ছোটবেলার শরৎচন্দ্র

গতকাল ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা কথা সাহিত্যিক শরত্‍চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ১৪৯ তম জন্মজয়ন্তী। তাঁর জন্মদিনকে স্মরণ করে তাঁর ছোটবেলার কিছু কথা তুলে ধলেন পথিক মিত্র

‘অন্নপ্রাশনের সময় যখন আমার নামকরণ হয়, তখন আমি ঠিক, আমি হইয়া উঠিতে পারি নাই বলিয়াই হোক, আর ঠাকুরদা মহাশয়ের জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশেষ দখল না থাকাতেই হোক, আমি ‘সুকুমার’। অধিক দিন নহে, ঠিক দুই-চারি বৎসরে ঠাকুরদা মহাশয় বুঝিলেন যে, নামটার সহিত আমার তেমন মিশ খায় না। এখন বার- তের বৎসর পরের কথা বলি। অবশ্য আমার আত্মপরিচয়ের কথা কেউ ভাল বুঝিতে পারিবেন না, তবুও, দেখুন, পাড়াগাঁয়ে আমাদের বাড়ি। সেখানে আমি ছেলেবেলা হইতেই আছি। পিতামহাশয় পশ্চিমাঞ্চলে চাকরি করিতেন। আমি বড় একটা সেখানে যাইতাম না। ঠাকুরমার নিকট দেশেই থাকিতাম। বাটীতে আমার উপদ্রবের আর সীমা ছিল না। এক কথায় একটি ক্ষুদ্র রাবণ ছিলাম। বৃদ্ধ ঠাকুরদা যখন বলিতেন, তুই হলি কি? কারও কথা শুনিস নে। এইবার তোর বাপকে চিঠি  লিখব। আমি অল্প হাসিয়া বলিতাম, ঠাকুরদা, সে দিন-কাল আর নেই, বাপের বাপকেও আমি ভয় করিনে। ঠাকুরমা কাছে থাকিলে আর ভয় কি? ঠাকুরদাকে তিনিই বলিতেন, কেমন উত্তর দিয়েছে—আর লাগবে?’

এইভাবেই যিনি নিজের ছোটবেলার কথা নিজেই লিপিবদ্ধ করে গেছেন তাঁর ‘বাল্যস্মৃতি’ নামক প্রবন্ধে, সেই মানুষটি আর কেউ নন, তিনি স্বয়ং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম জনপ্রিয় ও বাংলা ভাষার অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। যাঁর জন্মের দেড়শত বছরের প্রান্তে আমরা আজ উপস্থিত। যে মানুষটির কলমে খুব সহজেই উঠে এসেছিল সেই সময়ের সমাজের সেই সকল বঞ্চিত মানুষদের কথা, আমাদের সমাজের নারীদের নানা দুরাবস্থার জীবন্ত চিত্র, সেই মানুষটিকে স্মরণ করে তাঁর ছেলেবেলার কিছু বিশেষ ঘটনার অবতারণা করতেই এই লেখা।

শরৎচন্দ্র ছোটবেলায় ছিলেন খুব দুরন্ত। পাঠশালা, পাড়া বা বাড়ি সবখানেই তিনিই ছিলেন তাঁর সমবয়সী ছেলেদের মাথা। আমরা যাঁকে গুলি খেলা বলি সেই মার্বেল, এর সঙ্গে সঙ্গে লাট্টু ঘোরানো, ঘুড়ি ওড়ানো সবেতেই তিনি ছিলেন সকলের সেরা। তাঁর শখের মধ্যে ছিল, বন থেকে ফড়িং ধরে এনে পোষা, নানা রকম পোকা ও পাখি পোষা, কুকুর পোষা, বাগান করা ইত্যাদি। এছাড়াও সাঁতার কাটতে, কুস্তি লড়তে আর গাছে চড়তেও খুব ভালবাসতেন। উনি যখন ভাগলপুরে থাকতেন, তখন সমবয়সীদের সাথে নিয়ে ছোটখাটো একটা চিড়িয়াখানাও তৈরি করছিলেন তিনি। আর পাড়ার এক পোড়ো বাড়িতে গড়ে তুলেছিলেন কুস্তির আখড়া।

শরৎচন্দ্রের কৈশোরে তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় রাজেন্দ্রনাথ মজুমদার ওরফে রাজুর সঙ্গে। তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল খুব গভীর। রাজু ছিল যেমন দুঃসাহসী, তেমনি পরোপকারী। দুঃস্থকে সাহায্য করা, অসুস্থকে সেবা করা, মৃতদেহ সৎকার করা এ সবই ছিল তার কাজ। তার অনেক দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ডেই শরৎচন্দ্র ছিলেন সঙ্গী। তাঁর শ্রীকান্ত উপন্যাসের ইন্দ্রনাথ চরিত্রটিই কিন্তু ছিল এই রাজেন্দ্রনাথ মজুমদার ওরফে রাজুর।

শরৎচন্দ্র বিশ্বাস করতেন যে তাঁর সাহিত্য প্রতিভা তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে তাঁর বাবার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। স্কুলের পড়ার সময়ে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি তাঁর বাবার বইয়ের আলমারি থেকে গল্পের বই বের করে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তেন তিনি। এ সম্পর্কে শরৎচন্দ্র নিজেই বলেছেন-

“এবার বাবার আলমারির ভাঙা দরাজ থেকে খুঁজে বের করলাম ‘হরিদাসের গুপ্তকথা’ আর ‘ভবানী পাঠক’ গুরুজনদের দোষ দিতে পারিনে। স্কুলের পাঠ্য নয়, এগুলো বদ ছেলেদের অপাঠ্য পুস্তক। তাই পড়বার ঠাঁই করে নিতে হলো আমাকে গোয়ালঘরে।” ভাবা যায়, গোয়ালঘরে বসে বই পড়তেন তিনি।

সারা জীবন নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের বোহেমিয়ান জীবন থেকেই কিন্তু তিনি সংগ্রহ করেছিলেন তাঁর অসামান্য সব লেখার রসদ।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading