রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষে প্রাণ দিয়েছিলেন ১১ জন বাঙালি

১৯৬১ সালের ১৯ মে, ১১ জন অকুতোভয় বাঙালি সন্তান শহীদ হন নিজের মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে। বাংলা ভাষার বীর শহীদদের সংবাদ প্রতিখন পরিবারের পক্ষে লিখলেন কিশলয় মুখোপাধ্যায়

কানাইলাল নিয়োগী, সুকোমল  পুরকায়স্থ, হিতেশ বিশ্বাস, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, সত্যেন্দ্র দেব, কুমুদরঞ্জন দাশ, বীরেন্দ্র সূত্রধর, শচীন্দ্র কুমার পাল, তরণী দেবনাথ, সুনীল সরকার আর কমলা ভট্টাচার্য। এই সেই এগারো জন শহিদ যাঁরা বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৬১ সালের ১৯ মে দুপুর বেলা আড়াইটের পর। আজ সেই ঐতিহাসিক ১৯ মে, আজ ভাষা শহিদ দিবস।

সেদিন শিলচর, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি অর্থাৎ বরাক উপত্যকায় হরতাল আরম্ভ হয়, যাকে বলে সর্বাত্মক ধর্মঘট। প্রতিদিন ভোর ৫:৪০ মিনিটে ২০২ নম্বর প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি করিমগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ১৯ মে একটাও  টিকিট বিক্রি হয়েনি। সকালে শান্তিপূর্ণ ভাবে পিকেটিং হলেও দুপুর ২টোর পর প্যারামিলিটারিকে মোতায়ন করা হয়। বেলা ২:৩০ নাগাদ কাটিগোরা থেকে ৯ জন সত্যাগ্রহীকে গ্রেপ্তার করে স্টেশনের কাছ দিয়ে ট্রাকে করে নিয়ে যাবার সময় ধর্মঘট আন্দোলনকারিরা বাধা দেয়। উত্তেজনা ছড়ায়। এই সময় সাত মিনিটে সতেরো রাউন্ড গুলি চালানো হয়। ১১ জনের মৃত্য হয়। পরের দিন শোক মিছিল হয়। এর ফলে বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। শহিদ কমলা ভট্টাচার্য আগের দিনই তৎকালীন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন।

আন্দোলনের শুরুটা হয়েছিল যখন ১৯৬০ সালে তৎকালীন আসাম কংগ্রেস সরকার অসমিয়া ভাষাকে আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা রূপে গ্রহণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে বাঙালি কংগ্রেস সদস্যরা প্রতিবাদ করেন । পুরো এপ্রিল মাস জুরে চলে প্রতিবাদ। ১৯৬০ সালে ১০ অক্টোবর একমাত্র অসমীয়া ভাষাকে সরকারি ভাষা করার জন্য বিধান সভায় প্রস্তাব আনা হয়। উত্তর করিমগঞ্জের বিধায়ক প্রতিবাদ করেন। ২৪ অক্টোবর  বিধানসভায় ভোটে গৃহীত হলে দিকে দিকে  প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। বরাক উপত্যকায় প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। ১৮ মে আসাম পুলিশ কাছার গণসংগ্রাম পরষদের তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। যথা নলিনীকান্ত দাশ, রথীন্দ্রনাথ সেন ও বিধুভূষণ চৌধুরি। বিধু বাবু ছিলেন সাপ্তাহিক যুগশক্তির সম্পাদক। এই পরিষদ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারিতে। ১৯ মে সর্বাত্মক ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া  ২ মে পদযাত্রার শেষে। সরকারও বসেছিলোনা। মার্চ মাসের ১৮ তাড়িখ শিলচর শহরে ফ্ল্যাগমার্চ করে আসাম রাইফেলস, মাদ্রাজ রেজিমেন্ট আর কেন্দ্রীয় সরকারের রিজার্ভ পুলিশ।  এরপর ১৯ মে দুঃখজনক ঘটনা।

বর্তমানে শিলচর স্টেশনকে ভাষা শহিদ স্টেশন শিলচর নাম দেওয়া হয়েছে। শহিদ কমলা ভট্টাচার্য পড়তেন ছোটেলাল শেঠ ইনিস্টিউট বিদ্যালয়ে। ২০১১ সালে ৫০ বছর পুর্তি উপলক্ষে বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে একটি ব্রোঞ্জের মুর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

পরিশেষে বলা যায় ১৯৬১ সাল মানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ। আর বিশ্বকবির জন্ম এই মে মাসে। যে ভাষাকে বিশ্ব দরবারে নিয়ে গেছেন, তাঁর জন্মশতবর্ষে তাঁরই মাতৃভাষা তথা বাংলা ভাষার ওপর আক্রমণ হয়েছিল। প্রাণ দিলেন এগারোজন। এই এগারোজন তথা এই বৃহত্তর আন্দোলনে যাঁরা যুক্ত ছিলেন তাঁদেরকে সংবাদ প্রতিখন পরিবার জানায় বিনম্র শ্রদ্ধা।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading