
অভিজিত্ দত্ত: বিখ্যাত লেখক, কথাসাহ্যিতিক এবং ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম হুগলি জেলার দেবানন্দপুরে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে। পিতার নাম মতিলাল চট্টোপাধ্যায়ে এবং মাতার নাম ভুবনমোহিনী দেবী। ১৮৭৬ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ ভাই, বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। শরৎচন্দ্রের বেশীরভাগ সময় তার মামার বাড়ি ভাগলপুরে কেটেছে। কেননা দারিদ্র্যের কারণে তার পিতা ভাগলপুরে শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন।
শরৎচন্দ্র পড়াশোনায় মেধাবী ছিলেন কিন্ত দারিদ্র্যের কারণে কলেজ জীবনের পড়া শেষ করতে পারেন নি। একসময় পিতার প্রতি অভিমানবশত সংসার ত্যাগ করেন ও বাড়ি ত্যাগ করে বাইরে চলে যান। পরবর্তীতে পিতার মৃত্যু হলে বাড়ি ফিরে আসেন। তার সাহিত্য চর্চার হাতেখড়ি ভাগলপুরে মামার বাড়িতে যে সাহিত্য চর্চার আসর বসতো, সেখান থেকেই হয়।

পিতার মৃত্যুর পর তিনি বিভিন্ন রকম কাজ করতে থাকেন। এরপর তিনি ব্রহ্মদেশে চলে যান ও পাবলিক ওয়ার্কাস কোম্পানির অফিসে দীর্ঘদিন কাজ করেন। ১৯০৩ থেকে ১৯১৬ অবধি তিনি বার্মায় থাকেন। মাঝে মাঝে অবসর পেলে কলকাতায় আসতেন। কাজের ফাঁকেই তিনি লেখালেখি করতেন।
যমুনা পত্রিকার সম্পাদক ফণিন্দ্রনাথ পাল তাকে লেখা পাঠাতে অনুরোধ করেন। ইতিপূর্বে শরৎচন্দ্রের লেখা কিছু পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। রামের সুমতি, গল্পটি যমুনা পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পর সাড়া পড়ে যায়।
আগে শরৎচন্দ্র অনিলা দেবী ছদ্মনামে লিখতেন। এরপর বিখ্যাত ভারতবর্ষ পত্রিকায় তাঁর লেখা বেড়ায় ও তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। ১৯১৬ সালে রেঙ্গুনের চাকরি ছেড়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে আসেন।

হাওড়া জেলার সামতাবেড় গ্রামের মাটির বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন। দেউলটি স্টেশন থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটারের পথ সামতাবেড়ের বাড়িটি রূপনারায়ণ নদের তীরে এক মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছিল। শরৎচন্দ্র গাছ ভালোবাসতেন। বাড়িতে নিজ হাতে পেয়ারা গাছ লাগিয়েছিলেন যা আজও বিদ্যমান। পরবর্তীতে শরৎচন্দ্র হাওড়ার শিবপুরে চলে যান ও সেখানে বাস করতে থাকেন। শিবপুরের ব্যাতাইতলা বাজার থেকে চ্যাটার্জি হাট পর্যন্ত রাস্তা শরৎচন্দ্রের নামেই চালু আছে।
মূলত ঔপন্যাসিক হিসাবেই তিনি বিখ্যাত হয়েছিলেন। তার বিখ্যাত লেখাগুলি আজও আমাদের মনকে সমানভাবে নাড়া দিয়ে যায়। শরৎচন্দ্রের লেখা মূলত: নিন্মবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারকে নিয়ে। শরৎচন্দ্র ছিলেন ভবঘুরে। তার এই মানসিকতা লেখার মধ্যেও ফুটে উঠেছিল। বিশেষ করে তার শ্রীকান্ত উপন্যাসটি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।

নারীদের হৃদয়ের কথা তার লেখনীতে গভীরভাবে ফুটে উঠেছিল। মানুষের জীবনের দুঃখ, কষ্ট, ভালোলাগা ও ভালোবাসার কথা অত্যন্ত দরদ দিয়ে শরৎচন্দ্র তাঁর লেখায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন বলে তাকে অপরাজেয় কথাসাহ্যিতিক বলা হয়। নারীদের সম্বন্ধে শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, ‘সংসারে যারা দিয়ে গেল, পেল না কিছুই-তাদের সম্বন্ধেই আমি বলতে এসেছি।‘
লেখালেখির জন্য তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী স্বর্ণপদক লাভ করেন ১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দে। ১৯৩৬ খ্রীষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিলিট উপাধি পান। ১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দে শরৎচন্দ্র প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই সময় তার যকৃতে ক্যান্সার ধরা পড়ে যা পাকস্হলী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।

তার অবস্থা দেখে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৩৮ সালের ১২ই জানুয়ারি অস্ত্রোপচার করা হয়। কিন্ত শেষরক্ষা করা যায় নি। অস্ত্রোপচারের চারদিন পর অর্থাৎ ১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি তার মহাপ্রয়াণ হয়।
তিনি চলে গেলেও তার কাজ তাকে অমর করে রেখেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শরৎচন্দ্রকে খুব ভালোবাসতেন। শরৎচন্দ্রের মৃত্যু কবিকে খুব আঘাত দিয়েছিল। তিনি শরৎচন্দ্রের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন- ‘যাহার অমর স্হান প্রেমের আসনে/ক্ষতি তার ক্ষতি নাই মৃত্যুর শাসনে/দেশের মাটি থেকে নিল যারে হরি/দেশের হৃদয় তাকে রাখিয়াছে ধরি’।
