ছোট গল্প (নিখোঁজ মন)

শিপ্রা ব্যানার্জী : কেমন ঝকমক কইরতো মনে আছে। আমার কলসে টায় সূর্য মানিকের আলো এইসে পরতো,উর ছ’টায় চোখ ঝইলসে যেতো। কাঁসার গাঁগড়ি যেন সোনার আলো ছড়ায় দিতো। নদী রূপাই সেও নেচে, হেলেদুলে পাড় কাঁপিয়ে চইলতো আমারই মতো। দেখে মনে হতো পিরীতের জোয়ার লেগেছে,  তাই নদী রূপাই রঙ্গ তামাশায় মেতেছে। আমারও তখন আগুন লাগা শরীর, ওর বুকে ঝাপিয়ে ডুব সাঁতার খেলা চইলতো। সে এক দিন ছিলো বটে। জল খেলা খেইলতে ক্লান্ত দেহটা নিয়ে ঘর পানে চইলতাম। মাথার চুল টুপায়ে জল পরতো মনে হতো যেনো পায়ের মলের ঝনঝন শব্দে সুর মিলাই গান গাইছে মনোহরটার মতই। বাপুটা দেখেই বলতো, ঐযে লছমী এলো, আমার মেইয়ে গো, আমার রাজকন্যা। মেয়ে টারে আমার খেইতে দেরে,  ইস্কুল যাবেক মেয়েটো, পড়ি লিখি কইরে উই শহর পানে যাইবে গো। উ দিদিমণি হইবেক গো আমার লছমী।

বাপুর চোইখে তখন চকচক করে উইঠতো আলো। বড়ো ভালো লাগতো লছমীর। লছমী-স্কুল পানে চইলতো। বেলা ঘুরে ঘুরে দিনের আলো কমতে থাকে। সাঁঝের বেলায় নদীর ওই পারের আকাশে সিঁদুর গুলে কে যেন ঢেইলে দিছে। নদীর জলে আলো-আধাঁরের খেলা। ভানুমতীর খেলের মতো ওই সূর্যটা নিখোঁজ হ’য়ে যেতো। ঘরে ঘরে পিদিম গুলান জ্বলে উইঠলে মনে হতো আকাশের ওই তারা গুলান জ্বলছে, লছমীর খুব ভালো লাগে, কেমন যেন হয় শরীরটার মধ্যে,  মনোহরন হয় ওর।

দিন যায়,  মাস যায় লছমী ইস্কুলে পড়ে দিদিমনিরা ও খুব ভালোবাসে। শহরের সব বাবুরা বই-পত্তর দিয়ে দিদিমনিদের শহর থেকে পাঠায় ।বিনি পয়সায় ওরা পড়া লেখা করে।

লছমীর একটা গোপন কারন আছে ও মনোহরের সাথে আলাপ করে,  বাঁশি বাজানো শোনে খুবভালো ই লাগে। উয যখন বাঁশিটো বাজায় তখন বুকটোর মধ্যেই কাঁপন ভালো লাগে। মনোহরের চুল গুলো ধরে নাড়িয়ে দিতে মন চায়। উ কি বুঝতে পারে, হাতটা ধরে টেনে লয় বুকের মধ্যে। সেদিন এমনই দূজন হাসি মজা করছিলো। হঠাৎ আকাশ আলো করে হাওয়া উঠলো, কর্ কর্ শব্দ করে বাজ পরতে লাগলো,  পড়ি মড়ি ছুট মনোহরের ঘরটোতে। দূজনে ভিজে পুরে একসার। আলোটা যেন ঘরে এসে পড়লো জোর আওয়াজে ভয় পেয়ে লছমী মনোহরকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। আর কিছু মনে রইলো না শুধু একরাশ ভালো লাগায় চুপ লছমী। যখন হুঁশ ফিরলো, বাদলা তখন ফিকে হয়ে গেছে,  কিন্তু লছমীর মনোহরের বুকে ফিকে হয়েই রয়ে গেল।  “আইসতে আমার মুখ টা তুইলে বইললো, এটা পিরীতের সোহাগ,  কোনো লাজ নাই এতে। আমিও চরম সুখে সুখী হয়ে ঘরের পানে পা বাড়ালাম। বেশ খুশি আনন্দেই দিন কাটতে লাগলো।” একদিন মনোহর বললো, লছমী ঘর বাঁধতে হবে। টাকা, পয়সা লাগবে রে শহরে যাবো রোজগার করতে। কাম করবো, তোকে বিয়া করবো, সংসার করবো। মুই তো খুশিতে টগবগিয়ে উঠলাম৷

মনোহর শহরে গেলো আর আমি উর পথ চেয়ে থাইকলাম। মনোহর শহরে একা গেলো বটে, আমার মনটোও নিয়ে গেলো। লছমী আর নদীতে ঝাপায় না, জল খেলা করে না। ভালো লাগে না কিছু। দিন যায়,  মাস যায় লছমীর দিন এগিয়ে যায়। কি করে ঢাকবে সে সোহাগের চিহ্ন,  বড়ো প্রশ্ন সামনে এসে যায়।

সভা বসে বিচার হয়, বাপুটা সব নিন্দা সহ্য করেও লছমীর হাতটা ধরে। বলে চল মা জগৎ তোকে শাস্তি দেইবে, আমি কি করে দেবো। ফসল না ফইললে জগৎ কি করে চইলবে? চল রে লছমী মা, আমরা অন্য দাওয়ায় যা-ই। নতুন ফসলের যতন বাড়াই। আর লছমী শহরে চলে যাওয়া মনোহরকে মন দিয়ে মনিহারা হয়ে বেঁচে থাকে।

কে দেবে এ-ই “”নিখোঁজ মন”” এর সন্ধান৷

ছবি ঋণ ট্রাইবহুলডটকম
error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading