সংবাদ প্রতিখন আয়োজিত বর্তমান সময়ে কতটা প্রাসঙ্গিক কবিগুরু শীর্ষক ৺অনিমা চক্রবর্তী স্মৃতি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার ফলাফল আমরা আগেই প্রকাশ করেছি। আজ থেকে আমরা এই প্রতিযোগিতার সেরা প্রথম পাঁচটি প্রবন্ধ প্রকাশ করতে চলেছি। আজ প্রকাশিত হচ্ছে এই প্রতিযোগিতার বিচারকদের বিচারে পঞ্চম স্থান পাওয়া প্রবন্ধ

অরুণ চট্টোপাধ্যায় : প্রাসঙ্গিকতা আর প্রয়োজন প্রায় সমার্থক। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের প্রায় আশি বছরের সুদীর্ঘ সময় ধরে বাংলার অঙ্গনে অসংখ্য মুক্তো ছড়িয়ে গেছেন। শুধু যে সাহিত্য, কাব্য, প্রবন্ধ, নাটক বা সঙ্গীতের ভান্ডার পুষ্ট করেছেন তাই নয়, তাঁর অসাধারণ সামাজিক বোধ আর মানবিকতা দিয়ে বাংলা তথা ভারতের মাথা উঁচুতে তুলে ধরেছেন। তাঁর সাহিত্য এক মহা সামাজিক মূল্যবোধের ফলশ্রুতি। সমাজের এমন কোনও ক্ষেত্র ছিল না যেখানে রবীন্দ্রনাথের অন্তদৃষ্টি পড়ে নি।
সাহিত্যের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি মানব আর সমাজজীবনের স্বচ্ছ আর সঠিক প্রতিচ্ছবি আঁকার চেষ্টা করেছেন। একজন সাহিত্যিকের যা কর্তব্য আর দায়িত্ব, সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে সমাজকে তুলে ধরা সেটা তিনি করেছিলেন অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে। ধনীর বিলাসবহুল ড্রয়িং রুম হোক বা হতদরিদ্রের কুটির তাঁর সূক্ষ্ম দৃষ্টি ঢুকে গেছে সমাজের প্রতিটি অংশে উচ্চ-নীচ ব্যাতিরেকে।
রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য সঙ্গীত। এগুলিতে করেছিলেন সুরারোপ। বর্তমানে রবীন্দ্রসঙ্গীত পৌঁছে গেছে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধগুলি বাংলার মূল্যবান সম্পদ। শিক্ষা ও সমাজ নিয়ে তাঁর নীতিনিষ্ঠ অভিমত ফুটে উঠেছে এই প্রবন্ধগুলিতে। শিক্ষায় মাতৃভাষার আবশ্যিক ব্যবহারের ওপর জোর দিলেও উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিক ভাষার ব্যবহারে আপত্তি করেন নি। কারণ শুধুমাত্র মাতৃভাষাতেই বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করতেন। রবীন্দ্রনাথের নাটক তৎকালীন সমাজের এক একটি উজ্জ্বল চিত্র যা আজকের যুগেও তার প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখেছে।
রবীন্দ্রনাথের স্বাধীনতার চেতনা আমাদের গর্বিত আর বিস্মিত করে। পরাধীন ভারতে বৃটিশ শাসকের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস ছিল যে মানুষটির, জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকান্ড তাঁকে এতই বিচলিত করেছিল সে তিনি তার প্রতিবাদে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন বৃটিশের দেওয়া নাইট হুড উপাধি। গভীর স্বাধীনতার চেতনা থেকেই শান্তিনিকেতনের বিশাল ক্ষেত্রে তিনি নির্মাণ করেছিলেন এক মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। জ্ঞান যেখানে মুক্ত আবহে আহরিত হতে থাকে।
রবীন্দ্রনাথ শুধু সাহিত্য সৃষ্টি করেই নয়, তা পৌঁছেও দিয়েছিলেন বিশ্বের দরবারে। বিনিময়ে অর্জন করেছিলেন নোবেল প্রাইজ, তাও বিলিয়ে দিয়েছেন প্রতিটি ভারতীয়ের মধ্যে। মূল্যে নয়-আনন্দ আর গর্বের অংশীদার করে। তাই রবীন্দ্রনাথ কখনও পুরোনো হন না। আমাদের হৃদয়ে তাঁর প্রতি মুহূর্তের উপস্থিতি আমরা নিরন্তর অনুভব করেই চলেছি।

