
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: ২০২৫-এর শেষ লগ্নে কলকাতার একাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর সেন্ট্রাল হলে সূচনা হলো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আর্ট ডিরেক্টর নীতিশ রায়ের ডিজিটাল পেইন্টিং প্রদর্শনীর। চলচ্চিত্র জগতের অর্ধশতাধিক বছরের অভিজ্ঞতা, অসংখ্য বিখ্যাত ছবির শিল্পনির্দেশনা, এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে সম্মানিত এই শিল্পী এবার সামনে এনেছেন সম্পূর্ণ ডিজিটাল মাধ্যমে নির্মিত এক অনন্য শিল্পভুবন। তাঁর দীর্ঘ সৃজনযাত্রার সংহত রূপ যেন ধরা দিয়েছে এই প্রদর্শনীর প্রতিটি ফ্রেমে। একাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ ১১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া প্রদর্শনীতে উঠে এসেছে সমাজের বাস্তবতা, মানুষের আবেগ এবং নগরজীবনের দ্বৈততা।

চলচ্চিত্র জগতে অর্ধশতাধিক বছরের অভিজ্ঞতা ও অসংখ্য জাতীয়-আন্তর্জাতিক পুরস্কারে সম্মানিত নীতিশ রায় এবার ডিজিটাল মাধ্যমে নির্মিত এক অনন্য শিল্পভুবন তুলে ধরেছেন। প্রচলিত ক্যানভাস, রঙ বা তুলি ছাড়াই ডিজিটাল ব্রাশ, লেয়ার, লাইটিং ও কম্পোজিশনের কারিগরি দক্ষতা ব্যবহার করে তিনি সমাজের বিভিন্ন বাস্তব ঘটনা ও মানুষের আবেগকে নতুনভাবে প্রকাশ করেছেন। প্রদর্শনীর বেশ কিছু চিত্রে দেখা যাচ্ছে বর্তমান সময়ের অস্থিরতা, সামাজিক দ্বন্দ্ব, পরিবেশ সংকট এবং নগরজীবনের ব্যস্ততা। বিশেষ নজর কাড়ছে দুর্গা শীর্ষক একটি কাজ, যেখানে রঙ ও ডিজিটাল গ্রাফিক্সের অনন্য মেলবন্ধন দর্শকের মনোযোগ আড়াল করতে পারবে না। নীতিশ রায়ের চলচ্চিত্রকলা ও সেট-ডিজাইনের দক্ষতা ডিজিটাল চিত্রগুলোর ফ্রেমিং, গভীরতা ও পটভূমিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রতিটি চিত্র যেন নিজস্ব গল্প বলে—স্থিরচিত্রে ধরা সিনেমার দৃশ্যের মতো।

সংবাদ প্রতিখনের সঙ্গে একান্ত আলাপে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আর্ট ডিরেক্টর নীতিশ রায় জানালেন, “১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত আমি সরকারি আর্ট কলেজে ছাত্র ছিলাম। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে পরবর্তীতে মুম্বাইয়ে যাই এবং ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রজগতে নিজের জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হই। টানা ৪৫ বছর ভারতীয় সিনেমায় আর্ট ডিরেকশনের কাজ করার পর আজ আমি ফিরে এসেছি আমার প্রিয় শহর কলকাতায়।” তিনি আরও বলেন, সরকারি আর্ট কলেজ থেকে পাশ করলেও প্রথমদিকে ছবি আঁকা নিয়ে তেমন কিছু করতে পারেননি। তবে কলকাতার জীবনকে তিনি আজও গভীরভাবে উপভোগ করেন। বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করেছেন নিজের ডিজিট্যাল আর্ট চর্চায়।

ডিজিট্যাল শিল্পকর্ম নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যায় নীতিশ রায় বলেন, “রঙ ও তুলি ছাড়াই কম্পিউটারের সাহায্যে আমি ‘মেথডিক্যাল টেকনিক অফ আর্ট’-এর মাধ্যমে কাজ করি। এই প্রযুক্তিগত ফর্ম আমাকে নতুনভাবে শিল্প প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে। ডিজিট্যাল মাধ্যমে রিয়েলিস্টিক আর্টও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করা সম্ভব।” বর্তমানের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে তাঁর মতামতও স্পষ্ট—“এআই–এর ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। মানুষের মনের গভীর অনুভূতি বা ভাবনা এআই জানতে পারে না। যতক্ষণ না তাকে তথ্য দিয়ে বোঝানো হচ্ছে, ততক্ষণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পক্ষে আমার মতো ছবি আঁকা সম্ভব নয়।”

ডিজিটাল প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশের যুগে দাঁড়িয়ে, নীতিশ রায়ের এই প্রদর্শনী প্রমাণ করেছে—শিল্পের ভাষা সবসময়ই সময়কে ছুঁয়ে চলে। মাধ্যম বদলায়, বদলায় প্রকাশের পদ্ধতি; কিন্তু শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি, অনুভূতির গভীরতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা কোনোদিনই বদলায় না। তাঁর ডিজিট্যাল পেইন্টিং–এ ধরা পড়ে ঠিক সেই মানবিক স্পর্শ, যে স্পর্শই একজন শিল্পীকে আলাদা পরিচয়ে চিহ্নিত করে। প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরিচালক নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ছিলেন কলকাতার সরকারি চারুকলা ও কারুশিল্প মহাবিদ্যালয়ের প্রিন্সিপ্যাল ছত্রপতি দত্ত সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
প্রদর্শনীটি চলবে আগামী ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

