এই মূহুর্তে সমাজ মাধ্যমে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের রিয়েলিটি শো’র অনুষ্ঠানে একটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের একটি অংশ প্রদর্শনে হিন্দী সিনেমার একটি গান ও নাচের কোরিওগ্রাফি নিয়ে চলছে নানা পরস্পর বিরোধী কথা। এই বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রতিখনের প্রতিনিধি স্নেহাবৃতা ব্যানার্জী কথা বলেছিলেন সঙ্গীত ও নৃত্য জগতের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে।
আজ দ্বিতীয় পর্বে রয়েছেন হুগলির গুড়াপ থেকে গীতিকার ও শিল্পী অমিত ভট্টাচার্য্য

সংবাদ প্রতিখন: এই মূহুর্তে একটি বাংলা বেসরকারি টিভি চ্যানেলের একটি নাচের রিয়েলিটি শো তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের একটি অংশের ওপর যে নৃত্যভঙ্গিমা ও যে আবহসঙ্গীত ব্যবহার করা হয়েছে তা নিয়ে চলছে নানা চাপানউতোর। এই বিষয়ে আপনার মত কী ?
অমিত ভট্টাচার্য্য: আমার মনে হয়েছে এ এক সামাজিক ব্যাধি। এক প্রবণতা শুরু হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে, নৃত্যনাট্যে বিশেষ করে গানে নতুনত্বের নাম করে “ভাড়ামো” করা হচ্ছে। সাহিত্য বা সংগীত জগতের জ্ঞান থেকে যেটুকু আমি বুঝি কোন স্রষ্টার সৃষ্টিকে পরিবেশন করতে গেল তাঁর দর্শন বা উপলব্ধি- সেটা সম্পূর্ণ বজায় রেখেই করা উচিত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঋষি কবি বলা হয়। তাঁর সঙ্গীত তাঁর শ্রেষ্ঠ সম্পদ, তিনি নিজে বলেছেন একথা। তাহলে কি করে তারা এটা বিকৃত করতে পারে। আমার প্রথম প্রশ্ন-উত্তরও বটে প্রশ্নও বটে। তাঁর গান কাব্য গীতি, কাব্য প্রধান গান, সুর ও কাব্য-কথা এবং সুরের আত্মীয়তা এত বেশি ওনার গানে এতটুকু ব্যতিক্রম ঘটলে গানটির অঙ্গহানি হয়।
রবীন্দ্রনাথ চন্ডালিকার জন্য নির্দিষ্ট ডায়লগ সমন্বিত গান বেঁধে গেছেন। সেই গান, প্রকৃতির গানের জায়গায় হিন্দি সিনেমার গান প্রয়োগ করা হয়েছে। গানটা আলাদাভাবে ভীষণ সুন্দর। তবে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে এই গান প্রয়োগ করার প্রয়োজন কোথায় ছিল? চণ্ডালিকা থিম অস্পৃশ্যতা, প্রকৃতি নিম্ন বর্ণের নারী-চন্ডাল বলে অসুচী। সেখানে সাম্যের, করুণার প্রতীক বৌদ্ধ ভিক্ষুক আনন্দ আসছেন, মানবতার পাঠ দিচ্ছেন। তিনি বলছেন, “যে মানব আমি সেই মানব তুমি কন্যা।” প্রকৃতিকে আত্ম উন্মোচনের সাহায্য করছেন। পরবর্তী কালে প্রকৃতির আনন্দের প্রতি সামান্য প্রেম জন্মায়, শেষকালে তা আধ্যাত্মিকতায় উত্তরণ হয়। সিনেমার যে গান প্রয়োগ করা হয়েছে এই ক্ষেত্রে নরনারীর প্রেম নয়। রবীন্দ্রনাথের রচিত গানের হিন্দি ভার্সনটা দিলে হয়তো কিছুটা সামঞ্জস্য থাকতো।

দ্বিতীয়ত, চণ্ডালিকার মূল কাহিনী, আনন্দ জল চান প্রকৃতির কাছে, চন্ডাল বলে সে প্রথমে দ্বিধা করে কিন্তু পরে আনন্দের কথা শুনে তাঁকে জল দেয়। তাহলে যেমন দেখানো হয়েছে কোথাও কি আছে আনন্দ প্রকৃতিকে স্নান করাচ্ছে! এর তাৎপর্য কি ? উনি কোন কালিমা ধৌত করলেন? প্রকৃতির কালিমা কোথায়? সমাজ তাকে অস্পৃশ্য করেছে, নিম্ন বর্ণের হয়ে সে জন্মিয়েছে বলে? অভিনেত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী কালিমার রূপক কি এখানে?
তৃতীয়ত রবীন্দ্র নৃত্য আলাদা একটি সাবজেক্ট। তার একটা বৈশিষ্ট্য আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রবীন্দ্রনৃত্যের সৃষ্টি করেছেন। তাহলে কি দরকার ছিল ওনার নৃত্যকেও বিকৃত করার?

সংবাদ প্রতিখন: সংস্কৃতি বজায় রেখে শিল্পকলায় আধুনিকত্ব কিভাবে আনা সম্ভব?
অমিত ভট্টাচার্য্য: আধুনিক মানে উশৃংখলতা নয়। আধুনিক কথাটা প্রাণের গণ্ডিতে বাঁধা নয়। যে কালে যে সেই কালে সে আধুনিক। সব কিছুতে একটা কালজয়ী বিষয় থাকে। রবীন্দ্রনাথ সেই রকম একজন কালজয়ী, আধুনিক সাহিত্যিক। তাঁর সৃষ্টি অবিনশ্বর, তাঁর গানের দর্শন-গভীরতা, তাঁর বিশেষ থেকে নির্বিশেষের যাত্রা-ওনার সৃষ্টির একটি বড় বৈশিষ্ট্য। সেই বিষয়টিতে নানা যন্ত্রানুষঙ্গ মিশিয়ে দিলে লঘু হয়ে যায়। গানের আসল দর্শন চাপা পড়ে যায় এবং তার অঙ্গহানি হয়।
বক্তার বক্তব্যের জন্য সংবাদ প্রতিখন কোনওভাবেই দায়ী নয়, সাক্ষাত্কারে বক্তার বক্তব্য সম্পুর্ন ওনার নিজস্ব, একান্ত ও ব্যক্তিগত

