
আত্রেয়ী দো: ভোজনের শেষপাতে চাটনির সাথে হোক কিংবা গরম গরম চায়ের সাথে, কিংবা রথের মেলায় গরম জিলিপির সাথে একই প্লেটে-পাঁপড় নিজের জায়গা একদম পাকাপাকি করে নিয়েছে।
ভারতের ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোর তালিকায় ‘পাঁপড়’ এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। মশলা মিশ্রিত ডাল বা চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি পাতলা ও কুরকুরে এই খাদ্যবস্তু শুধু রসনাতৃপ্তির জন্য নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারীর স্বনির্ভরতা, প্রাচীন খাদ্যপ্রযুক্তি ও স্থানীয় খাদ্য সংস্কৃতির অনন্য দলিল।
চারিদিকে এখন রথের মেলা বসেছে। গরম গরম জিলিপির সাথে খান কতক পাঁপড় ভাজা নিয়ে চলুন ডুব দিই পাঁপড়ের কিছু অজানা তথ্য সন্ধানে।

প্রাচীন শিকড়
পাঁপড়ের উৎসের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য না থাকলেও ইতিহাসবিদ ও খাদ্যবিশারদদের মতে, প্রায় খ্রিস্টীয় ৬ষ্ঠ শতক থেকে ৮ম শতক-এর মধ্যে ভারতে পাঁপড়জাতীয় খাবারের প্রচলন শুরু হয়। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে “পরপট” নামে পাঁপড়ের উল্লেখ মেলে, যা ছিল ডাল বা শস্যগুঁড়ো দিয়ে তৈরি পাতলা, ভাজা খাদ্য।
বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপে এর নাম আলাদা আলাদা— পাপড় (হিন্দি), আপ্পালাম (তামিল), হাপলা (কন্নড়), বড়ি পাঁপড় (বাংলা)।
পাঁপড়ের মূল উপাদানগুলি ছিল— উড়দ ডাল, মসুর ডাল, চালগুঁড়ো, নুন, জিরে, হিঙ ইত্যাদি। রোদে শুকিয়ে রেখে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের উপযোগী করে তোলা হতো।

নারী উদ্যোগ ও ‘লিজ্জত’ বিপ্লব
পাঁপড় ইতিহাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় শুরু হয় ১৯৫৯ সালে। মুম্বই শহরে ৭ জন গৃহবধূ মিলে মাত্র ৮০ টাকায় শুরু করেন এক ক্ষুদ্র উদ্যোগ— ‘শ্রী মহিলা গৃহ উদ্যগ লিজ্জত পাঁপড়’। এই সংস্থার লক্ষ্য ছিল গৃহবধূদের আত্মনির্ভর করে তোলা। বর্তমানে, এটি প্রায় ৪৩,০০০ মহিলা কর্মী-র একটি সফল সমবায় প্রতিষ্ঠান, যা দেশ ও বিদেশে রপ্তানি করে পাঁপড়সহ নানা খাদ্যপণ্য।

আধুনিক প্রেক্ষাপট
আজকের দিনে পাঁপড় শুধু খাবার নয়, এটি ভারতের গণসংস্কৃতি ও নারী-উদ্যোগের প্রতীক। প্রতিটি রাজ্যে রয়েছে নিজস্ব বৈচিত্র্য—পাঞ্জাবি উড়দ পাঁপড়, গুজরাটি ম্যাঙ্গো পাঁপড়, বাঙালি বড়ি পাঁপড়, দক্ষিণ ভারতের আপ্পালাম।

বিশ্বের নানা প্রান্তে ভারতীয় রেস্টুরেন্ট গুলিতে এটি একটি অপরিহার্য সংযোজন। শুধু স্বাদের কারণে নয়, পাঁপড় আজ ইতিহাস, উদ্যম ও ঐতিহ্যের এক সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি।
