আমাদের রাজ্যের অন্যতম এক প্রাচীন জনপদ হালিশহর, বহুকাল পূর্বে যে এলাকার নাম ছিল কুমারহট্ট। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে প্রথম পাওয়া যায় হালিশহর নামটি। হালিশহরে ‘চৈতন্য ডোবা’ নামক জলাশয়ের ধারে বাস করতেন চৈতন্য মহাপ্রভুর দীক্ষাগুরু ঈশ্বর পুরী। এই নিয়েই লিখলেন কিশলয় মুখোপাধ্যায়

‘আপনে ঈশ্বর চৈতন্য ভগবান
দেখিলেন ঈশ্বরপুরীর জন্মস্থান
প্রভু বলে কুমারহট্টরে নমস্কার
শ্রী ঈশ্বরপুরী যে গ্রামে অবতার’
শ্রী বৃন্দাবন দাশ ঠাকুর লিখিত শ্রীশ্রীচৈতন্য ভাগবত গ্রন্থে উল্লিখিত কবিতার মধ্যে ‘কুমারহট্ট’ হল আজকের হালিসহর। চৈতন্য মহাপ্রভু দীক্ষা নিয়েছিলেন ঈশ্বরপুরীর কাছ থেকে। শ্রীমাধবেন্দ্রপুরীর শিষ্য শ্রীঈশ্বরপুরী জৈষ্ঠ্য মাসে এক পূর্ণিমার দিনে এই কুমারহট্ট তথা হালিসহরে জন্মগ্রহন করেন। মহাপ্রভুকে ঈশ্বরপুরী দীক্ষা দেন গয়াতে। শ্রীঈশ্বরপুরীর জন্মস্থানটিতে বর্তমানে রয়েছে মন্দির। স্থানটি ‘চৈতন্যডোবা’ নামে খ্যাত। মন্দিরটির সামনে একটি জলাশয় রয়েছে। চৈতন্যদেব গুরুদেবের জন্মস্থান দেখে আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। তিনি এখানকার পবিত্র মাটি নিয়ে গেছিলেন। তারপর অসংখ্য চৈতন্য ভক্ত মাটি সংগ্রহ করে। এর ফলে জায়গাটি গর্তে পরিণত হয়। অতপর জল পেয়ে ডোবায় পরিণত হয়।

এ প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীচৈতন্যভাগবতে লেখা রয়েছে ‘কাঁদিলেন বিস্তর চৈতন্য সেই স্থানে/ আর শব্দ নাহিক ঈশ্বরপুরী বিনে/ সে স্থানের মৃত্তিকা আপনে প্রভু তুলি/ লইলেন বহির্ব্বাসে বান্ধি এক ঝুলি/ প্রভু বলে ঈশ্বরপুরীর জন্মস্থান/ এ মৃত্তিকা আমার জীবন ধন প্রাণ।/

নবদ্বীপ ধামে চৈতন্যদেব তখন ‘ নিমাই পণ্ডিত’ নামে পরিচিত। সেই সময় ঈশ্বরপুরী নবদ্বীপে গোপীনাথ আচার্য্যের বাড়িতে কয়েকমাস ছিলেন। তখন চৈতন্যদেবের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাত হয়। দুজনে নিয়মিত নানা বিষয় আলোচোনা করতেন। দুজনে পরস্পরের পাণ্ডিত্য এবং কৃ্ষ্ণপ্রেম নিয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন।

ঈশ্বরপুরী শ্রী মাধবেন্দ্রপুরীর সেবা করেন। বিশেষ করে মাধবেন্দ্রপুরী শেষ জীবনে শয্যাশায়ী হয়ে গেছিলেন। তখন শ্রী ঈশ্বরপুরী অনেক সেবা শুশ্রূষা করেন। এই প্রসঙ্গে শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত বইতে লেখা আছে ‘ঈশ্বরপুরী করে শ্রীপাদ সেবন/ স্বহস্তে করে মল-মূত্রাদি-মার্জ্জন/ নিরন্তর কৃষ্ণনাম করেন স্মরণ/ কৃষ্ণনাম লীলা শুনান অনুক্ষণ/তুষ্ট হৈঞা পুরী তাঁরে কৈল অলিঙ্গন/বর দিল কৃষ্ণে তোমার হউক প্রেমধন/ সেই হৈতে ঈশ্বরপুরী প্রেমের সাগর।’

খুশি হয়ে শ্রী মাধবেন্দ্র পুরী শ্রী ঈশ্বরপুরীকে দীক্ষা দিলেন। শ্রী ঈশ্বরপুরী চৈতন্যদেবকে দীক্ষা দিলেন গয়াতে। এটি ছিল তাঁদের দ্বিতীয় সাক্ষাত। চৈতন্য চরিতামৃতে উল্লেখ আছে ‘তবে ত’ করিলা প্রভু গয়াতে গমন/ঈশ্বরপুরীর সঙ্গে তথায় মিলন/ দীক্ষা অনন্তরে কৈল প্রেম পরকাশ।’ ঈশ্বরপুরীর নিমাই পণ্ডিত বললেন তোমার সাক্ষাত পেয়ে আমার গয়ায় আসা সফল।

এই কৃষ্ণপ্রেম আর এই তিনজনকে নিয়ে কৃষ্ণদাস কবিরাজ শ্রীশ্রীচৈতন্য চরিতামৃত বইতে সুন্দর লিখেছেন
‘জয় জয় মাধবপুরী কৃষ্ণপ্রেমপুর/ভক্তিকল্পতরুর তিঁহো প্রথম অঙ্কুর/ শ্রীঈশ্বরপুরীরূপে অঙ্কুর পুষ্ট হইল/ আপনে চৈতন্য মালী স্কন্ধ উপজিল/ নিজচিন্তা শাক্ত্যে মালী হৈয়া স্কন্ধ হয়/ সকল শাখার সেই স্কন্ধ মূলাশ্রয়।’
একদমই তাই শ্রীমাধবেন্দ্র পুরী কৃষ্ণপ্রেমের যে বীজ রোপন করেছিলেন তা বীজ থেকে গাছে পরিণত করলেন শ্রীঈশ্বরপুরী আর সেই কৃষ্ণপ্রেমের গাছকে মহীরুহতে পরিণত করলেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু।
