কলকাতা ছাড়িয়ে বনেদী বাড়ির পুজো- দ্বিতীয় পর্ব

কৃষ্ণনগর ঘূর্ণীর পাল বাড়ির দুর্গাপুজো

মাটির পুতুল তৈরির জন্য বিখ্যাত কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণি। এই ঘূর্ণির পাল বাড়ির পুজোর সুলুক সন্ধানে কিশলয় মুখোপাধ্যায়

নদিয়ার কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণী, জগৎ বিখ্যাত মাটির পুতুলের জন্য। এই কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণীর কুমোর পাড়ার ঐতিহ্যমন্ডিত পুজো ঘূর্ণী পাল বাড়ির দুর্গাপুজো নামে খ্যাত। এই পুজো প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল দেবলীনা পালের সঙ্গে। তিনি তাঁদের বাড়ির এই পুজো প্রসঙ্গে জানালেন, পাল বাড়ির একটু দূরেই বইছে জলঙ্গী নদী। এই বাড়ির কুল দেবতা হলেন ‘দামোদর’। শালগ্রাম শীলাটি জলঙ্গী নদী থেকে পান দেবলীনা পালের প্রপিতামহী সুবর্ণবালা পাল। সুবর্ণবালা দেবী ও তাঁর স্বামী রামচন্দ্রের পালের ঐকান্তিক ইচ্ছায় তাঁদের তিন পুত্র বলাই চন্দ্র পাল, কানাই চন্দ্র পাল আর অনিল পাল ১৯৫০ সালে এই দুর্গাপুজো শুরু করেন।

এই পুজোয় বিশেষত্ব হল দুর্গা মা’এর আরাধনার সঙ্গে রাম, লক্ষন, হনুমানজীর বিশেষ পুজো করা হয়। যা এই বঙ্গের কোনও বাড়ির পুজো কেন কোনও বারোয়ারী পুজোতেও দেখতে পাওয়া যায় না। এক কোথায় এটি অন্য এক বিশেষ বৈশিষ্ট ঘূর্ণি পাল বাড়ির পুজোয়।  এছাড়া অষ্টমীর দিন পুজো করা হয় বিপদতারিনী মাতার। আর গৃহলক্ষ্মীকে প্রতিষ্ঠা করা হয় দেবী দুর্গার পাশে।

আগে কৃষ্ণনগর ঘূর্ণি পাল বাড়ির পুজোর ভোগের চাল আসতো স্থানীয় গ্রামের মুসলিম পরিবার থেকে। ক্রমে এই প্রথার অবলুপ্তি ঘটে কারণ যে সকল মুসলিম পরিবার এই বাড়ির পুজোয় ভোগের চাল পাঠাতেন তাঁদের বর্তমান প্রজন্ম ধীরে ধীরে চাষ-আবাদ তুলে দেওয়ার জন্য।এই বাড়ির পুজোয় ষষ্ঠীর দিন অন্ন ভোগ হয় না, হয় ফল ভোগ নৈবেদ্য। সপ্তমীতে ৯টি আর অষ্টমীতে ৭টি ফলের নৈবেদ্য হয় আর সন্ধি পুজোয় ৬৪ যোগিনীর পুজোর জন্য সব রকম ফল দিয়ে খুব বড় করে ফলের নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। সন্ধিপুজোর সময় ১০৮টি প্রদীপ জ্বালানো হয় আর ১০৮টি পদ্মফুল অর্পন করা হয়। প্রদীপের আলো হল জ্ঞানের প্রতীক আর পদ্মফুল হল ভক্তির প্রতীক । আখ, চালকুমড়ো ও কদলী বলি হয়। নবমীর দিন হোম হয়।

এই বাড়ির দেবী মুরতিতেও রয়েছে বৈশিষ্ট। মুর্তির বিশেষত্ব হল সিংহের রঙ সাদা, লাল গণেশ আর অসুরের গায়ের সবুজ রং। দেবী দুর্গার মাথায় থাকে হাতে আঁকা সুন্দর পটচিত্র। এখন এই হাতে আঁকা পটচিত্র ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। কুমোরটুলির বিখ্যাত শিল্পী রমেশ পাল বলেছিলেন সিংহের রং সাদা হওয়ার কারণ হল কলকাতার চিড়িয়াখানায় সিংহ দেখার আগে শিল্পীরা সিংহ গড়বে কী করে?  শ্রী শ্রী চণ্ডিতে উল্লেখ আছে হিমালয় সিংহ পাঠিয়েছেন। তাই সিংহের রং সাদা।

সপ্তমী ও নবমীর দিন খিচুড়ি ভোগ হয়। এর সঙ্গে ৫ রকম ভাজা, এক বা দু’ রকমের তরকারির পদ, চাটনি, পায়েস ভোগ নিবেদন করা হয়। অষ্টমীর দিন পোলাও, সাত রকমের ভাজা, এক বা দু’ রকমের তরকারি, চাটনি ও পায়েস ভোগ নিবেদন করা হয়। এছাড়া প্রতিদিন বিকালে ঘিয়ের লুচি ও সুজি অর্থাৎ মোহনভোগ বা লুচি মিষ্টির নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। পুজোর দিনগুলোতে সন্ধ্যায় বাড়ির সকলে মিলে পরিবেশন করেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

দশমীর দিন দধিকর্মা ছাড়াও পান্তা ভাত ও কচু শাকের বিশেষ ভোগ দেওয়া হয় দেবীকে। এই দিন অপরাজিতার পুজো করা হয় এই বাড়িতে। সবশেষে দেবীকে নিয়ে বের হয় শোভাযাত্রা। এই শোভাযাত্রায় যোগ দেন পরিবারের সকলে আর জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই এই শোভাযাত্রায় অংশগ্রহন করেন। আলো, আতসবাজি সহকারে জলঙ্গী নদীতে নিরঞ্জন হয়। এই পুজো পাল বাড়ির আবেগ। আর নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো করে আসছে পাল বাড়ি।

 

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading