এই মূহুর্তে সমাজ মাধ্যমে ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্প্রতি একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের রিয়েলিটি শো’র অনুষ্ঠানে একটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের একটি অংশ প্রদর্শনে হিন্দী সিনেমার একটি গান ও নাচের কোরিয়গ্রাফি নিয়ে চলছে নানা পরস্পর বিরোধী কথা। এই বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রতিখনের প্রতিনিধি স্নেহাবৃতা ব্যানার্জী কথা বলেছেন সঙ্গীত ও নৃত্য জগতের কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে।
আজ প্রথম পর্বে রয়েছেন পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুরের একটি সঙ্গীত শিক্ষা কেন্দ্রের প্রধান দেবাশীষ চট্টোপাধ্যায়

সংবাদ প্রতিখন: এই মূহুর্তে একটি বাংলা বেসরকারি টিভি চ্যানেলের একটি নাচের রিয়েলিটি শো তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যের একটি অংশের ওপর যে নৃত্যভঙ্গিমা ও যে আবহসঙ্গীত ব্যবহার করা হয়েছে তা নিয়ে চলছে নানা চাপানউতোর। এই বিষয়ে আপনার মত কী ?
দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়: দেখুন, মডিফিকেশন চিরকালই হয়ে আসছে, হ্যাঁ। জিনিসটাকে উন্নত করার জন্য। জিনিসটাকে অবনতি করাটা আমাদের কাম্য নয়, হ্যাঁ। কিছু জিনিস ভালো করতে গেলে কিছু জিনিস খারাপ হয়ে যায়, এটা আমাদের মানতে হবে। হয়তো যিনি করেছেন, কিছু একটা চিন্তাভাবনা করে ভালো হওয়ার জন্যই ভেবেছিলেন, কিন্তু সেটা একটু অন্যরকম, খারাপ হয়ে গেছে। বা তাঁর পরিকল্পনাতে কিছু ত্রুটি ছিল, বা চিন্তাভাবনার কিছু ত্রুটি ছিল বলে এটা হয়ে গেছে। সেইজন্য যারা রাবীন্দ্রিক বা এই নিয়ে একটু কালচার করে বা সংস্কৃতির সাথে যুক্ত আছে, তারা এই ব্যাপারটাকে পছন্দ করেনি। হিন্দি গানটাকে রবীন্দ্রনাথের নৃত্যে এইভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং তার নৃত্যভঙ্গিমা যেভাবে দেখানো হয়েছে, সেগুলো তাদের পছন্দ হয়নি। না-ও হতে পারে এটা। যে সবকিছু একদম ভালোই হবে, তার কোনো মানে নেই। কিছু জিনিস খারাপও হতে পারে। ভালো করতে গেলে কিছু খারাপও হয়।

সংবাদ প্রতিখন: আপনি বললেন এই ভালো করতে, ভালো করার একটা চেষ্টা করতে খানিকটা আধুনিকতার ছোঁয়া আমরা দিতে চাইছি এখন সব সৃষ্টিতেই। কিন্তু এই আধুনিকতার ছোঁয়া দিতে গিয়ে আমাদের যে সংস্কৃতি, সেটা খানিকটা হলেও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এই আধুনিকতা, সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনটা আমরা কিভাবে বজায় রাখতে পারি?
দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়: হ্যাঁ। এই ব্যাপারটা নিয়ে যারা এই ব্যাপারগুলো করছেন, তাদের একটু ভালো করে চিন্তাভাবনা করা উচিত, যে আমরা কোনটার উপরে করছি, তার গভীর চিন্তা, তাদের কাব্যিক ভাব বা তার সংস্কৃতির ভাব বা যেটা আছে, সেটার উপরে ডিপেন্ড করে, নির্ভর করে যদি আধুনিকতার ছোঁয়া দেয়া যায়, তাহলে সমাজ সেটা ভালোভাবে নেবে। আর না হলে যদি খুব সস্তাভাবে একটা জিনিস দেওয়া যায়, তাহলে কিছু শ্রেণীর লোক এটাকে নিয়ে আনন্দ করবে, কিন্তু সবাই এটাকে সমানভাবে মেনে নেবে না। এটা আমার মনে হয়। রবীন্দ্রনাথের গানের মধ্যে আমরা আগে দেখেছি, শুধু এস্রাজ ব্যবহার হতো, তানপুরা ব্যবহার হতো। এখন আস্তে আস্তে সমস্ত ওয়েস্টার্ন ইনস্ট্রুমেন্টস বা আমাদের ইন্ডিয়ান অন্য ইনস্ট্রুমেন্টস ব্যবহার হয় এবং সেটা যদি মার্জিতভাবে ব্যবহার হয়, গানের ভাবকে, কাব্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে যদি ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটা ভালোই হয়, খারাপ হয় না। বর্তমানে রেকর্ডিং সিস্টেম অত্যন্ত ভালো এবং যেসব সিঙ্গাররা গাইছে, তাদের ভয়েস ভালো আসছে এবং মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট অত্যন্ত আধুনিক হয়েছে এখন, সেগুলো অত্যন্ত ভালোভাবে রেকর্ডিং হচ্ছে এবং তা পরিবেশনটা খুবই সুন্দর হচ্ছে। এটা মডিফিকেশন, এটা জনগণ সমানভাবে সুন্দরভাবে নিয়েছে। কিন্তু এটা যদি বিকৃত করা হয়, তাহলে সমানভাবে নেবে না। ব্যাপারটাকে একটু রুচিশীল রাখতে হবে। এই ব্যাপারটা মাথায় রাখতে হবে যে আমি যেটা নিয়ে কাজ করছি, সেটা যেন রুচিশীল হয়। আমি সোনা দিয়ে যদি লোহার মতো কিছু ফ্রেম বানাই, তো সেটা রুচিশীল হবে না।

সংবাদ প্রতিখন: আমরা দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন প্লাটফর্মে অনেকেই লেখালেখি করছেন যে বাঙালিদের মধ্যে বেশ একটা রাগের সঞ্চার ঘটেছে, বা বিভিন্ন শিল্পীর মধ্যেও অনেকে অনেক কথা বলছেন, খানিকটা দোষও দিচ্ছেন একে অপরকে। তো একজন শিল্পী হয়ে আপনি কী বলবেন?
দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়: রাগ-এর ব্যাপারটা ঠিক না। হ্যাঁ, সবাই একটু রেগে গেছে। একচুয়ালি বাঙালি হৃদয়ের চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্য ভালো জায়গাতে আছে। সবাই সেইভাবে নিয়েছে। তো সেই জায়গাটাকে এইভাবে বিকৃত করাতে স্বাভাবিক কারণে একটু রাগ সবার হয়েছে। যে একটা জিনিসকে সৃষ্টি করতে গিয়ে, এটা একটু বিকৃত হয়ে গেছে। সেইজন্যই হয়তো সবার মনে একটু ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে যে এই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এসব যাতা করা হচ্ছে। এটা সত্যি আমাদের বাঙালির ইমোশনে ঘা দেওয়া খানিকটা।

সংবাদ প্রতিখন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিভিন্ন সৃষ্টি বিদেশের মাটিতেও প্রদর্শিত হচ্ছে- স্বয়ং বাংলাতেই যদি এরকম বিকৃতি হয়, এতে বাঙালিদের কোনো দোষ কোথায়? মানে আমরা কি কোথাও পিছিয়ে পড়ছি নিজেদের সংস্কৃতি ধরে রাখতে?
দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়: হ্যাঁ, কিছু মানুষ তো করছে। কিছু মানুষ তো করছে। বাঙালি না হলে তো নৃত্যনাট্য সম্বন্ধে তাদের আইডিয়া থাকবে না বা রবীন্দ্রনাথের এই চণ্ডালিকা বলুন, চিত্রাঙ্গদা বলুন বা অন্যান্য যেসব নৃত্যনাট্য, সেগুলো নিয়ে আইডিয়া থাকবে না। বাঙালিরাই যদি করে, করছে করুক, অসুবিধা নেই। কিন্তু তার রুচি, ভাব, কাব্যকে বজায় রেখে যদি তার মডিফিকেশন করা হয়, মানুষ অবশ্যই ভালোভাবে নেবে।

