
পারমিতা চক্রবর্ত্তী ভট্টাচার্য্য : ইংল্যান্ডের ব্রিস্টলে আর্নস ভ্যাল সমাধিস্থলে চিরনিদ্রায় শায়িত আমাদের ঘরের মানুষ। গিয়েছিলেন মুঘল সম্রাট এর দূত হয়ে, কিন্তু ফিরে আসার আগেই মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হয়ে আর ফেরা হল না হুগলীর সেই আধুনিকচেতা যুগপুরুষটির। ব্রিস্টলেই রয়েছে ১৯৯৭ সালে নির্মিত তাঁর মর্মর মূর্তি। হুগলীর খানাকুলের নিকট রাধানগর গ্রাম, এক বৈষ্ণব মতাবলম্বী সাধারণ ব্রাহ্মন পরিবার, আদি উপাধি ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই বংশেরই কৃষ্ণকান্ত, মুঘল সম্রাট ফারুকশিয়ারের সময়কালে বাংলার সুবেদারের কাছে আমিনের কাজে নিযুক্ত ছিলেন। সম্ভবত সেই হেতু জীবিকার সময় থেকেই তাদের রায় উপাধি প্রাপ্তি হয়, বন্দ্যোপাধ্যায় পদবী আর ব্যবহার হয় নি।
তখন বাংলায় জমিদারি প্রথা রয়েছে, রাজা রাজরার যুগ বিগত অনেক আগেই, ক্রমে ক্রমে দিল্লিতে মুঘলদের আধিপত্য অস্তমিত হচ্ছে, বাড়ছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দাপট। এই সময় কোনো ভারতীয়ের নতুন করে রাজা হওয়া মুখের কথা নয়। কিন্তু এমনটাই হয়ে ছিল। সাম্রাজ্যের নিরিখে নয়, সম্মানের নিরিখে রাজা হয়ে ছিলেন কৃষ্ণকান্তের এক উত্তরসূরি। কৃষ্ণকান্তের কনিষ্ঠ পুত্র ব্রজবিনোদ। ব্রজবিনোদের পুত্র রামকান্ত। রামকান্ত ও তারিণীদেবীর সুপুত্র রামমোহন।

রাজা রামমোহন রায়, বাংলার নবজাগরণের জনক, ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা, দার্শনিক, সমাজ সংস্কারক, লেখক যিনি পাশাপাশি পারদর্শী ছিলেন অনেকগুলি ভাষায় আর অর্জন করেছিলেন প্রগাঢ় জ্ঞান। গ্রামের পাঠশালাতে তার শিক্ষার হাতেখড়ি, এখানেই তিনি শেখেন বাংলা, সংস্কৃত, পারসি। এরপর সম্ভবত তাঁর যখন ৭ বছর বয়স তখন তাঁকে পাটনা পাঠানো হয়, সেখানে এক মাদ্রাসায় তিনি দেখেন আরবী ও ফারসী। এর দুবছর পর ৯ বছর বয়সে তিনি আরো উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে থেকে বেনারস যাত্রা করেন। বেদ, বেদান্ত উপনিষদের ওপর বিশেষ জ্ঞান লাভ করেন। তারপরে কর্মজীবনের সাথে সাথেই তিনি ইংরেজী, গ্রীক ও হিব্রু ভাষাও শেখেন। তাই অচিরেই তিনি নিজ গুনে ও পাণ্ডিত্যের জন্য দিল্লির বাদশাহ কর্তৃক দায়িত্ব পান বিলেতে গিয়ে রাজদরবারে, দিল্লির বাদশাহের ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ করার। আর দিল্লির বাদশাহ কর্তৃকই তিনি “রাজা” উপাধি পান।
সেসময় প্রায় মাস ছয়েক লেগেছিল তাঁর বিলেতে পৌঁছতে। ১৮৩০ খ্রীষ্টাব্দের ১৯ নভেম্বর তিনি কলকাতা থেকে বিলেত যাত্রা করেন এবং ১৮৩১ খ্রীষ্টাব্দের ৮ এপ্রিল লিভারপুলে পৌঁছলেন। সেখানে সম্ভ্রান্ত ও বিদ্বৎসমাজে তাঁর প্রচুর সমাদর হয়েছিল। ১৮৩২ খ্রীষ্টাব্দের শেষের দিকে কিছুদিনের জন্য তিনি ফ্রান্সেও গিয়েছিলেন। জীবনের শুরুতে পড়াশোনা শেষে তিনি অর্থ উপার্জনের জন্য কর্মজগতে প্রবেশ করেন।

১৮০৩ থেকে ১৮১৪ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে তিনি দেওয়ানরূপে রংপুরে কাজ করেন। আর এই সময়ের মধ্যে তিনি দু’বার ভূটান সীমান্তে যান কোম্পানির হয়ে দৌত্যকার্যে নিযুক্ত হয়ে। ১৮১৫ খ্রীষ্টাব্দ থেকে রামমোহন কলকাতার স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন এবং এসময় থেকেই প্রকাশ্যে তাঁর সামাজিক সংস্কার-প্রচেষ্টার শুরু।
এতদিন কোম্পানির কাজে বিভিন্ন দায়িত্বে সামলানোর ফলে তাঁর চিন্তায় আসে পরিপক্কতা, কোম্পানির অসামরিক কর্মচারীদের ও নানা কাজে সাহায্য করতে করতে রামমোহনের যেমন ইংরেজী শিক্ষা আরো পরিণত হন তেমনই সেসব বিদেশিদের সাথে মিশে তাঁর ভাবনায় আসে ইউরোপীয়ান প্রভাব। যার জন্য তৎকালীন নিজ দেশের ধর্মীয় কুসংস্কারগুলি ভীষণ ভাবে নাড়া দেয় তাঁকে, উপলব্ধি করেন যে বহুবিবাহ, বাল্য বিবাহ, সহমরণ বা সতীদাহ প্রথার মত কুপ্রথাগুলির বিলোপ সাধন আশু কর্তব্য।

বেদ বেদান্ত থেকে জ্ঞান আহরণ করে সমাজের ধ্বজাধারি গোঁড়া পণ্ডিতদের বিবিধ সামাজিক প্রথার অযৌক্তিকতা প্রমাণ করে দিতেন। তিনি বেদ বেদান্ত পড়ে তার থেকে মূল তত্ত্বটা গ্রহণ করেছিলেন। ধর্মীয় সংকীর্ণতার সেইযুগে দাঁড়িয়ে তিনি তাই দৃপ্ত কন্ঠে বলতে পেরে ছিলেন যে সমাজের রীতি আচার এগুলো নেহাৎই কুসংস্কার। পৌত্তলিকতায় বিশ্বাস করতেন না, ছিলেন একেশ্বরবাদী। সেই উদ্দেশ্য নিয়েই ব্রহ্মনিষ্ঠ একেশ্বর উপাসনার মত প্রচার করতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন আত্মীয় সভার। পরবর্তীকালে এই আত্মীয় সভাই ব্রাহ্ম সমাজ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৮২৮ এ বিলেত যাবার আগেই তিনি কলকাতায় দ্বারকানাথ ঠাকুরের সাথে ব্রাহ্ম সমাজের প্রতিষ্ঠা করেন।
এর পরেরটা ইতিহাস। ব্রাহ্ম সমাজকে কেন্দ্র করে সেসময় এক বৃহৎ ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলনের সূচনা হলো। সমাজের মধ্যে মত বিভাজন এর মধ্যে দিয়ে একটি অস্থির অবস্থা উপস্থিত হয়েছিল। একদিকে গোঁড়া ব্রাহ্মন্যবাদ ও তাঁদের অনুসৃত পৌত্তলিকতা ও সংস্কারের আচার বিচারের বেড়াজাল, অন্যদিকে রামমোহনের দেখানো পথে একেশ্বরবাদী ও ধর্মীয় কুসংস্কার ও কুপ্রথাগুলির ওপর উপর্যুপরি যুক্তির আঘাত হানা ব্রাহ্ম আন্দোলন। সমাজে মত প্রতিষ্ঠার এই লড়াই সহজ ছিল না সেদিন তাই রামমোহন কলম ধরলেন। পড়া হয়ে গিয়েছিল উপনিষদ সমূহ। বেদ বেদান্ত শাস্ত্রেও তিনি ছিলেন সর্বজ্ঞ।

সুতরাং নিজের একেশ্বরবাদের সমর্থনে তিনি যেসমস্ত বেদান্ত সূত্র ও উপনিষদে ব্যাখ্যা পান, সেগুলোই তিনি সর্বসাধারণের জ্ঞানের গোচরে আনার জন্য বাংলায় অনুবাদ করতে শুরু করেন। এসময়েই তিনি খুঁজে বের করেন সতীদাহকে অশাস্ত্রীয় প্রমাণের ক্ষেত্র গুলিও। এই প্রসঙ্গে লিখলেন ‘প্রবর্তক ও নিবর্তকের সম্বাদ’ নামক একটি। তার প্রতিবাদের ওপর একটি বই বেরল ‘বিধায়ক নিষেধকের সম্বাদ’। এভাবেই বহুদিনের কুপ্রথা তুলে দেবার কথাতেই তার কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা হয় বারেবারেই, তবুও দীর্ঘ লড়াইয়ের ফলশ্রুতিতে শেষমেষ আইন করে সহমরণ-রীতি নিষিদ্ধ করা হয়।
এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে একেবারে প্রথমে তাঁর মনে একেশ্বরবাদের যে ভাবনার বীজ বপন হয়েছিল সেটা হয়ত তাঁর বাল্যকালে আরবী, পারসি ভাষা শেখার সময় সেই আনুষঙ্গিক ধর্মগ্রন্থ পড়ার প্রভাব। তাই তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ফারসী ভাষায় লেখা (ভূমিকা অংশ আরবীতে) “তুহফাতুল মুবাহ্ হিন্দীন” যে বইটিতে একেশ্বরবাদকেই সমর্থন করা আছে। আর এই বই তিনি রচনা করেছিলেন মুর্শিদাবাদে বসে। সেসময় তিনি তাঁর শুরুর দিকের কর্মজীবনের সূত্রে সেখানেই ছিলেন। মূলত ১৮১৫ থেকে ১৮১৮ তিনি বেশির ভাগ বই লেখেন। সাহেবদের বাংলা শেখানোর জন্য তিনি বাংলা ও ইংরেজিতে ব্যাকরণ রচনা করেন।

কিন্তু নানা প্রতিকূলতার মাঝে সতীদাহ প্রথা রদ করার লড়াইয়ে বিজয়ী হয়ে তিনি বিল পাশ করিয়ে আনলেও এরপর শুরু হলো আর এক সমস্যা। এটি সহজে প্রাচীনপন্থীরা হার স্বীকার করতে নারাজ ছিলেন। বারবার নানা বিতর্কে নানা শাস্ত্রজ্ঞ আলোচনায় তারা পরাস্থ হয়েছেন রামমোহনের কাছে। বহুদিনের সামাজিক রীতনীতির খোলনলচে উপড়ে ফেলে রামমোহন তাঁর চিন্তা ধারায় দীক্ষিত করে ফেলেছেন যুবসমাজকে। বই লিখে প্রমাণ করে সকলের জ্ঞানের দুয়ার খুলে দিয়েছেন সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। শেষ অবধি সতীদাহ প্রথা রদ করার বিল পাশ হলে তারা সির্দ্ধান্ত নেয় প্রয়োজনে বিলেতের দরবারে উচ্চ আদালতে সুপারিশ করা হবে তাদের তরফে, বিলটি পুনর্বিবেচনা করার জন্য। সুতরাং আবার সংঘাত শুরু হল। এবারে রামমোহন ও স্থির করলেন তিনি নিজে সশরীরে বিলেতে গিয়ে যুক্তি দিয়ে বিলটির স্থায়ীত্ব রক্ষায় সচেষ্ট হবেন। সুযোগও এসে গেলো, দিল্লির বাদশাহের হাত ধরে। সুতরাং বলা যেতে পারে ১৮৩০ এ তার বিদেশ যাত্রা মূলত দুটি কারণে, এক, সতীদাহ প্রথা বিলোপ এর বিলটির জন্য উদ্যোগী হয়ে আর দুই, এদেশের তৎকালীন বাদশাহের ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশ করে।

১৮৩৩ এই বিদেশে দেহত্যাগ। দেশে ফেরা আর হয় নি। কিন্তু তাঁর তৈরী ব্রাহ্ম সমাজ রয়ে গিয়েছিল। সেই ব্রাহ্ম সমাজ পরবর্তী কলে তাঁর আদর্শ মতই চলে এক বৃহৎ সামাজিক সংস্কারমূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। এই আদর্শে ভবিষ্যতের অনেক মনীষী অনুপ্রাণিত হয়ে ব্রাহ্ম মতে দীক্ষিত হয়ে সমাজের সঠিক চেতনা প্রসারে ব্রতী হয়েছেন। মৃত্যুর পরেও রামমোহন যেন বেঁচে ছিলেন তাঁর ব্রাহ্ম সমাজের মধ্যে দিয়ে, আর আজও আমাদের প্রজন্মের কাছে ও রামমোহন আর তাঁর ব্রাহ্ম সমাজ যেন সমার্থক।
সেদিনের সেই চিরায়ত প্রথার বিরুদ্ধে লড়ে, সামাজিক কিছু পৈশাচিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলে যিনি সমাজের এক বড় অংশের সাথে অসম যুদ্ধের সাহস রেখেছিলেন, তাঁর কি কোনো নিজস্ব উদ্দেশ্য সাধন করার ছিল? কেনই বা নিজের সপক্ষে যুক্তি খাড়া করতে এত এত পড়াশোনায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন? মেধাবী আর বুদ্ধিদীপ্ত যুবক হয়ে আর পাঁচজনের মতও তো তিনি নিশ্চিন্তে উপার্জন করে আরামের জীবন কাটাতেই পারতেন। কিন্তু বাংলার নবজাগরণ ঘটাতে, বাঙালিকে নবজাগরণ বোঝাতে হয়ত তার আগমন পূর্বপরিকল্পিত। তার জীবনটাই ছিল নিজের জন্য নয়, সবার জন্য। তাই তো তিনি রাজা হয়ে গেছিলেন, কারণ রাজা তাকেই হতে হত। জন্মদিনে আপামর বাঙালির সশ্রদ্ধ প্রণাম রাজা রামমোহনকে।

