প্রকৃতি প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ আজও বিশ্ব বরেন্য, আর তাই বর্তমান সময়েও তিনি সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক। সেই প্রকৃতি প্রেমিক রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই কলম ধরলেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক সুমিত দাঁ

রবীন্দ্রনাথ আমাদের সমাধিস্থ জীবনের জাগরণ / রবীন্দ্রনাথ আমাদের আত্মায় মিশে থাকা এক বিস্ময় / রবীন্দ্র নাথ এক নাম, যে নামে স্তম্ভিত বিশ্ব-চরাচর/ এ-এক অদ্ভূত সৃষ্টি বিধাতার, যাঁর মন-আত্মায় / জমে থাকা দুঃখের ঝড়-নেভাতে পারিনি বাতি
রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি প্রেম ছিল এক অনন্য-সাধারণ দৃষ্টি-ভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। যাঁর গানে কবিতায় গল্পে জড়িয়ে থাকা এক তরুলতার মত। তাঁর দার্শনিক চিন্তা-ভাবনার মধ্যেই আমরা খুঁজে পাই আর এক প্রকৃতি প্রেমিক রবীন্দ্রনাথকে। যাঁর প্রতিটি শব্দোচ্চারণের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে রয়েছে সবুজের সমারোহ। তাই তিনি জনঅরণ্যের ভীড় থেকে দূরে রাঙামাটির এক প্রত্যন্ত গ্রামকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় শান্তির ভূমি হিসেবে। যা, তাঁর স্বপ্নের শান্তিনিকেতন হয়ে আজও বিরাজমান। দৃশ্যমান জগতের এই রূপটিকে তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই লিখতে পেরেছিলেন এমন মনোমুগ্ধকর কবিতা—
বহুদিন ধরে বহু কোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিশের উপর একটি শিশির বিন্দু।
-লিখন ৬৯২ পৃঃ সঞ্চয়িতা
সত্যি, কি অদ্ভূত তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। যা, সাধারন মানুষের ভাবনার বাইরে। তাঁর ভয়ঙ্কর সুন্দর সত্যের এই উপস্থাপনা আমাদের জীবনে পাথেয় হয়ে থাকবে চিরকাল। রবীন্দ্র ভাবনার মধ্যে যা কিছু সৃষ্টি তার সবটাই জুড়ে আছে আমাদের জীবন যাত্রায় সর্বকালের সর্বকালীন হয়ে ।
এই মহাবিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে তাঁর এই মায়াটান, এই নির্মল আকুতি। দিগ-দিগন্ত জুড়ে বিস্তীর্ণ জলরাশি, অরণ্যভূমির আদিম ভাস্কর্য্য, সবুজ বনানী, শষ্য-শ্যামলিমার যে চিরন্তন ভালোবাসা, যাকে ঘিরে তার স্বপ্নের পৃথিবী- সেই মহাবিশ্বের রূপ মাধুর্য্য যাতে ধ্বংস না হয়ে যায় সেই আশঙ্কায় কবি ভীত হয়েছেন বার বার। কারণ, জল-স্থল-অন্তরীক্ষ্যে তাঁর সর্বত্র বিচরণ। তাই প্রকৃতির জয়গানে মুখরিত কবি আক্ষেপের সুরে লিখলেন –
মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্থরে
দিক-দিগন্ত অবগুন্ঠনে ঢাকা-
তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরনা পাখা।
-দুঃসময় ২৫৭ পূঃ সঞ্চয়িতা
প্রকৃতি পর্যায়ে বহু সঙ্গীত রচিত হয়েছে তাঁর হাত দিয়ে। যা তিনি তাঁর অন্তরের আবেগে আপ্লুত হয়ে রচনা করেছেন। শান্তিনিকেতনের গাছের ছায়ায় বসে রচনা করেছেন অজস্র কবিতা। গেয়েছেন গান। শান্ত নিরালায় বসে সাধনা করে গেছেন আমৃত্যুকাল।
খোয়াই এর পাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতে কবি লিখলেন প্রকৃতির প্রতি তাঁর অন্তরের উজাড় করা প্রেম প্রবাহের কথা-
পশ্চিম বাগান বন চষা খেত
মিশে গেছে দূর বনান্তে বেগনি বাষ্পরেখায়
মাঝে আম জাম তাল তেঁতুলে ঢাকী সাঁওতাল পাড়া
পাশ দিয়ে ছায়াহীন দীর্ঘ পথ গেছে বেঁকে,
রাঙা পাড় যেন সবুজ শাড়ীর প্রান্তে কুটিল রেখায়।
– খোয়াই-৬১৩ পূঃ সঞ্চয়িতা
সবুজ প্রকৃতি তাঁকে যেন প্রতি নিয়ত হাতছানি দিয়ে ডাকে। তিনি সর্ব্বসাধারনের হয়েও প্রকৃতির প্রেমে অবিচল থেকেছেন নিরন্তর। তিনি যে, অসীম অনন্তে মিশে থাকা এক ঋষি পুরুষ। যাঁর তুলনা তিনি নিজেই। তাঁর ব্যপ্তির মধ্যেই বিস্তৃত রয়েছে মাটির সোঁদা গন্ধ, তাল গাছের সারি, কৃষ্ণচূড়া শিমুলের আদি নির্যাস, আর কলমিলতার শিকড়। তাইতো তিনি লিখতে পেরেছিলেন
এই মাঠ এই রাঙা ধূলি,
অঘ্রানের রৌদ্র লাগা চিক্কণ কাঁঠাল পাতাগুলি,
শীত বাতাসের শ্বাসে
এই শিহরণ ঘাসে,
কী কথা কহিল তোর কানে!
বহুদুর নদী জলে
আলোকের রেখা ঝলে,
ধ্যানে তোর কোন মন্ত্র আনে।
-পসারিনী ৫৮২পৃ: সঞ্চয়িতা
রবীন্দ্রনাথ প্রতিবিশ্ব ফলকে আটকে থাকা এক নির্বাণ। মুক্তির অভেদ্য অন্ধকারে ঝলসে ওঠা এক ঝলক জীবন্ত রোদ্দুর। কতটুকু জেনেছি তাকে। কতটুকুই বা চিনেছি তার ব্যপ্তিময় আকাশ। তিনি যে অনন্ত- অসীম। মহাসাগরের মত বিস্তৃত তাঁর চেতনার নির্মান। মহাবিশ্বের সীমাহীন দুর্ভেদ্য অন্ধকারেও খুঁজে বেড়িয়েছেন নির্মল প্রকৃতির অমলিন মাধুৰ্য্যময়তা।
রাঙামাটির ধূলিপথে হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছেন বট-অশ্বত্থের ছায়ায়। কখনও বা ভাসিয়ে দিয়েছেন নিজেকে বাউলের একতারার সেই মেঠো সুরের নির্জন দুপুরে। আবার কখনও সৃষ্টির উল্লাসে গেয়েছেন গান, লিখেছেন কবিতা। তাইতো তিনি এই নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলতে পেরেছিলেন
যত বড় হোক ইন্দ্রধনু সে
সুদুর আকাশে আঁকা
আমি ভালোবাসি মোর ধরণীর প্রজাপতিটির পাখা।
-৬৯১ পৃঃ (৩৩) সঞ্চয়িতা
কি ভয়ঙ্কর উপলব্ধি তাঁর। তাই তিনি ব্যতিক্রমি। তাই বিশ্বের আকাশে তিনি উজ্জ্বল নক্ষত্র স্বরূপ। তাঁর অতিন্দ্রীয় দৃষ্টিতে দেখা দৃশ্যমান প্রকৃতির বিভিন্ন সময় কালের বিভিন্ন দৃশ্যপটগুলি কল্পনা- প্রসূত হলেও বাস্তবের মাটিতে সাদৃশ্য বজায় রেখেছেন তিনি। তাই তো তিনি আমাদের মন ও আত্মার পরম বন্ধু। প্রকৃতির সমস্ত নির্যাসটুকু নিংড়ে নিয়েছেন কবি। তিনি তাঁর গান ও কবিতার ছন্দে ছন্দে বুনে গেছেন বিশ্ব প্রকৃতির ভূবন মোহিনী রূপকো যে অপার সৌন্দর্য্য লুকিয়ে আছে এই আসমুদ্র হিমাচল জুড়ে তা তিনি তাঁর শব্দ বিন্যাসের মধ্যেই ধরে রেখেছেন এমন সব সৃজনশীল কাব্য যা আমাদের অন্তরে গাঁথা হয়ে থাকবে চিরদিন। এই বিশ্ব বরেন্য কবির দেওয়া উপহার আমাদের চলমান মানব জীবনের এক পরম প্রাপ্তি। তাই আজ দিকে দিকে বেজে উঠুক শঙ্খ, তাঁর জয়গানে মুখরিত হয়ে উঠুক এই মহান ‘ঋষির শ্রুতিতে
মধুর তোমার শেষ যে না পাই, প্রহর হল শেষ –
ভূবন জুড়ে রইল লেগে
দিনান্তের এই এক কোনাতে
আনন্দ-আবেশ ।
সন্ধ্যা মেঘের শেষ সোনাতে মন যে আমার গুঞ্জরিছে কোথায় নিরুদ্দেশ
-৬৭০ পুঃ সঞ্চয়িতা
আমরা একদিকে যেমন দেখেছি তাঁর প্রতিবাদী স্বত্তার গর্জন আর অপর দিকে দেখি তাঁর কোমল হৃদয়ের উন্মুক্ত দুয়ারে রাখা ক্ষমা ও প্রেমকে। তিনি ছিলেন ভালোবাসার কাঙাল। তাঁর অন্তর নিহিত দহন জ্বালায় প্রকৃতির অপার ভালোবাসার সাগরে ডুব দিয়ে তিনি তুলে আনলেন অমূল্য রতন। যা আমাদের মৌন চেতনাকে জাগরিত করার প্রেরণা যোগায়। তাই তিনি আজও বিশ্ব বরেন্য। তাই, অসীমের মাঝে গাইলেন জীব ও জীবনের গান
সীমার মাঝে, অসীম তুমি বাজাও আপন সুর।
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর।
কত বর্ণে কত গন্ধে, কত গানে কত ছন্দে
অরূপ, তোমার রূপের লীলায় জাগে হৃদয়পুর
আমার মধ্যে তোমার শোভা এমন সুমধুর।
-সীমায় প্রকাশ ৪৬১ পূঃ সঞ্চয়িতা
সত্যি! কি ব্যঞ্জনাময় অভিব্যক্তি। তাই আজও তিনি মহাবিশ্বের যাত্রী হয়েও অমলিন থেকে গেলেন বিশ্ব মানবের হৃদয়ে। প্রকৃতির ভারে তার হৃদয় নিসৃতঃ প্রেম যেন তরঙ্গায়িত সমুদ্র ফেনার মত উথলে ওঠে। হৃদয় কম্পিত হয়ে ওঠে বারবার। এই সবুজ পৃথিবী যেন চিরসবুজ থাকে চিরকাল আমার আপনার সকলের অন্তরে।
হে-কবীন্দ্র, তোমার অদৃশ্য স্পর্শেই হোক আমাদের নির্বোধ চেতনার বোধোদয়। আমরা যেন তোমার পথের অনুসারী হতে পারি হে তাপস । যে বিশ্ব আজ দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে ধ্বংসের পথে, যে বিজ্ঞানের বদান্যতায় হারিয়ে যাচ্ছে তোমার স্বপ্নের সবুজ পৃথিবী, হে মহাবিশ্বের যাত্রী তোমার অনন্ত অসীম জ্ঞানভান্ডার থেকে পরিশীলিত এমন চিন্তার তির বিদ্ধ করো এ মানব চেতনায়। এ-বিশ্বের মানবতা জাগরিত হোক আর বার তোমারই সঙ্গীত ধ্বনিতে
জনগণমন অধি নায়ক জয় হে বিধাতা পঞ্জাব ও সিন্ধু গুজরাট ও মারাঠা দ্রাবিড় উৎকল বঙ্গ।
