এই মূহুর্তে সমাজ মাধ্যমে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের রিয়েলিটি শো’র অনুষ্ঠানে একটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের একটি অংশ প্রদর্শনে হিন্দী সিনেমার একটি গান ও নাচের কোরিওগ্রাফি নিয়ে চলছে নানা পরস্পর বিরোধী কথা। এই বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রতিখনের প্রতিনিধি স্নেহাবৃতা ব্যানার্জী কথা বলেছিলেন সঙ্গীত ও নৃত্য জগতের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে।
আজ তৃতীয় পর্বে রয়েছেন পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরের নৃত্য ও সঙ্গীত শিক্ষক পাপিয়া চ্যাটার্জী

সংবাদ প্রতিখন: এই মূহুর্তে একটি বাংলা বেসরকারি টিভি চ্যানেলের একটি নাচের রিয়েলিটি শো তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের একটি অংশের ওপর যে নৃত্যভঙ্গিমা ও যে আবহসঙ্গীত ব্যবহার করা হয়েছে তা নিয়ে চলছে নানা চাপানউতোর। এই বিষয়ে আপনার মত কী?
পাপিয়া চ্যাটার্জী: রবীন্দ্রনাথ আমাদের প্রাণের ঠাকুর। উনি যে সংস্কৃতিটা আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন, সেই নিজস্ব সুন্দর সংস্কৃতিটাকে এভাবে তো ধুলিসাৎ করার কোনো অধিকার কারও নেই। নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ও নিজস্ব জিনিস নিয়ে কাজ করলে ভালো। মানে, উনি যে সুন্দর কাহিনীর অবতারণা করেছেন, বৌদ্ধ কাহিনীর অবলম্বনে, সেখানে বৌদ্ধ কাহিনীর অপব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেমন, দেখিয়েছে যে আনন্দ চণ্ডালীকে স্নান করাচ্ছে, অর্থাৎ প্রকৃতিকে স্নান করানো হচ্ছে। এরকম কোনো ঘটনা একেবারেই নেই। নৃত্যনাট্যটিতে বরং প্রেম, যা আধ্যাত্মিক প্রেম, আনন্দের প্রতি অনুরক্ত একসময় হলেও, সেই প্রেমটা আধ্যাত্মিক। সেই প্রেম থেকে আধ্যাত্মিক উত্তরণ হয়েছিল তার। শেষে, যেটা তারই প্রতিফলন, “প্রভু এসেছেন উদ্ধারি তে আমায়।” শেষে ক্ষমাও চেয়েছে। আনন্দ বলেছে, “কল্যাণ হোক।” তো সেইটাকে এইভাবে একটি হিন্দি গানের-হিন্দি গানটাকে আমি খারাপ বলছি না, গানটা ভীষণ সুন্দর। কিন্তু এইভাবে চিত্রায়নটা আমার একেবারেই পছন্দ নয়। আমি খুবই ক্ষুদ্র মানুষ, খুবই ক্ষুদ্র। সেরকম আমার কিছু পরিচিতি বিশাল নেই। কিন্তু আমি গান-বাজনাকে ভালোবাসি এবং একেবারেই রবীন্দ্র ধারায় পালিত বলতে পারেন। তো, সেই হিসেবে আমার এটা একেবারেই পছন্দ হয়নি, এইটুকু বলতে পারি।

সংবাদ প্রতিখন: আপনি বললেন, হিন্দি গানের যে ব্যবহার, সেটার সাথে একেবারেই যোগ পাওয়া যায় না। আমরা দেখছি, এখন শিল্প প্রদর্শনে আধুনিকতা চলে এসেছে। এই আধুনিকতা এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধনটাকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
পাপিয়া চ্যাটার্জী: আধুনিকতা নিশ্চয়ই থাকবে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি একজনের সৃষ্টিকে একেবারেই ধূলিসাৎ করে আধুনিকতা প্লেস করব। যেখানে আনন্দ বলছে, “মানব আমি”, সেই মানবতার মন্ত্র দিচ্ছে, সাম্যের গান শোনাচ্ছে, সেখানে, প্রকৃতির আত্ম-উন্মোচনের মন্ত্র শোনার পর, সেই সূত্রটা কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে, এটাই আমার মনে হয়েছে।
সংবাদ প্রতিখন: সাধারণ মানুষ সহ বিভিন্ন শিল্পীদের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে চলছে নানা মতামত ও একে অপরের প্রতি খানিকটা দোষারোপ, এই বিষয়ে আপনি কি বলবেন?
পাপিয়া চ্যাটার্জী: দোষ দেওয়া বলতে, ঠিক এটাকে দোষ দেওয়া আমি বলব না। হঠাৎ করে যদি একটা-একটা প্রচলিত কাহিনী, এটা তো শুধু রবীন্দ্রনাথের নয়, রবীন্দ্রনাথ নিয়েছিলেন বৌদ্ধ কাহিনী থেকে। সেই গভীর বিষয়টাকে এত হালকা করে দেওয়ার ব্যাপারটা হয়তো সবারই চোখে ভালো লাগেনি, অনেকেরই ভালো লাগেনি যারা রবীন্দ্র কাব্য নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, আরও গভীরে পড়াশোনা করেছেন, তাদের তো একেবারেই ভালো লাগবে না। তো, সেই ক্ষেত্র থেকেই নিন্দা বা চর্চাটা হয়ে যাচ্ছে আর কি। এটাকে আমি কী বলব, কোনো দোষ দেব না, এই নিন্দার কোনো দোষ দেব না, নিন্দাটা হওয়াটা বোধ হয় স্বাভাবিক।

সংবাদ প্রতিখন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন সৃষ্টি বিদেশের মাটিতে সমানব্যাবে সমাদৃত। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মানুষ ওনার সৃষ্টি নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের বাংলাতেই এরকম হলো। তাহলে কি আমাদের বাঙালিদের এখানে কোনো দোষ দেখা দিচ্ছে যে, আমরা আমাদের সংস্কৃতিটাকে ধরে রাখতে পারছি না, হাজার চেষ্টা করেও?
পাপিয়া চ্যাটার্জী: খানিকটা তাই। আমি শুধু এই ব্যাপারটা বলব না, রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে এটা হচ্ছে। যেখানে রবীন্দ্রনাথ গান বেঁধে দিয়েছেন, সেখানে আধুনিকতার নামে অযথা জগ-ঝম্প মিউজিক দিয়ে সেটাকে আধুনিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যার ফলে রবীন্দ্রনাথের গানের যে ভাব, সেটা পুরো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথের গানের একটা আলাদা ভাব আছে, সেই ভাবটা আমরা নষ্ট করে ফেলছি। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, ‘আমার গান যেন আমার গান বলেই চিনতে পারি’। সেই ক্ষেত্রে একজনের উপর আমরা এভাবে কলম চালাতে পারি না। আমার যেটা মনে হয়, তাঁর গানকে তাঁর গানের মতোই রাখা উচিত। অনেকেই দেখি, অনেক গানকে একেবারে তাল ছাড়া গেয়েছেন। আবার কিছু গানকে হঠাৎ করে দেখা যাচ্ছে যে অন্তরা থেকে ধরা হচ্ছে বা সঞ্চারী থেকে ধরা হচ্ছে। গানের ভাবটা না বুঝেই গাইলে এই ব্যাপারটা হয়। গানটা মানে প্রথম থেকে স্থায়ী থেকে আভোগ পর্যন্ত গানের একটা ভাব থাকে। হঠাৎ করে আমি আভোগ থেকে গাইতে পারি না গানটা বা হঠাৎ করে সঞ্চারী থেকে গাইতে পারি না গানটা, তাহলে গানের বিস্তৃতি হওয়ার ব্যাপারটা শেষ হয়ে যায়। একটা গানের বিস্তৃতি হওয়ার ব্যাপার থাকে। তো, সেই দিক থেকে আমি বলব যে এগুলো বাঙালিরাই করছে। বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হোক না, তাতে কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু সেটা তার মূল ভাবকে বজায় রেখে হোক। তাহলেই তো বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে যায়, তার জন্য এই আধুনিক করার কোনো মানে তো হয় না। একদমই জানি না আমি ভুল কিনা।
বক্তার বক্তব্যের জন্য সংবাদ প্রতিখন কোনওভাবেই দায়ী নয়, সাক্ষাত্কারে বক্তার বক্তব্য সম্পুর্ন ওনার নিজস্ব, একান্ত ও ব্যক্তিগত

