হাজার বছরের পুরনো এক মিষ্টির কথা

আত্রেয়ী দো :  পায়েস শুধু মিষ্টান্ন নয়, বাঙালির হৃদয়ের অংশ। পায়েস এমন এক খাবার, যা শুধু পেট ভরায় না, ভরে মনও। দুধ, চাল, চিনি বা গুড়ের সরল মিশ্রণেই তৈরি এই পদটি শুধু রান্নাঘরের নয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির পাতাতেও নিজের জায়গা করে নিয়েছে। জন্মদিন, অন্নপ্রাশন, পূজা—বাংলার প্রতিটি ঘরে পায়েসের উপস্থিতি অবধারিত।

কিন্তু জানেন কি, এই পায়েসের আবির্ভাব হাজার বছরেরও বেশি পুরনো? ‘পায়স’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “পয়ঃ” শব্দ থেকে —অর্থ “দুধ”। পুরাণ অনুসারে, পায়স দেবতাদের ‘অমৃত’-এর মতো পূণ্য খাবার ছিল।

বৈদিক যুগে পায়েসের জন্ম

পায়েসের ইতিহাস শুরু হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-৫০০ সালের বৈদিক যুগে। তখন এই খাবারটি পরিচিত ছিল “পায়সান্ন” বা “ক্ষীর” নামে। দুধ, চাল, ঘি ও কখনও মধুর সংমিশ্রণে প্রস্তুত এই পদটি ছিল দেবতার ভোগের অংশ। পায়েসকে মনে করা হতো শুদ্ধতা, কল্যাণ ও ঐশ্বর্যের প্রতীক, যা যজ্ঞ ও পূজার পর নিবেদন করা হতো।

ধর্মীয় গ্রন্থে পায়েসের উল্লেখ

পায়েস ভারতের ধর্মীয় ও পৌরাণিক সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য একটি খাবার।

রামায়ণ: রাজার যজ্ঞে প্রাপ্ত ‘পায়েস’ তিন রানি খাওয়ায় রাম-লক্ষণের জন্ম হয়েছিল।

মহাভারত ও বেদ: পায়েস বা ক্ষীর দেবতা ও অতিথি আপ্যায়নের বিশেষ খাবার।

এই প্রাচীন বর্ণনাগুলি প্রমাণ করে যে পায়েস ঈশ্বরিক আশীর্বাদের রূপে বিবেচিত হতো।

মন্দির ও উৎসবে পায়েস

ভারতের বহু মন্দিরে পায়েস এখনও ভোগ হিসেবে পরিবেশিত হয়।

জগন্নাথ মন্দির, পুরী: খিরি নামে পায়েস প্রসাদ।

দক্ষিণ ভারতের মন্দিরে: ‘পায়াসম’ অনন্য ভোগ পদ।

এই ধর্মীয় প্রচলন থেকে পায়েস ধীরে ধীরে ঘরের খাবার হয়ে ওঠে।

বিভিন্ন অঞ্চলে পায়েসের রূপ

ভারতজুড়ে পায়েসের বৈচিত্র্য লক্ষ্যণীয়:

বাংলা পায়েস: গোবিন্দভোগ চাল, খেজুর গুড়;

উত্তর ভারত: ক্ষীর বাসমতি চাল, এলাচ;

দক্ষিণ ভারত: পায়াসম সেমাই/ডাল, নারকেল দুধ

ওড়িশা: খিরি মন্দিরভোগ, তুলসীপাতা;

মুসলিম সংস্কৃতি: শির খুরমা খেজুর, বাদাম, সেমাই।

তবে বর্তমানে ,পায়েসের অনেক বৈচিত্র্য দেখা যায়। চাল ছাড়াও, সুজির পায়েস, চিঁড়ের পায়েস, ওটসের পায়েস, ছানার পায়েস, পনিরের পায়েস, রসগোল্লার পায়েস, সাবুর পায়েস ইত্যাদি আরো নানান রকমভাবে পায়েস তৈরি করা হয়।

বাঙালির জীবনে পায়েস

পায়েস শুধু খাবার নয় — এটি এক আবেগ, ঐতিহ্য ও পারিবারিক বন্ধনের প্রতীক।

অন্নপ্রাশন: শিশুর প্রথম চাল-গ্রহণ।

জন্মদিন: “আজ পায়েস খেয়েছো তো?” — এ যেন এক চিরকালীন প্রশ্ন।

পূজা-পার্বণ: সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মী পূজা সহ যেকোনো পুজোতেই পায়েস অপরিহার্য। বাঙালি নববর্ষেও পায়েসের বিশেষ জায়গা আছে।

গরম দুধে সেদ্ধ চাল আর নলেন গুড়ের মিশ্রণে তৈরি সেই শীতের পায়েস— এককথায় বাঙালির ঘরের সুগন্ধ।

পরিশেষে এটুকুই বলার, পায়েস এক চিরন্তন স্বাদের ইতিহাস যার যাত্রা শুরু হয়েছিল যজ্ঞের ভোগ হিসেবে, কিন্তু আজ তা প্রতিটি বাঙালি ঘরের চিরপরিচিত একটি মিষ্টান্ন।

প্রযুক্তির যুগে দাঁড়িয়ে, যখন সময় বাঁচাতে ফাস্টফুডের দিকেই ঝুঁকছে সমাজ, তখনও একটা বিশেষ দিনে মায়ের হাতে তৈরি পায়েসের স্বাদই যেন সত্যিকারের “উৎসব” হয়ে ওঠে।

পায়েস শুধু রান্নার পদ নয়—এটি আমাদের শিকড়, ইতিহাস, এবং মিষ্টি স্মৃতির অপরাহ্ণ।

(তথ্যসূত্র : অন্তর্জাল)
error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading