
আত্রেয়ী দো: পেট ভরলেও মন ভরে না ! – এই কথাটি সম্ভবত কলকাতা বিরিয়ানির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উপযুক্ত।
বিরিয়ানির উৎপত্তি কোথায়?
বিরিয়ানির উৎপত্তি নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য আছে, তবে মূলত দুটি তত্ত্ব খুব প্রচলিত:
পারস্য (ইরান) থেকে আগমন
“বিরিয়ানি” শব্দটি ফারসি “বিরিয়ান”(بریان) শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ “ভাজা” বা “পোড়ানো”। ধারণা করা হয় মুঘলরা পারস্য থেকে এই রান্নার ধরণ ভারতবর্ষে নিয়ে আসেন। মুঘল রাজদরবারে বিরিয়ানি একটি রাজকীয় খাবার ছিল। শাহজাহান, আওরঙ্গজেব, হুমায়ুন–অনেকেই এই খাবারের ভক্ত ছিলেন।

ভারতীয় উপমহাদেশে বিকাশ
অনেক গবেষক মনে করেন বিরিয়ানি ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির মধ্যেই উদ্ভূত হয়েছিল, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে। হায়দরাবাদ ও তামিলনাড়ুর অন্দরমহলের রাঁধুনিদের রান্না করা খাবার থেকে বিরিয়ানি বিকশিত হতে থাকে।
বিরিয়ানির প্রকারভেদ
বিভিন্ন অঞ্চলে বিরিয়ানির স্বাদ, উপকরণ ও রান্নার ধরন ভিন্ন হয়ে উঠেছে।
১. মুঘলাই বিরিয়ানি:
উত্তর ভারতে প্রচলিত। কেশর, গুলাব জল, মেওয়া প্রভৃতির ব্যবহার বেশি।
২. হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি:
খাস মশলাদার ও ঝাল। কাচ্চি’ (কাঁচা মাংস ও চাল একসাথে রান্না) ও ‘পাক্কি’ (আগে মাংস রান্না করে তারপর চালের সাথে) দুই ধরণের পদ্ধতিতে রান্না হয়।
৩. কলকাতা বিরিয়ানি:
নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ যখন ব্রিটিশদের দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে কলকাতায় আসেন, তিনি তার রান্নার দলকে সাথে নিয়ে আসেন। আলু ও ডিমের সংযোজন এই বিরিয়ানিকে আলাদা করে তোলে।
৪. লক্ষ্ণৌ/আওধি বিরিয়ানি:
ধীরে ধীরে রান্না করা হয়, অনেকটা “দম” পদ্ধতিতে। স্বাদে তুলনামূলকভাবে মৃদু ও সুগন্ধযুক্ত। কলকাতা বিরিয়ানি শুধু একটি খাবার নয় — এটি এক ঐতিহাসিক স্মারক, এক সাংস্কৃতিক চিহ্ন, আর বাঙালির আবেগের নাম। এর স্বাদ যতটা অনন্য, ইতিহাসও ততটাই সমৃদ্ধ।

নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ ও কলকাতা বিরিয়ানির সূচনা
১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ-কে তাঁর আওধ (বর্তমান লক্ষ্ণৌ) রাজ্য থেকে ক্ষমতাচ্যুত করে। তিনি কলকাতার মেটিয়াবুরুজ এলাকায় নির্বাসিত জীবনযাপন শুরু করেন। নবাব সাহেব ছিলেন সংস্কৃতিবান, শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক এবং খাদ্যরসিক। তিনি তাঁর সঙ্গে নিজস্ব বাবুর্চি দল, দরবারি রীতিনীতি, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে — আওধি বিরিয়ানি-ও কলকাতায় নিয়ে আসেন।
আলুর আগমন: অর্থনৈতিক কৌশল না সাংস্কৃতিক উদ্ভাবন
নবাব কলকাতায় আসার পর আর্থিক সংকটে পড়েন।ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মাংসের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে আলু যুক্ত করা হয় বিরিয়ানিতে, যাতে খাবারটি সাশ্রয়ী হয় কিন্তু তার ঘ্রাণ ও গুণমান বজায় থাকে। একে বলা যায় “আবিষ্কারের মধ্যে বাঙালি সৃষ্টিশীলতা” — আজ সেই আলুই কলকাতা বিরিয়ানির প্রতীক।

কলকাতা বিরিয়ানির বিশেষ বৈশিষ্ট্য
এই বিরিয়ানিতে সুগন্ধী চাল মূলত লম্বা দানার বাসমতি চাল ব্যবহৃত হয়। আলু হল কলকাতা বিরিয়ানির অনন্য বৈশিষ্ট্য — প্রতিটি আলুতেই মিশে আছে মশলার গভীর স্বাদ। অনেক দোকানে সিদ্ধ ডিমও দেওয়া হয়। হালকা মশলা, অত্যধিক ঝাল নয় — বরং সুগন্ধ এবং নরম স্বাদে ভরপুর। গোলাপ জল, কেওড়া জল, মিঠা আতর ইত্যাদি অ্যারোমাটিক উপাদান এই বিরিয়ানিকে করে তোলে আরও মনোমুগ্ধকর।দম পদ্ধতি ঢেকে ধীরে ধীরে রান্না করা হয় যাতে চাল ও মাংস একসাথে পুরোপুরি সুগন্ধে ভরে যায়।

কলকাতার কিছু বিখ্যাত ঐতিহাসিক বিরিয়ানি রেস্তোরাঁ
- রয়েল ইন্ডিয়া (রয়েল বিরিয়ানি)–কলকাতার অন্যতম পুরনো বিরিয়ানির দোকান।
- আর্সালান – মডার্ন স্টাইলের প্রতিনিধিত্বকারী দোকান।
- শিরাজ গোলবার–ঐতিহ্যের ধারক।
- ধাবা বা হোসেনি রেস্টুরেন্ট–যারা এখনো পুরনো পদ্ধতিতে রান্না করে।
