বিদ‍্যাসাগর-যাঁর চরিত্রের প্রধান গৌরব অজেয় পৌরুষ ও অক্ষয় মনুষ্যত্ব

আমাদের দেশের অন্যতম সমাজ সংস্কারক  ও নারী শিক্ষা প্রসারে সর্বপ্রথম যে মানুষটি এগিয়ে এসেছিলেন সেই মহাপুরুষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের  জন্মবার্ষিকীর প্রাক্কালে ওনাকে নিয়ে লিখলেন অভিজিৎ দত্ত

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমরা কি অনুভব করতে পারবো-উনবিংশ শতকে যে সমস্ত মহাপুরুষ এই বঙ্গ দেশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ও সমাজ সংস্কার করতে গিয়েছিলেন তারা কি নিদারুণ প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন? সমাজসংস্কার করতে গিয়ে তাদের কি বিরূপ প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল?

লড়াইটা কিন্ত ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে নয়,আমাদের দেশীয় কুসংস্কার, কু-প্রথা ও ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে। বিদ‍্যাসাগর মহাশয়কে চেনা-জানা এত সহজ ব্যাপার নয়। একজন মনীষীকে জানতে হলে ভাল করে তার কর্মকান্ডের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে।

বর্তমান প্রজন্মের অনেকে ভাল করে পাঠ্যপুস্তক পর্যন্ত পড়ে না ,তারা রেফারেন্স বই কি পড়বে? অথচ এইসব মনীষীদের সম্পর্কে জানা খুবই দরকার। নিজেদের দেশের সভ‍্যতা – সংস্কৃতি সম্পর্কে ভাল করে না জানলে প্রকৃত দেশবাসী হয়ে উঠা যায় কি? আজকাল মাঝে-মধ্যেই সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতাবাদ ইত্যাদি শব্দগুলো আলোচনায় ঘুরে ফিরে বেড়ায়। কিন্ত এইসব বাদ এর মোকাবিলা কি করে করা যাবে সেগুলো বলা যায় কি? এর জন্যই দরকার মনীষীদের নিয়ে আলোচনা। এক কথায় মনীষীচর্চা।

আমাদের দেশের সিনেমা, খেলা ইত্যাদি নিয়ে যেরূপ আবেগ তৈরি হতে দেখা যায়, মনীষী চর্চায় সেইরূপ আবেগ দেখা যায় না। এর মানে কি মনীষীদের নিয়ে আলোচনা করার দরকার নেই? তাঁরা ব্যাকডেটেড হয়ে গিয়েছেন? কিন্ত অতীতের মধ্যেই তো বর্তমানের বীজ পোঁতা থাকে আর বর্তমানের মধ্যেই ভবিষ্যতের। অতীত হচ্ছে গাছের শিকড়। কাজেই অতীতের ঘটনাবলী সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত না হলে ভবিষ্যত কি করে ভাল হবে?

এইখানেই আসে  মনীষীচর্চার গুরুত্ব। মনীষীদের নিয়ে যত চর্চা হবে তত তাঁদের জীবন কাহিনী ও কর্মকান্ড সম্পর্কে আমরা পরিচিত হতে পারবো এবং ততোই দেশের প্রতি প্রগাড় প্রেম ও শ্রদ্ধার জন্ম নেবে। জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম স্বাভাবিকভাবেই অন্তরে জেগে উঠবে। কিন্ত এই দায়িত্ব নেবে কে? এক্ষেত্রে আমাদের সকলকেই দায়িত্ব নিতে হবে। যেমন-বাড়িতে বাবা-মা,স্কুলে শিক্ষক-শিক্ষিকা, ক্লাবের ক্ষেত্রে সভাপতি ও সম্পাদক, প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তিরা।

মনীষীদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর মহাশয়। ঘরে ,ঘরে যে বর্ণপরিচয় ছাড়া আমাদের অক্ষর জ্ঞান হয় না, তার স্রষ্টা বিদ‍্যাসাগর মহাশয়। শুধু তাই নয়, ইংরেজ আমলেও কি করে মাথা উঁচু করে চলা যায় তাও বিদ‍্যাসাগর দেখিয়েছিলেন।

তিনি ছিলেন আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মানুষ। শিক্ষা বিস্তারই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল না, তিনি বিধবা মেয়েদের দুঃখ, যন্ত্রণা গভীরভাবে উপলদ্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি ধর্ম বা ভগবান বিশ্বাস করতেন না কিন্ত বিধবা বিবাহের প্রয়োজনে ধর্মগ্রন্থ নিয়ে চর্চা করেছিলেন। পরাশর সংহিতার  সাহায্যে তৎকালীন ধর্মপ্রচারক ও সমাজপতিদের বিরুদ্ধে লড়ে বিধবা বিবাহ প্রর্বতন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

এই বিধবা বিবাহ প্রচলন করতে গিয়ে তাঁকে কি পরিমান চাপ বা ঝুঁকি নিতে হয়েছিল তা এ প্রজন্ম অনুভব করতেও পারবে না।এই কাজের জন্য তাঁর প্রাণ সংশয় পর্যন্ত ঘটতে চলেছিল। কিন্ত তিনি এত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন যে শেষ না দেখে ছাড়তেন না। বিদ‍্যাসাগর একটা জায়গায় বলেছিলেন বিধবা বিবাহ প্রর্বতন তার জীবনের সবচেয়ে বড় কাজ।

বিদ‍্যাসাগর সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলেছেন-‘প্রাচীন ঋষির ন্যায়  প্রতিভা ও প্রজ্ঞা, একজন ইংরেজ এর মত কর্মশক্তি, আর হৃদয় হচ্ছে বাঙালি মা এর অনুরূপ’। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী বলেছিলেন, ‘অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ছোট জিনিসকে বড় দেখায় কিন্ত বিদ‍্যাসাগরের জীবন চরিত বাদ দিয়ে অন্যদের কর্মকান্ড যদি বিচার করা হয় তাহলে তা শুধুই ছোট দেখাবে।‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন-‘দয়া নহে,বিদ্যা নহে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, অক্ষয় মনুষ্যত্বের।‘

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই মন্তব্য যথার্থ ও ঐতিহাসিক। জীবনের মূল্য আয়ুতে নহে, কল্যাণ কর্মে-শাস্ত্রের এই কথাটি যে কতটা সত্য বিদ‍্যাসাগরের জীবনে তা প্রতীয়মান হয়। অথচ বিদ‍্যাসাগর মহাশয় এর শেষ জীবন কেটেছিল খুব কষ্টে। তাঁর মত মানুষের সঙ্গে যে অন্যদের মিল হবেনা সেটাই স্বাভাবিক।

এমনকি শেষ জীবনে তার স্ত্রী, ছেলে, বাবা, মায়ের সাথে বনিবনা হতো না। তিনি নিজের ছেলেকে তাজ্যপুত্র ঘোষণা করেছিলেন। এ নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর তীব্র মতবিরোধ হয় ও তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তাঁর নিজের জামাই সূর্যকুমার অধিকারীকে (যিনি মেট্রোপলিটন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন) কলেজ ফান্ডের তিন বা চার হাজার টাকা গরমিলের জন্য তীব্র ভর্ৎসনা করেন ও বরখাস্ত করেন।

বিদ‍্যাসাগর মহাশয়ের জীবনে এমন বহু ঘটনা আছে। এই মহৎ চরিত্রের কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে কিভাবে ঘরে ও বাইরে  সংগ্রাম করতে হয়। তিনি বলেছিলেন-এদেশের উদ্ধার হতে বহু বিলম্ব আছে। নতুন মানুষের চাষ করতে পারলে তবে এদেশের ভাল হবে।

উক্তিটি যথার্থ। তাই এই সময়ে উপস্থিত হয়ে তার জীবন ও কর্মকান্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ ও দেশবাসীর জন্য কিছু ভাল কাজ করতে পারলে, তাঁর আদর্শে চলতে পারলে, সেটাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Powered by Joinchat