জিলিপির আন্তর্জাতিক ইতিহাস ও ভারতীয় অভিযোজন

 

আত্রেয়ী দো: রথের মেলায় ঘুরে জিলিপি কিনে বাড়ি ফেরেন না এরকম বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আমিও তার ব্যাতিক্রম নই। তো জিলিপি কিনে বাড়ি এসে খেতে খেতে মাথায় এলো ,জিলিপির উদ্ভব কিভাবে হলো? মাথায় আসতেই বসে পড়লাম তথ্য সন্ধানে।

ভারত নয়, প্রাচীন পারস্য

আজকে আমরা জিলিপিকে যতটা ভারতীয় ভাবি, তার প্রকৃত ইতিহাস কিন্তু ভারতের বাইরেই শুরু হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, জিলিপির আদিরূপের নাম ছিল “Zalabiya” (আরবি: زلابية) — যা খ্রিষ্টীয় ৮ম -৯ম শতকে পারস্য ও আরব বিশ্বে একটি জনপ্রিয় মিষ্টি খাবার হিসেবে পরিচিত ছিল। এই Zalabiya তৈরি হতো গমের ময়দা, চিনি বা মধু দিয়ে মাখিয়ে তেলে ভেজে এবং সিরায় ডুবিয়ে। এটি সাধারণত রমজান মাসে ইফতারে পরিবেশিত হতো।

ইসলামী আগমনের পর ভারতে প্রবেশ

জিলিপি ভারতে আসে ইসলামিক শাসনের সময়, বিশেষ করে সুলতানী ও মুঘল আমলে। ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ১৩শ শতকে দিল্লি সুলতানাতের সময়ে Zalabiya ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে এবং স্থানীয়ভাবে “জিলিপি” নামে পরিচিত হয়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এর গঠন, স্বাদ ও পরিবেশন রীতিতে পরিবর্তন আসে।

স্থানীয় রূপান্তর

ভারতে জিলিপি কেবল রাজকীয় ভোজ নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি হালুয়াই দোকান, পূজার থালা, এবং উৎসবের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়। বিশেষ করে রথ, দুর্গাপুজো, বিবাহ, ঈদ, দীপাবলি প্রভৃতি বিভিন্ন উৎসবে জিলিপি আজ এক অবিচ্ছেদ্য নাম।

ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ

বাঙালি জিলিপি: আকৃতি মোটা, টক-মিষ্টি ভারী সিরায় ডুবিয়ে তৈরি।

উত্তর ভারতের জিলেবি: এখানকার জিলিপি পাতলা ও অতিমিষ্ট।

দক্ষিণ ভারতের “ইমার্তি” বা “জঙ্গরি”: উড়দ ডালের ঘন বাটা দিয়ে তৈরি।

মধ্যপ্রাচ্যের “Zalabiya”: মধু ও গোলাপজল মিশিয়ে হালকা মিষ্টি রূপে বানানো হতো।

পশ্চিমে “Churros” ও “Beignets”: ইউরোপের অনুরূপ বানানো হতো।

আচ্ছা, এতো গেল ভারতে জিলিপির অভিযোজনের ইতিহাস। এবার যে প্রশ্নটা মাথায় খোঁচা দিচ্ছে, সেটা হলো জিলিপির আকৃতি এই রকম কেনো? চলুন জেনে নিই সেটাও। কথাতেই আছে, জিলিপির প্যাঁচ …কেন এমন কুন্ডলী আকৃতি হলো জিলিপির?

জিলিপির এই বিশেষ পাকানো আকৃতির পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ:

* রান্নার সুবিধা – সর্পিল করে ভাজলে তেলে সমানভাবে ভাজা যায়।

* রস শোষণের উপযোগিতা – চিনির রস সহজে ভিতর পর্যন্ত ঢুকে পড়ে।

* হস্তশিল্প ভিত্তিক তৈরি পদ্ধতি – হাতে কলসির মতো পাত্র থেকে গরম তেলে ঘুরিয়ে ঢাললে এই আকার সহজে তৈরি হয়।

* দৃষ্টিনন্দনতা – পাকানো রূপ দেখতে সুন্দর, খেতে মনোহর।

* খাস্তা ও নরমের সংমিশ্রণ – বাইরের অংশ খাস্তা, ভিতরে রসালো।

(তথ্যসূত্র: অন্তর্জাল)  
error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading