
কিশলয় মুখোপাধ্যায়:
ওঁ ধ্যেয় সদা সবিতৃমণ্ডলমধ্যবর্তী,
নারায়ণঃ সরসিজাসনসন্নিবিষ্টঃ।
কেয়ুরবান কনককুণ্ডলবান কিরিটী হারী
হিরন্ময়ব পুর্ধ্বতশঙ্খচক্র।।
নারায়ণ দেবতার ধ্যান। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে এখানে একটি বা একাধিক কালো রঙের পাথর রয়েছে আর তাঁর মাথায় রয়েছে চন্দন ও তুলসী পাতা। একে শালগ্রাম শিলা বা শালিগ্রাম শিলা বলে। এই শিলাকে নারায়ণ জ্ঞানে পুজো করি। যেমন আমরা শিব লিঙ্গ কে শিব জ্ঞানে পুজো করি। অনেক বাড়িতে নারায়ণ শিলা রয়েছে ভিন্ন নামে। যেমন দামোদর, বনমালী। কখনও সে শ্রীধর, ব্রহ্মশিলা, হয়গ্রিব, ত্রিবিক্রম, গোবর্ধন, বৈকুন্ঠ। এরকম মোট ৬৪টি নাম রয়েছে।

হুগলি জেলার গুড়াপ ও আশপাশ এলাকায় ৬দিন দোল খেলা হয়। এর মধ্যে তেলাকোনায় সতী মায়ের দোল ছাড়া বাকি গুলো নারায়ণ দেব। যেমন দোলের দিন রাধাবল্লভ জীউর দোল, প্রতিপদের দিন নন্দদুলাল জীউর দোল, পঞ্চম দোল হল গোপীনাথ জীউর দোল আর রামনবমীর দিন তাম্বুলি পাড়া বা আষ পাড়ায় শ্রীধর জীউর দোল। এরমধ্যে গোপীনাথ মন্দিরে শ্রীচৈতন্যদেব এসেছিলেন। শচীদেবীর পুত্র নিমাই নারায়ণ শিলাকে বলতেন কৃষ্ণ কলেবর। তিনি রঘুনাথ দাসকে বলেছিলেন। ‘জল তুলসী সেবায় তাঁর যত সুখদয়।/ ষোড়শোপচারে পূজায় তত সুখ নয়।’ প্রথম কথা হচ্ছে জল অর্থাৎ প্রতিদিন স্নান করাতে হয়। নির্দিষ্ট মন্ত্র আছে। পুরাণ মতে তুলসী দেবীর অভিশাপে নারায়ণ শালগ্রাম শিলায় পরিণত হয়। এই শিলা হল অ্যামোনাইট কোষের জিবাশ্ম যা পাওয়া যায় নেপালের মুস্তং জেলার ধৌলগিরির কাছে গোণ্ডকী নদীতে। পুরাণে উল্লেখ রয়েছে যে বিষ্ণু গোণ্ডকীর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন তোমার ধর্মজ্ঞান, নিষ্ঠা, সেবা তথা পতিপরায়নতাতে আমি সন্তুষ্ট। বল তোমার কী প্রার্থনা। গণ্ডোকী বলেছিলেন যুগ যুগ ধরে নারাযণ যেন আমার সাথে থাকেন। বিষ্ণু বলেন তথাস্তু আজ থেকে তুমি হবে পূণ্যসলিলা গণ্ডকী নদী আর আমি থাকবো শালগ্রাম শিলা রূপে। তাই নদীর অপর নাম নারায়ণী বা শালগ্রামী। আদি শঙ্করাচার্যের সময় কালের রচনায় শালগ্রাম শিলাকে পুজো করার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়।

নারায়ণ শিলা নিয়ে লিখতে গেলে অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় দুটো বই এর কথা। ‘শালগ্রাম শিলার সন্ধানে’ আর ‘ভগবান বিষ্ণু ও শালগ্রাম শিলা’। বই দুটি লিখেছেন অশোক রায়। প্রথম বইটি অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। তিনি বৈজ্ঞানিক ও শাস্ত্রীয় দৃষ্টিকোন থেকে প্রাঞ্জল ভাষায় লিখেছেন যা আমাদের মতো সাধারণ পাঠকদের মনকে সমৃদ্ধ করে। কঠিন কথা বুঝতে সুবিধা হয়। তিনি লিখেছিলেন সূর্যদেব যেমন আমাদের পার্থিব অস্তিত্বের জাজ্বল্যমান সাক্ষর। তেমনই শালগ্রাম শিলাও এক দার্শিনকতার দিশা- যেন মহাকালের রথের গোড়া।

দামোদর, নন্দদুলাল, কেশব বা মাধব যে নামেই ডাকিনা কেন নারায়ণ দেবের পুজো ছাড়া কোনরকম শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়না। এই শিলাকে আমরা পবিত্র মনে নারায়ণ রূপে পুজো করি। ওঁ নমঃ নারায়নায় নমঃ। সবার প্রার্থনা বিষ্ণুর কছে যে জগতের ভালো কর।
