বিশ্ব কবিতা দিবস: প্রেক্ষাপট, প্রয়োজন ও তাৎপর্য

ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবিক অনুভূতির বিকাশে কবিতার ভূমিকা তুলে ধরতেই এই বিশেষ দিন

সুফল তর্কালঙ্কার:  আজ ২১ মার্চ। সারা বিশ্বের সাহিত্য প্রেমী মানুষদের কাছে এক বিশেষ দিন। মানুষের অনুভূতি, প্রতিবাদ, প্রেম, বেদনা ও স্বপ্নের ভাষা হয়ে ওঠা মানবসভ্যতার প্রাচীনতম সাহিত্যধারাগুলোর মধ্যে কবিতাকে প্রাধান্য দিতে আজকের দিনটিকেই ইউনেস্কো বেছে নেয় বিশ্ব কবিতা দিবস হিসেবে। বিশ্ব কবিতা দিবসের মূল উদ্দেশ্য ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষা ও সাহিত্যচর্চার প্রসার ও বিশ্বজুড়ে ছোট ও বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর কবিতাকে নতুন করে জীবিত করা। কবিতা এমন একটি মাধ্যম, যা খুব অল্প শব্দে গভীর ভাব প্রকাশ করতে সক্ষম, ফলে এটি ভাষার প্রাণশক্তিকে ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আসলে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে ঠিক এই সময়েই সূচনা হয় বসন্তের। আর বসন্ত মানেই নতুন সৃষ্টির, প্রাণের ও নবজাগরণের প্রতীক। তাই কবিতার মত একটি সৃজনশীল শিল্পের জন্য সারা বিশ্বে এই দিনটি বিশ্ব কবিতা দিবস হিসেবে পালন করা যুক্তিযুক্ত ও বিশেষ তাৎপর্য পূর্ণ। বিশ্ব কবিতা দিবস পালন করার পিছনে রয়েছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্য। আমাদের এই পৃথিবীতে রয়েছে হাজারের বেশি ভাষা। ভাষার এই বৈচিত্রের মধ্যে আজ বেশ কিছু ভাষা ক্রমশ বিলীয়মান। এই সকল ভাষাগুলিকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে একমাত্র কবিতা বলে মনে করা হয়। একটি স্থানীয় ভাষায কবিতা রচনা ও পাঠের মধ্য দিয়েই সেই ভাষাটির প্রতি বিশেষ আগ্রহ লক্ষ করা যায়।

মানুষের কল্পনাশক্তিকে প্রসারিত করে কবিতা। তাই বর্তমানের নতুন প্রজন্মকে সাহিত্যচর্চায় আকৃষ্ট করতে এই দিবস পালন বিশেষ কার্যকরি ভূমিকা গ্রহণ করে। সারা পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখতে পাওয়া যায় কবিতা সাহিত্যের অন্যতম এক হাতিয়ার হিসেবে মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে বার বার। সারা বিশ্বের কবিদের কলম বারে বরেই গর্জে উঠেছে স্বাধীনতা আন্দোলন, সামাজিক ন্যায়বিচার বা মানবাধিকারের প্রশ্নে। মানুষের মনের আবেগকে শুদ্ধ করে মানসিক প্রশান্তি দেয় একমাত্র কবিতা। বর্তমানের গতিশীল সদাব্যস্ত জীবনের নানা চাপের মধ্যে একদণ্ড শান্তি ও মানসিক প্রশান্তি দেয় কবিতা একথা বলাই যায়।

আমাদের জীবনে কবিতার গুরুত্ব অপরিসীম হলেও বর্তমানে নানা প্রকার বাণিজ্যিক সাহিত্য ও বিনোদনের চাপে কবিতার পাঠকসংখ্যা তুলনামূলক ভাবে কমে যাচ্ছে।এর সঙ্গে সঙ্গে নবীন প্রজন্মদের মধ্যে পড়ার আগ্রহ অনেকটাও কমে এসেছে। তবে সবথেকে ভয়ঙ্কর যে বিষয়টি আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে সেটি হচ্ছে স্থানীয় ভাষার অবমূল্যায়ন ও অবজ্ঞা।  আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এই গভীর সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজন বিশ্ব কবিতা দিবস পালন।

বিশ্ব কবিতা দিবস শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি ভাষা, সংস্কৃতি ও মানবিক অনুভূতির এক গভীর উদযাপন। কবিতা আমাদের ভাবতে শেখায়, অনুভব করতে শেখায়, প্রতিবাদ করতে শেখায়। প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়েও কবিতার আবেদন চিরন্তন—কারণ মানুষ যতদিন অনুভব করবে, ততদিন কবিতাও বেঁচে থাকবে। এই দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে মানবতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading