
সাংস্কৃতিক সংবাদদাতা, হুগলি: বাইরে তখন সন্ধ্যার শ্রীরামপুর। হুগলি জেলার এই সুপ্রাচীন শহরের টাউন হলের ভেতরে তখন শব্দের এক অন্য মায়াজাল। সম্প্রতি এই মঞ্চেই সম্পন্ন হলো ‘বৈদ্যবাটী আবৃত্তি পরিষদ’-এর বাৎসরিক উৎসব। গত কয়েক বছর ধরে হুগলি জেলায় যাঁরা নিরবে অথচ সশব্দে সুস্থ সংস্কৃতির আলো জ্বালিয়ে রাখছেন, তাঁরাই এদিন মেতেছিলেন তাঁদের বাৎসরিক অনুষ্ঠান উদযাপনে।

আর এই গোটা যজ্ঞের নেপথ্যে মূল কাণ্ডারি হিসেবে ছিলেন, বিশিষ্ট আবৃত্তি প্রশিক্ষক তথা অভিনেতা অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নিখুঁত পরিকল্পনা আর সুদক্ষ পরিচালনায় শ্রীরামপুর টাউন হলের মঞ্চে প্রতিটি পরিবেশনা যেন এক একটি জীবন্ত ক্যানভাস হয়ে উঠেছিল।

এদিনের সন্ধ্যার মূল আকর্ষণই ছিল বয়সের গণ্ডি পেরিয়ে সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। কোনো নির্দিষ্ট বয়সের ফ্রেমে এদিন মঞ্চকে বেঁধে রাখা যায়নি। পরিষদের সদস্য তথা শিল্পীদের বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। মঞ্চে যেমন দেখা গেছে একঝাঁক কচি-কাঁচাদের, তেমনই সমান তালে পা মিলিয়েছেন নবীন ও প্রবীণ শিল্পীরাও।

অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল পরিষদের কর্ণধার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুযোগ্য ছাত্র, আবৃত্তিকার রূপম বসুর এক পরীক্ষামূলক উপস্থাপনা। তাঁর নিজস্ব সংস্থা ‘আবৃত্তির আলোক’-এর পরিবেশনায় আবৃত্তি, অভিনয় এবং নৃত্যের মেলবন্ধনে পরিবেশিত “ভারতবর্ষ” রূপকটি উপস্থিত সকলের মন জয় করে নেয়।

এই বিশেষ সন্ধ্যাটি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল সংস্কৃতি জগতের একঝাঁক গুণী মানুষের উপস্থিতিতে। অতিথি আসনে উপস্থিত ছিলেন কবি অশোক মুখোপাধ্যায়, নাট্য অভিনেতা গৌতম বিকাশ চন্দ্র, ফিজিও অভিজিৎ গুপ্ত, নাট্য পরিচালক দেবাশীষ চক্রবর্তী, বাচিক শিল্পী অরূপ মান্না, চিত্র পরিচালক অমিত দাস, জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত চিত্র পরিচালক অভিজিৎ ব্যানার্জী এবং ‘সংবাদ প্রতিখন’-এর প্রধান সম্পাদক স্বরূপম চক্রবর্তী।

“কবিতা শুধু কিছু শব্দের সমষ্টি বা ব্যাকরণের নিয়ম নয়, তা হলো আদতে মানুষের মনের কথা এবং প্রাণের স্পন্দন”— অনুষ্ঠানের প্রতিটি পরিবেশনায় এই মূল মন্ত্রটিই বারবার ধ্বনিত হয়ে উঠছিল। সব মিলিয়ে, বৈদ্যবাটী আবৃত্তি পরিষদের শিল্পীদের এই প্রাণবন্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থাপনা উপস্থিত প্রতিটি দর্শককে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মন্ত্রমুগ্ধের মতো বসিয়ে রেখেছিল।

আগামী দিনেও এই সংস্থা এভাবেই আবৃত্তি চর্চাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে এবং বাঙালির সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে, এমনটাই আশা সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষের।

