
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: ৬ ডিসেম্বর মধ্য কলকাতার লীলা রায় সভাঘরে অনুষ্ঠিত হলো ‘সংবাদ প্রতিখন’-এর বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সম্মাননা প্রদান পর্ব এবং ‘সংবাদ প্রতিখন’ প্রকাশনার নতুন বইয়ের প্রকাশ-অনুষ্ঠান। সুর, তাল, আবৃত্তি ও গল্পবলার মনোমুগ্ধকর সমাহারে সাজানো ছিল এদিনের অনুষ্ঠানমালা। বিশেষ আকর্ষণ ছিল একঝাঁক খুদে শিল্পীর প্রাণবন্ত পরিবেশনা, যা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত চিত্রপরিচালক অভিজিৎ ব্যানার্জী, যিনি ‘সংবাদ প্রতিখন’-এর সৃজনশীল উদ্যোগ ও সাংস্কৃতিক দায়িত্বশীলতাকে আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানান।

আরও উপস্থিত ছিলেন কবি শুভ্রকান্তি কর, কবি অশোক মুখোপাধ্যায়, কবি-লেখক-অভিনেতা অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রখ্যাত গীতিকার ও সুরকার জয়ন্ত পাঠক এবং সমাজবন্ধু হিসেবে পরিচিত ‘ফ্ল্যাগম্যান’ প্রিয়রঞ্জন সরকার। অতিথিদের তালিকায় যুক্ত ছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তবলা শিল্পী ও সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিত অমিত ঘোষ—যাঁর উপস্থিতি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ তাৎপর্য এনে দেয়।

আমন্ত্রিত সকল অতিথিকে উত্তরীয় ও ব্যাজ পরিয়ে, সম্মানপত্র এবং স্মারক তুলে দিয়ে সাদরে বরণ করে নেন ‘সংবাদ প্রতিখন’-এর কর্ণধার স্বরূপম চক্রবর্তী এবং কারিগরী সম্পাদিকা দিপান্বীতা দাস। তাঁদের এই আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের মর্যাদা ও আন্তরিকতাকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে, পাশাপাশি অতিথিদের সঙ্গে ‘সংবাদ প্রতিখন’-এর সাংস্কৃতিক সৌহার্দ্যের বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাচিকশিল্পী ও বেতার নাট্য অভিনেতা পার্থপ্রতিম মজুমদার, বাচিকশিল্পী ও অভিনেতা অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যের যাত্রা আন্দোলনের অন্যতম মুখ ও যাত্রা পরিচালক সূর্যকিরণ, বাচিকশিল্পী-অভিনেতা কুন্তল সেনগুপ্ত ও সাংবাদিক, কবি ও যাদুকর ইন্দ্রজিত্ আইচ। তাঁদের আগমন ও উৎসাহে দিনটি হয়ে ওঠে আরও সার্থক ও সমৃদ্ধ।

অতিথি সমাবেশের মঙ্গলদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্বাগত ভাষণ দেন ‘সংবাদ প্রতিখন’-এর কারিগরী সম্পাদিকা দিপান্বীতা দাস, যিনি সকল অতিথি, শিল্পী ও পাঠকসমাজের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

এদিনের অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘সংবাদ প্রতিখন’ প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত তিনটি গ্রন্থের আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন—সুমিত দাঁ’র লেখা একটি উপন্যাস ও একটি কাব্যসংকলন, এবং দীপঙ্কর ব্যানার্জির একটি কবিতা সংকলন। গ্রন্থগুলির উন্মোচনের মধ্য দিয়ে সাহিত্যচর্চায় ‘সংবাদ প্রতিখন’-এর ধারাবাহিক প্রয়াস আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। অতিথি ও সম্পাদকমণ্ডলীর উপস্থিতিতে বইগুলির মোড়ক উন্মোচিত হওয়ার পর কবি ও লেখক সুমিত দাঁ এবং কবি দীপঙ্কর ব্যানার্জী তাঁদের নিজ নিজ বইয়ের বিষয়বস্তু, ভাবনা এবং লেখার অন্তর্নিহিত অভিজ্ঞতা সম্পর্কে উপস্থিত সকলকে অবহিত করেন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে সৃষ্টির পথ, সাহিত্য-ভাবনা এবং সমকালীন সমাজ-সংস্কৃতির প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি, যা অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাহিত্যপ্রেমীদের বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে।

উল্লেখ করা যায়, ‘সংবাদ প্রতিখন’ এদিন প্রদান করে ‘প্রতিখন শিক্ষকরত্ন সম্মান ২০২৫’, যা অর্জন করেন প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক কৃষ্ণচন্দ্র ভড়। গত চল্লিশ বছর ধরে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পাদনা করে আসছেন একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র—যা বর্তমানে মাসিক হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে উনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে না পারায় ‘সংবাদ প্রতিখন’-এর সম্পাদক স্বরূপম চক্রবর্তী মঞ্চ থেকে জানান যে সম্মানটি তাঁদের প্রতিনিধিদল কৃষ্ণচন্দ্র ভড়ের বাসভবনে গিয়ে তাঁকে প্রদান করবে। সেই অনুযায়ী, অনুষ্ঠানের পরদিন সকালে তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে ‘প্রতিখন শিক্ষকরত্ন সম্মান ২০২৫’ তাঁর হাতে তুলে দেন সম্পাদক।

অনুষ্ঠানের আসল আকর্ষণ ছিল ক্ষুদে শিল্পীদের পরিবেশনা। শিশু শিল্পী সৃঞ্জয় মৌলিক তাঁর স্বরচিত গল্প পাঠ করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। গল্পের বুনন, কন্ঠের স্বচ্ছতা এবং শিশুসুলভ অভিনয়শৈলী উপস্থিত দর্শকদের আপ্লুত করে তোলে।

উত্তরপাড়া ও বালির দুই বালিকা শিল্পীর তবলা-লহরাও ছিল এদিনের অন্যতম আকর্ষণ। তাদের তাল-লয়ের দারুণ দখল উপস্থিত সকলকে অবাক করে। এই বয়সে এমন অনায়াস পরিবেশনা সকলের প্রশংসা কুড়ায়।

অনুষ্ঠানের শেষ লগ্নে ‘সংবাদ প্রতিখন’-এর উদ্যোগে আয়োজিত সারা বাংলা অনলাইন আবৃত্তি, সঙ্গীত ও প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। প্রতিযোগিতার বিভিন্ন বিভাগ থেকে উঠে আসা কৃতি অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতিতে ও তাদের পরিবেশিত অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠানের পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসবমুখর।
অনুষ্ঠান পরিচালনা ও সঞ্চালনায় ছিল সুস্পষ্ট শৃঙ্খলা ও আন্তরিকতা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন বাচিক শিল্পী অহনা ঘোষ সকল অতিথি শিশু শিল্পীদের উৎসাহ দিয়ে জানান, এমন সাংস্কৃতিক উদ্যোগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আরও অনুপ্রাণিত করবে। ‘সংবাদ প্রতিখন’-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামী দিনেও এই ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতা নিয়মিতভাবে আয়োজন করা হবে।

অনুষ্ঠান শেষে দর্শক-অভিভাবকদের উচ্ছ্বাস ও প্রশংসাহীন ছিল না। খুদে শিল্পীদের প্রতিভা ও মঞ্চজয়ী আত্মবিশ্বাসই প্রমাণ করল—বাংলার সাংস্কৃতিক ভুবনে আগামী দিনের শিল্পীদের প্রস্তুতি জোরদারভাবেই এগিয়ে চলছে।

