মকর সংক্রান্তি

 

আত্রেয়ী দো: মকর সংক্রান্তি। পৌষ মাসের শেষ দিনে পালিত হয় বলে এটিকে এই বাংলায় পৌষ সংক্রান্তিও বলে। এই মকর সংক্রান্তি বা পৌষ সংক্রান্তি মূলত দক্ষিণ এশিয়ার উৎসব। গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জী অনুসারে এটি বছরের প্রথম উৎসব।  আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই উৎসব বিভিন্ন নামে নানানভাবে পালিত হয়ে থাকে। হিন্দুধর্মে এই দিনটিকে ঘিরে নানান লোককথা প্রচলিত আছে।

১.এই দিনটিকে মরশুমে নতুন ফসল ওঠার প্রথম দিন বলে মনে করা হয়। এই দিনটি ‘শস্যোৎসব’ হিসেবেও পালিত হয়।

২. এই দিনটিতেই সূর্যের দক্ষিণায়ন শেষে সূচনা হয় উত্তরায়নের। অর্থাৎ, শীত শেষের সূচনা বহন করে আনে দিনটি। সূর্য পূজার মাধ্যমে পালন করা হয় সূর্যের উত্তরায়ন।

৩. মহাভারতে এই দিনটির উল্লেখ আছে। কথিত আছে,দীর্ঘদিন শরশয্যায় থাকা ভীষ্ম এই দিন স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়েছিলেন।

৪. সংক্রান্তি শব্দের অর্থ হল ‘গমন করা’। পুরাণে কথিত আছে, সূর্যদেব এই দিনে তাঁর নিজের ছেলে মকর রাশির অধিপতি শনিদেবের গৃহে একমাসের জন্য বেড়াতে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ সূর্য নিজের কক্ষপথ ছেড়ে মকর রাশিতে গমন করে।তাই দিনটিকে শুভ বলে মনে করা হয়।

৫. শোনা যায়, এই দিনটিতে দেবতা ও অসুরদের যুদ্ধাবসান ঘটেছিল। জয়ী দেবতারা মৃত অসুরদের মুন্ডুপাত করে সেই কাটা মুন্ডুগুলি মন্দিরা পর্বতের পাদদেশে পুঁতে দিয়েছিলেন।তাই এই দিনটিকে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির সূচনাকাল বলে মনে করা হয়।

৬. ভোজনরসিক বাঙালির এই দিনটির প্রতি এক বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। প্রায় প্রতিটি বাঙালি বাড়িতেই এই দিন পিঠে-পুলি পার্বণ হয়। বানানো হয় হরেকরকম পিঠে।

৭. পশ্চিমবঙ্গে এই দিনটি ‘আউনি বাউনি’ বা আগলওয়া হিসেবেও পালিত হয়। দু-তিনটি ধানের শিষ বা খড় বিনুনি করে করে তার সাথে মূলোর ফুল, সরষের ফুল, আমপাতা ইত্যাদি গেঁথে ‘আউনি বাউনি’ করার রীতি আছে। এই আউনি বাউনি ধানের গোলা, খড়ের চাল, বাক্স-পেঁটরা ইত্যাদিতে গুঁজে দেওয়া হয় এবং পরে একটি পবিত্র ঘটে রেখে সারাবছর সংরক্ষণ করা হয়। বছরের প্রথম ফসলকে পবিত্র এবং সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে মনে করা হয়। এই আচারটি ‘ আউনি বাউনি’ নামে পরিচিত।

৮. ঘুড়ি ওড়ানোও এই দিনটি উদযাপনের অন্যতম অংশ। এটি ঘুড়ি উৎসব নামেও পরিচিত। এটি বাংলাদেশের একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী উৎসব। মুঘল আমল থেকে এই উৎসবটি পালিত হয়ে আসছে।

৯. এই দিনে নিজের গৃহেই রাত্রিবাসের নিয়ম মেনে চলেন অনেকেই। সংক্রান্তির আগে বাঙালি বাড়িগুলির অন্দরে রান্নার বাসনপত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার মাধ্যমে অশুভ শক্তিকে বিদায় জানানোর রেওয়াজ আজও রয়েছে।

বিভিন্ন দেশে এই দিনটি বিভিন্ন নামে পরিচিত। নেপালে এই দিনটি ‘মাঘি’, থাইল্যান্ডে ‘সংক্রান’, লাওসে ‘পি মা লাও’, মিয়ানমারে ‘থিং ইয়ান’এবং কম্বোডিয়ায় ‘মহাসংক্রান’ নামে এবং বাংলাদেশে ‘সাকরাইন’ নামে উদযাপিত হয়। নামের মতোই উৎসবের রীতি-নীতির পার্থক্য রয়েছে।

এই দিন পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার অন্তর্গত সাগরদ্বীপে কপিলমুনির আশ্রমকে কেন্দ্র করে পুণ্যস্নান ও বিরাট মেলা বসে যা ‘গঙ্গাসাগর’মেলা নামে পরিচিত। এছাড়াও এদিন বীরভূম জেলার অন্তর্গত কেন্দুলী গ্রামে ঐতিহ্যময় ‘জয়দেব মেলা’ অনুষ্ঠিত হয়।

 

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading