সীতাভোগ – এক মিষ্টি কাহিনী

আমাদের বাংলা বিখ্যাত তাঁর মিষ্টির জন্য, পশ্চিমবাংলার জেলাগুলির ভাণ্ডারে রয়েছে অজস্র জিভে জল আনা মিষ্টি। এমনই এক মিষ্টি  বর্ধমানের সীতাভোগ। সীতাভোগের ইতিহাসের সুলুক সন্ধানে সংবাদ প্রতিখনের সাংবাদিক আত্রেয়ী দো

বর্ধমান হয়ে মালদা আসার পথে বাবা একটা মিষ্টির প্যাকেট এনে ব্যাগে ভরে দিয়েছিল। ট্রেনে উঠে কিছুটা রাস্তা যাওয়ার পর প্যাকেটটা খুলে দেখি, প্যাকেট ভর্তি সীতাভোগ।ছোটো থেকেই আমি মিষ্টির পোকা, যদিও বড় হওয়ার পর অনেক কষ্টে লোভ সামলে চলি। তাই নিজের প্রিয় মিষ্টিগুলো বাড়িতে প্রায় আনা হয়না বললেই চলে। কারণ ওগুলো আসলে আমার ডায়েটিং মাথায়। যাই হোক, এতদিন পরে নিজের প্রিয় মিষ্টি হাতের মুঠোয় পেয়ে আমাকে আর পায় কে। বাবাকে মনে মনে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারলাম না,ঠিক মনে করে সীতাভোগ কিনে এনেছে।প্রথমেই এক চামচ সীতাভোগ মুখে পুরলাম,উফফ্,স্বর্গ। কিন্তু তারপরেই মাথায় একটা চিন্তা ভর করল। আচ্ছা, এই সীতাভোগ আবিষ্কার হল কীভাবে? আর নামটা সীতাভোগই বা হল কেন?

ব্যাস চিন্তা মাথায় আসতেই তথ্য সন্ধানে চলে গেলাম। চলুন,এবার আপনাদেরকে এই সীতাভোগ আবিষ্কারের কাহিনীটি শোনানো যাক।

ব্রিটিশ আমলে সাহেবদের আপ্যায়নের জন্য বাংলায় বহু ধরনের মিষ্টি প্রস্তুত করা হয়েছে। সীতাভোগ আবিষ্কারের কাহিনীটিও তার ব্যতিক্রম নয়। সীতাভোগ আবিষ্কারের ইতিহাস জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে ১১৯ বছর। তখন বর্ধমানের রাজা ছিলেন বিজয়চাঁদ মহাতাব। সেই সময় বাংলায় বড়লাট ছিলেন লর্ড কার্জন। ১৯০৪ সালের আগস্ট মাসে বড়লাটের বর্ধমানে যাওয়ার খবর ঘোষণা করা হয়। ইংরেজ সরকারের পক্ষ থেকে মহারাজা বিজয়চাঁদ মহাতাবকে ‘রাজাধিরাজ’ উপাধি দেওয়া হয়। সেই উপলক্ষে বর্ধমানের গোলাপবাগে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বড়লাটের অভ্যর্থনায় মহারাজা বিজয়চাঁদ নির্মাণ করেন এক বিরাট গেট, যা বর্তমানে ‘কার্জন  গেট’ নামে পরিচিত। তবে ওই অনুষ্ঠানে কেবল বড়লাটই নন, উপস্থিত ছিলেন বহু গণ্য-মান্য ব্যক্তিত্ব। অতিথি আপ্যায়নের জন্য নানাবিধ সুস্বাদু খাবার তো হবেই, কিন্তু শেষপাতে মিষ্টি না থাকলে কি হয়! মহারাজা বিজয়চাঁদ বর্ধমানের এক বিখ্যাত মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক ভৈরবচন্দ্র নাগকে একটি নতুন স্বাদের বিশেষ মিষ্টি তৈরি করতে নির্দেশ দেন। মহারাজের নির্দেশে প্রথম ভৈরবচন্দ্র নাগ প্রস্তুত করেন এই *সীতাভোগ*।

আবার শোনা যায়, ভৈরবচন্দ্র নাগের পূর্বপুরুষরা ছিলেন রাজাদের খাস মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক। প্রথম সীতাভোগ বানিয়েছিলেন ভৈরবচন্দ্র নাগের প্রপিতামহ ক্ষেত্রনাথ নাগ। তবে তার আকৃতি ছিল ভিন্ন। বর্তমানে আমরা যে আকৃতির সীতাভোগ দেখি তার আবিষ্কর্তা ভৈরবচন্দ্র নাগ।

আচ্ছা এই তো হল প্রস্তুতকারকের নাম আর প্রস্তুতির কারণ। এবার আসি, সীতাভোগ নামকরণের কারণ কি। এই নিয়ে নানা দ্বিমত আছে। একপক্ষের মতে সীতাভোগের প্রধান উপকরণ হল *সীতাসের* চাল। সেই কারণেই এই মিষ্টির নাম সীতাভোগ।জানা যায়, বর্ধমান জেলার এক বিশেষ অঞ্চলেই পাওয়া যেত এই সীতাসের নামক গোবিন্দভোগ চাল।সীতাভোগের নিজস্ব স্বাদ ও সুগন্ধের চাবিকাঠিই হল এই সীতাসের চাল। অপরপক্ষের মতে ‘সিতে’ শব্দের অর্থ সাদা বা মিছরি। এই মিষ্টি দেখতে সাদা রঙের মিছরির মতো, তাই নাম হয়েছে সীতাভোগ। সুকুমার সেনের মতে নামটি *সিতাভোগ* হওয়া উচিত ছিল।

প্রস্তুতি :  সীতাসের চালের গুঁড়া এবং ছানা ১:৪ অনুপাতে মিশিয়ে পরিমাণ মতো দুধ সহযোগে ভালোভাবে মেখে নেওয়া হয়। তারপর বাসমতি চালের আকৃতিতে তৈরি একটি পিতলের পাত্রে মিশ্রণটি ঢেলে নেওয়া হয়। ওই পাত্র থেকে মিশ্রণটি গরম চিনির রসে ফেলে দেওয়া হয়। তাই, সীতাভোগের আকৃতি বাসমতি চালের মতো লম্বা ও সরু হয়। তবে, সবসময় সীতাসের চাল পাওয়া যায় না, তাই অন্য প্রজাতির গোবিন্দভোগ বা বাসমতি চালের গুঁড়া দিয়েও সীতাভোগ বানানো হয়। ছোট ছোট গোলাপজাম বা কাজুবাদাম, কিশমিশ, চেরি সহযোগে সীতাভোগ পরিবেশন করা হয়।

শোনা যায়, বড়লাট কার্জন এই সীতাভোগ খেয়ে এতো অভিভূত হন যে তিনি ,যেকোনো সরকারি অনুষ্ঠানে সীতাভোগ বাধ্যতামূলক করেছিলেন। বর্তমানে ভারতীয় ডাকবিভাগ সীতাভোগের ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই, ডাকটিকিটের ওপর এখন দেখা যাবে সীতাভোগের ছবি। সীতাভোগের অতুলনীয় স্বাদের খ্যাতি শুধু বাংলা নয়, বাংলার বাইরেও বহুলাংশে ছড়িয়ে পড়েছে।

এই মিষ্টির স্বাদে মজে অনেক সাহিত্যিকরাই মজার রসালো লেখা লিখেছেন। শরীরটা আজ বেজায় খারাপ’ এর একটি গানের লাইন ছিল –

“বাগবাজারের রসগোল্লা, ভীম নাগের সন্দেশ /

বর্ধমানের সীতাভোগ মিহিদানা দরবেশ। “

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading