে কথা উঠেছে, বিভিন্ন মানুষজন বিভিন্ন ভাবে তাদের বক্তব্য তুলে ধরছেন। এই যে বিষয়টা, তার সঙ্গে যারা যুক্ত বা যারা পারফর্ম করেছেন তাদের যে বক্তব্য, এই যে দুটোর একটা টানাপোড়েন। এই টানাপোড়েনের মধ্যে কি আপনি মনে করছেন যে আদপে ক্ষতিটা কিসের হচ্ছে? আমাদের বঙ্গ সংস্কৃতির হচ্ছে না? ভরতনাট্যম বা নাচের ফর্মের কোন ক্ষতি সাধন হচ্ছে তো হচ্ছেই

রাজদীপ ব্যানার্জী : অবশ্যই ক্ষতি হচ্ছে। আমি একজন ভরতনাট্যম নৃত্যশিল্পী। আমি দক্ষিণ ভারতীয় নৃত্য করি। কিন্তু আমি রবীন্দ্রনাথের কাজ করতে আমি ভয় পাই। মিনিমাম একটা শিক্ষা, মিনিমাম একটা এস্থেটিক, মিনিমাম একটা পূর্ণাঙ্গ নান্দনিকতা না থাকলে কিভাবে একটা শিল্প সংস্কৃতির মধ্যে কিভাবে শুধুমাত্র বিনোদনের তাগিদে কিভাবে একটা জিনিস চেঞ্জ হয়ে যায়, কীভাবে তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে পারে?  নিউ জেনারেশন এটাই তো দেখছে। এটাই যদি শেখে তাহলে তো এটা সত্যিই আমাদের কাছে খুবই দুঃখের এবং লজ্জার।

সংবাদ প্রতিখন : আরও একটা জিনিস যেটা আমরা সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন ভাবে দেখতে পাচ্ছি যে, এই যে ঘটনাটাকে কেন্দ্র করে একে অন্যের উপর যে দোষারোপ এই বিষয়টা কি সঠিক?

রাজদীপ ব্যানার্জী : কখনই আমি এটার কখনই সমর্থনের দিকে আমি যেতেই পারি না। আর তার সাথে সাথে বলব যে সামাজিক অবক্ষয়টা এটা ভীষণভাবে এফেক্ট করছে আমাদের শিল্প সংস্কৃতিকে। এই যে সামাজিক, এই যে একটা ভাষা বলার যে একটা তার যে পরিমাপ, পরিমিতি, জ্ঞান এই জ্ঞানটা যদি না থাকে তাহলে তো আমরা সত্যিই হতাশ হওয়া ছাড়া আমাদের কোন উপায় নেই। কেননা কিছু কিছু কথা যে খুব সহজ হয়ে যাচ্ছে যে বার বার জোর দিয়ে যদি কোন মিথ্যে কথাকে বলা হয় তেমন সেটা আস্তে আস্তে সত্য হয়ে যায় এবং বার বার কটু কথা বলতে বলতে সেই কটু কথাটা খুব সহজ হয়ে যাচ্ছে। এটা আমাদের কাছে খুবই চিন্তার এবং খুবই দুঃখের।

সংবাদ প্রতিখন : বঙ্গ সংস্কৃতি বা আমাদের ভারতীয় সংস্কৃতির যে ধারা এটা বহু প্রাচীন ধারা। এবং আপনি যেহেতু বিদেশেও বিভিন্ন বার নিজে পারফর্ম করতে গেছেন, অনুষ্ঠান পরিবেশন করেছেন। বিদেশীরা যেভাবে আমাদেরকে, আমাদের সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরছে বা আমাদের সংস্কৃতিকে ভালোবাসছে, আমরা কি ঠিক সেইভাবে আমাদের সংস্কৃতিকে ভালোবাসতে পারছি? কী মনে হয় আপনার?

রাজদীপ ব্যানার্জী : অবশ্যই। তারা তো হয়তো বিভিন্ন সময়ে দুর্গাপুজো বা নববর্ষের  সময়ে বিদেশে যে বাঙালিরা থাকে, তারা তো অধীর আগ্রহে বসে থাকে যে কখন তারা একটা সুন্দর বাংলা শব্দ সে শুনতে পাবে। যখন সেই সুন্দর পরিবেশটা, তাদেরই ছোটবেলাকার সুখের স্মৃতিটা তারা কবে আবার ফেরত পাবে? কিন্তু সেই জায়গায় আমরা যখন কলকাতায় বসে রবীন্দ্রনাথের জায়গায় রবীন্দ্রনাথের শহরে বসে আমরা যখন নতুন কিছু করার তাগিদে বার বার রবীন্দ্রনাথের গান এবং অন্যান্য সংস্কৃতিকে দুমড়ে মুচড়ে দিচ্ছি, তখন সেটা কোথায় গিয়ে একটু হলেও হৃদয়ে লাগছে?  কেন না এটা সবসময় মেনে নেওয়া সম্ভব নয় যে তারই শহরে, তারই জায়গায়, তারই সঙ্গীতকে, তার নৃত্যকে, এরকমভাবে নতুন কিছু করার তাগিদে এইভেবে ব্যবহার করা। নতুন কিছু করার তাগিদটা সম্পূর্ণ আলাদা একটা বিষয়। সেটাকে আমি যথেষ্ট সম্মান করি। নতুন কাজ। নতুন প্রজন্মকে যথেষ্ট সম্মান করি, ভালোবাসি। ইয়াং জেনারেশনকে আমার সবসময় পছন্দের হয়। কিন্তু নতুন করার তাগিদে পুরনোকে এইভাবে দুমড়ে মুচড়ে দেওয়া এটা আমার ব্যক্তিগতভাবে খুবই হৃদয়বিদারক।

সংবাদ প্রতিখন : নতুন মানে এই নয় যে আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে ভুলে যাব। আমাদের সংস্কৃতির যে ধারা সেটা তো ভুলে যাওয়া কখনই উচিত নয়। এই বিষয়টাকে কী বলবেন?

রাজদীপ ব্যানার্জী : অবশ্যই। সেটা তো কখনই কাম্য নয়। কেননা পুরাতনকে না জানলে তো নতুনের দিকে আমরা এগিয়ে যেতে পারব না?  হয়তো সব সময়ই ট্র্যাডিশন মেনটেন করে জানাটা সম্ভব হয় না। কিন্তু তারপরেও কোথায়ও একটা নান্দনিকতার একটা সুতোর বাঁধন দরকার হয়। তার যখন বাঁধন খুলে যায়, ঠিক আছে, আমি অতটা রবীন্দ্রচর্চা করিনি। আমার একটা এপিসোড আছে। যদি সেটা থাকে রবীন্দ্রনাথের ওপর, তাহলে আমি একটা সিম্পল জিনিস সুন্দরভাবে প্রেজেন্ট করব। তার মধ্যে একটা নান্দনিকতার সুতো দিয়ে বাঁধবো। কিন্তু যখন সেটা সাহিত্যের গভীরে পৌঁছে যায়, তখন খুব খারাপ লাগে।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Powered by Joinchat