ভাতের দেশের সবজির গল্প

বাঙালির রান্নাঘরের এক এমন পদ, যার নাম বললেই যেন মনে পড়ে যায় উৎসব, ছেলেবেলা, ও সেই “অল্প দিয়ে অনেক” বানানোর শিল্প।

আর সেই নিয়েই লিখলেন আত্রেয়ী দো

দুর্গাপুজোর নবমীর প্রাসাদে হোক কিংবা লক্ষ্মীপুজোর ভোগ-লাবড়া কিন্তু একাই একশো। বিয়েবাড়ির মধ্যাহ্ন ভোজের পাতেও কিন্তু লাবড়া নিজের জায়গা ধরে রেখেছে। চলুন আজ জেনে নিই লাবড়া তৈরির কাহিনীটি।

লাবড়ার আদি ইতিহাস: অভাবে রসনার আবিষ্কার

“লাবড়া” নামটি ইতিহাসে স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ নেই, তবে এর গল্পটা টিকে রয়েছে বিভিন্ন লোককথা আর রান্নার অভিজ্ঞতায়। লাবড়া এসেছে বাংলার গৃহস্থালি সংস্কৃতি থেকে। বাংলার গৃহস্থ পরিবারে, বিশেষত পূজোর সময়—যখন একসাথে অনেক লোকের ভোগ রান্না হত, তখন যা কিছু সবজি পাওয়া যেত, সেগুলো একসাথে মিলিয়ে একটা মেশানো তরকারি রান্না করা হতো। এই রান্না ছিল অর্থনৈতিক বুদ্ধিমত্তা ও ধর্মীয় শুদ্ধতার এক অনন্য সমন্বয়।

অনেক ভাষাবিদ বলেন,  “লাবড়া” শব্দটি এসেছে লোকভাষার “লপেটানো” বা “লোপাট” থেকে — মানে এলোমেলোভাবে মেশানো, বা যেটা আলাদা করে চেনা যায় না — সব একাকার।l

পূজোর প্রসাদে লাবড়া: উপাসনার অংশ

লাবড়া যে শুধু একটি পাঁচমিশালি তরকারি তা কিন্তু নয়। এটি পুজোর ভোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা, কালীপূজা বা নবদ্বীপে রাস উৎসব— লাবড়া ছাড়া ভোগ অসম্পূর্ণ। যেহেতু লাবড়ায় পেঁয়াজ-রসুন থাকে না, আর রান্না হয় সরষের তেলে, তাই এটি ভোগের জন্য উপযুক্ত।

লাবড়া প্রথম কোথায় রান্না হতো?

লাবড়া মূলত গ্রাম বাংলায় (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের নবদ্বীপ জেলার নদীয়া, বর্ধমান জেলা ইত্যাদি অঞ্চলে) প্রসাদ কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে রান্না হতো। নবদ্বীপের গৌড়ীয় বৈষ্ণব রীতিতে বানানো এই লাবড়া ভোগ হিসেবে অপরিহার্য। বলা চলে ,ঠাকুর ঘরে এটি একধরনের ভোগের প্রতীক – সহজ ও ঐক্যের প্রতীক।

উপকরণে একতা, স্বাদে বৈচিত্র্য

লাবড়ার মূল সৌর্ন্দয্য হলো এর উপকরণ এবং রান্নার পদ্ধতি। এর স্বাদ কিছুটা নির্ভর করে বাড়িতে মজুত থাকা সবজি এবং উপকরণের উপর। লাবড়া রান্নার প্রধান উপকরণ হলো কুমড়ো। এরপর থাকে আলু যা যেকোনো তরকারীকেই আঠালো বা গাঢ় করে।

এছাড়া থাকে বেগুন। বেগুন শুধু স্বাদ ও গন্ধের জন্যই ব্যবহার হয়না ,এটি রান্নায় ঝোলের ভারসাম্য রক্ষা করে। আর থাকে ঝিঙে বা পটল   যা গরমকালে সহজলভ্য।শীতকালীন লাবড়ায় বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, মটর ইত্যাদিও দেওয়া হয়। ফোড়ন হিসেবে সাধারনত ব্যবহার হয় কাঁচা লঙ্কা, আদা, পাঁচফোড়ন যা লাবড়ার ঘ্রাণের মূল উৎস। লাবড়া কিন্তু সরষের তেলেই রান্না করা হয়। এছাড়া থাকে প্রয়োজনীয় মশলাপাতি।

মূলত প্রসাদের থালায় ভোগ হিসেবে লাবড়া নিবেদন করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন অনুষ্ঠানবাড়িতে এমনকি শীতকালীন খিচুড়ি পিকনিকেও এর জনপ্রিয়তা নেহাত কম নেই। তবে , অনেক সময় অনুষ্ঠানবাড়িতে লাবড়া আমিষভাবেও বানানো হয়। তার স্বাদও কিন্তু হয় অপূর্ব।

লাবড়া নিয়ে সাহিত্য ও স্মৃতিচারণ

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসে পূজোর ভোগে “লাবড়া” বারবার এসেছে। এই খাবার যেন আমাদের স্মৃতির স্যাঁতস্যাঁতে অন্দরে চুপ করে পরে থাকে—ঠিক বাড়ির পুরোনো হাঁড়ির মতো।

হাঁড়ির তলায় জমে থাকা স্বাদ

আজকের ফাস্ট ফুডের যুগেও লাবড়া টিকে আছে তার নিজস্ব স্বাদ ও ঐতিহ্য নিয়ে। লাবড়া মানে উৎসব, সবকিছু একসাথে থাকা, একসাথে রান্না হওয়া, আর একসাথে খাওয়ার আনন্দ। পরিশেষে বলা যায়, লাবড়া হল বাংলার হাঁড়ির ঐতিহ্য, ভোগের থালার প্রাণ।

(তথ্যসূত্র : অন্তর্জাল)
error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading