সংবাদ প্রতিখন আয়োজিত বর্তমান সময়ে কতটা প্রাসঙ্গিক কবিগুরু শীর্ষক ৺অনিমা চক্রবর্তী স্মৃতি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার ফলাফল আমরা আগেই প্রকাশ করেছি।
আজ থেকে আমরা এই প্রতিযোগিতার সেরা প্রথম পাঁচটি প্রবন্ধ প্রকাশ করতে চলেছি। আজ প্রকাশিত হচ্ছে এই প্রতিযোগিতার বিচারকদের বিচারে চতুর্থ স্থান পাওয়া প্রবন্ধ

শঙ্কর কুমার সাধুখাঁ : আমাদের জীবনে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ভরা বিভিন্ন পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথই আমাদের একমাত্র আশ্রয় ও নির্ভরস্থল। মন বা চিত্ত যখন অশান্ত হয়, প্রাত্যহিক জীবন তুচ্ছতার মাঝে ধ্বস্ত হয়, হতাশায় চলার পথে অন্ধকার নেমে আসে, রবীন্দ্রনাথ তখন আলোকবর্তিকা। তিনি নতুন পথের সন্ধান দেন, জীবনে সঞ্চার করেন নতুন সুর। যা মনে আনন্দ আনে, কর্মে প্রাণ সঞ্চার করে, করে নিষ্ঠাবান, অন্তর ঋদ্ধ হয় নব নব প্রেমে। তিনি যে মহান শিক্ষক। মহান গুরু। বিপদে বিরাট ভরসা। শয়নে, স্বপনে, হতাশায়, দুঃখে প্রধান আশ্রয় তিনি। তাঁর বিশিষ্ট চিন্তা অর্থাৎ শিক্ষা চিন্তা, কর্মধারা ও কর্ম সংস্কৃতি বিচারেও রবীন্দ্রনাথ এ যুগে অপরিহার্য।
রবীন্দ্রনাথের সমস্ত শিক্ষা চিন্তার মূলে ছিল মানব জীবনের সমগ্ৰ আদর্শকে জ্ঞানে ও কর্মে পূর্ণ করে উপলব্ধি করা। প্রকৃত শিক্ষা হল সেই শিক্ষা, যা নৈতিক মূল্যবোধ, নম্রতা, শৃঙ্খলা, নিঃস্বার্থতা, সহানুভূতি, সহনশীলতা, ক্ষমা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মতো গুণাবলীগুলোকে আত্মস্থ করায়।
রবীন্দ্রনাথ চিরকালই ঔপনিবেশিক ডিগ্ৰিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিলেন। কবি স্বপ্ন দেখেছিলেন জীবনে চলার পথে মানুষ পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠুক।রবীন্দ্রনাথ মনে করেছিলেন ব্যক্তি নির্ভর বাস্তবতা অপেক্ষা সমাজ নির্ভর বাস্তবতা আরও বেশি ব্যাপক, গভীর এবং আকর্ষণীয়। তিনি বলেছিলেন আজ শুধু চাষীর লাঙলের ফলার সংগে আমাদের দেশের মাটির সংযোগ যথেষ্ট নয়। সমস্ত দেশের বুদ্ধির সঙ্গে, বিদ্যার সংগে, অধ্যাবসায়ের সঙ্গে তার সংযোগ হওয়া চাই। শ্রীনিকেতনের কৃষি শিক্ষার কর্মসূচি এই চিন্তার ফসল।
বর্তমান সমাজে পরমত-অসহিষ্ণুতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন, ভারতবর্ষ শুধু হিন্দুর নয়, মুসলমানেরও নয়। ভারতবর্ষে বসবাসকারী সমস্ত মানুষই ভারতবাসী। রবীন্দ্রনাথের ভারতবর্ষে নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের মহান মিলন ক্ষেত্র।
ধর্মের ক্ষেত্রেই হোক আর জাতীয় ক্ষেত্রেই হোক রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সন্ত্রাসবাদের প্রবল বিরোধী। তিনি ছিলেন জাতীয় সংহতির প্রবক্তা। সামাজিক কুপ্রথাগুলির অবসান ঘটিয়ে এক সুস্থ, সুন্দর বলিষ্ঠ সমাজ গঠনের ক্ষেত্রেও তাঁর স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গির স্বাক্ষর বহন করে তাঁর রচনাবলী।
রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় দানব, আজ সমাজের সর্বস্তরে রাজনীতিতে, ধর্মীয় গোঁড়ামিতে এবং অপসংস্কৃতির ক্ষেত্রে দুর্বার পদক্ষেপে বিচরণ করছে। বিশ্বের আজ শান্তিতে অনাসক্তি, সভ্য মানুষ যোদ্ধা, চলেছে বিপুল রক্তারক্তি। আজকের বিক্ষুব্ধ পৃথিবীতে, তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনিবার্য ভাবে প্রাসঙ্গিক।
