অভিজিৎ হাজরা, উদয়নারায়ণপুর, হাওড়া: হাওড়া জেলার উদয়নারায়ণপুর বিধানসভা তথা উদয়নারায়ণপুর ব্লকের সিংটি গ্রামে প্রতি বছর মাঘ মাসের ১ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় পীর পুকুরের মেলা। প্রায় ৫০০ বছরের পুরানো এই মেলা।কথিত আছে এক অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ভাই খাঁ পীরের স্মৃতির উদ্দেশ্যে আয়োজিত এই মেলা।এটি হাওড়া জেলার অন্যতম বৃহৎ মেলা হিসেবে পরিচিত।ইতিহাস সূত্রে জানা যায়,বহু শতাব্দী আগে সুদূর আরব দেশ থেকে ভাই খাঁ নামে এক পীর এই গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন।তিনি বিনা পারিশ্রমিকে অসুস্থ মানুষদের চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলতেন।তাঁর মানবিক সেবা ও অলৌকিক ক্ষমতার কারণে স্থানীয় মানুষ তাঁকে দেবতাজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন। এইভাবেই ধীরে ধীরে তিনি মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নেন।

কথিত আছে, ৩০পৌষ ভাই খাঁ পীর দেহত্যাগ করেন এবং পরের দিন অর্থাৎ ১লা মাঘ তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।সেই দিনে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম হয়েছিল,যা ধীরে ধীরে এক বিশাল মেলার রূপ নেয়।সেই ঐতিহ্য বজায় রেখেই আজও প্রতি বছর তাঁর মৃত্যুদিবসকে কেন্দ্র করে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।প্রায় কয়েকশো বিঘা চাষের জমির ওপর বসে এই একদিনের মেলা।ভোর থেকেই মেলাপ্রাঙ্গণে মানুষের ঢল নামে এবং লক্ষাধিক দর্শনার্থীর সমাগম চোখে পড়ার মতো দৃশ্য তৈরি করে।

এই মেলার প্রধান আকর্ষণ হলো নতুন আলুর দম ও সামুদ্রিক কাঁকড়া।বহু মানুষ বাড়ি থেকে মুড়ি নিয়ে এসে গরম গরম আলুর দম খেয়ে থাকেন,আবার অনেকে বাড়ির জন্য কিনে নিয়ে যান।ঠিক যেমন নতুন ধান উঠলে বাংলায় নবান্ন উৎসব পালিত হয়,তেমনই নতুন আলু দিয়ে তৈরি হওয়া এই আলুর দম থেকেই মেলার নাম হয়েছে ‘আলুর দমের মেলা’।

এছাড়াও সুন্দরবন, ক্যানিং, হাসনাবাদ-সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা সামুদ্রিক কাঁকড়া নিয়ে এসে কেজি দরে বিক্রি করেন,যা পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের বিষয়।মেলায় পাওয়া যায় নানা ধরনের গৃহস্থালীর সামগ্রী,শিশুদের খেলনা,বাঁশ ও কাঠের তৈরি জিনিসপত্র,লোহার সামগ্রী,ঘর সাজানোর উপকরণ, জামাকাপড়ের দোকান।পাশাপাশি জিলিপি,পাঁপড় ভাজা,নানা খাবারের স্টল এবং নাগরদোলাসহ বিনোদনের ব্যবস্থাও থাকে।

সব মিলিয়ে উদয়নারায়ণপুরের সিংটি গ্রামের এই মেলা শুধুমাত্র একটি লোকমেলা নয়,বরং এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলনক্ষেত্র।বহু প্রাচীন এই ঐতিহ্যবাহী মেলা আজ এলাকাবাসীর গর্ব এবং বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম পরিচিত মেলা হিসেবে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।
