আইসক্রিমের জমজমাট ইতিহাস

এই প্রচণ্ড গরমে আবালবৃদ্ধবনিতা সকলেরই প্রিয় আইসক্রিম আর  তাই প্রাচীন রাজদরবার থেকে আধুনিক ফ্রিজ অবধি  আইসক্রিমের ইতিহাস নিয়ে লিখলেন আত্রেয়ী দো

 

When summer’s in the city,

And bricks a blaze of heat,

The Ice Cream Man with his little cart

Goes trundling down the street.

                 – Rachel Field.

মনে করুন, গরমে ঘেমে একেবারে ছ্যাঁকা খাওয়া অবস্থা। হঠাৎ ঠোঁটে ঠান্ডা এক চামচ আইসক্রিম! আহা! ঠান্ডা লাগার পর যে সুখের শিহরণ বয়ে যায় শরীর জুড়ে, তার তুলনা শুধু আইসক্রিম-প্রেমীরাই জানে! এই গরমে নিজের পছন্দের আইসক্রিম সাথে নিয়ে চলুন আমরা জেনে নিই সেই সুখের সূত্রটা আসলে কী দিয়ে তৈরি হয়!”

চকোলেট, বাটারস্কচ, ভ্যানিলা,স্ট্রবেরি, ম্যাংগো ইত্যাদি— নাম শুনলেই জিভে জল আসে! গরমে ঠান্ডা পরশ, উৎসবে খুশির ছোঁয়া— আইসক্রিম এখন শুধু একটি খাবার নয়, এক আবেগেরও নাম। কিন্তু জানেন কি, এই সুস্বাদু মিষ্টান্নের ইতিহাস সেই হাজার বছর পুরনো?

প্রাচীন যুগের ঠান্ডা অভিজ্ঞতা

চীন (খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দ): চীনের প্রাচীন ধনীদের মধ্যে দুধ, চাল ও বরফ মিশিয়ে এক ধরনের হিমশীতল মিষ্টান্ন খাওয়ার প্রচলন ছিল। অনেকে একে আধুনিক আইসক্রিমের পূর্বসূরি বলে মনে করেন পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্য:  বরফ ও তুষার সংগ্রহ করে তার সঙ্গে মধু, ফলের রস মিশিয়ে ঠান্ডা পানীয় বা মিষ্টান্ন তৈরি করা হতো। রোমান সম্রাট নেরো (৫৪-৬৮ খ্রিস্টাব্দ) পাহাড়ি বরফ এনে ফলের রস মিশিয়ে খেতেন।

মধ্যযুগে শরবতের জয়জয়কার

আরব বিশ্বে দুধ, চিনি, গোলাপজল ও বরফ মিশিয়ে তৈরি হতো শরবত জাতীয় ঠান্ডা পানীয়। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, এখান থেকেই ইউরোপে ‘ফ্রোজেন ডেজার্ট’-এর ধারণা ছড়িয়ে পড়ে।

ইউরোপে আধুনিক আইসক্রিমের যাত্রা

ইতালি ও ফ্রান্স: ১৬শ শতকে ইতালীয় অভিযাত্রী মার্কো পোলো চীন থেকে বরফ-ভিত্তিক ডেসার্ট তৈরির কৌশল ইউরোপে নিয়ে আসেন বলে অনুমান করা হয়। এরপর ইতালিতে “সোরবেট” এবং ফ্রান্সে “ফ্রোজেন ডেসার্ট”-এর প্রচলন হয়।

ফ্রান্সের রাজকীয় প্রাসাদে: ফ্রান্সের রাজা লুই চতুর্দশের সময় আইসক্রিম বা “ফ্রোজেন ক্রিম” ধীরে ধীরে বিলাসবহুল খাবার হিসেবে জনপ্রিয় হয়।

১৭৪৪ সালে প্রথম আইসক্রিম আমেরিকায় পরিচিত হয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন ও থমাস জেফারসন আইসক্রিম খুব পছন্দ করতেন।

১৮৪৩: ন্যান্সি জনসন নামের একজন আমেরিকান মহিলা প্রথম ম্যানুয়াল আইসক্রিম মেশিনের পেটেন্ট নেন।

১৮৫১: জ্যাকব ফাসেল নামক একজন দুগ্ধব্যবসায়ী বাল্ক আকারে আইসক্রিম উৎপাদনের সূচনা করেন — যেটি আইসক্রিম শিল্পের ভিত্তি।

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সর্বজনীন খাবার

২০শ শতকে শিল্প বিপ্লব: রেফ্রিজারেটরের আবিষ্কারের ফলে আইসক্রিম সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন সহজ হয়।

আইসক্রিম কোণের (cone) আবিষ্কার: ১৯০৪ সালে সেন্ট লুইস বিশ্বমেলায় আইসক্রিম কোণের প্রচলন ঘটে।

বিভিন্ন ফ্লেভার: ভ্যানিলা, চকোলেট ছাড়াও স্ট্রবেরি, মিক্সড ফ্রুট, মিন্ট প্রভৃতি ফ্লেভার তৈরি হয়।

বাংলায় আইসক্রিম

ব্রিটিশ আমলে প্রথম আইসক্রিম আসে বাংলায়। প্রথমদিকে কেবল উচ্চবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও স্বাধীনতার পর বিভিন্ন দেশীয় কোম্পানি যেমন পোলার, ইগলু, আরং ডেইরি সাশ্রয়ী মূল্যে আইসক্রিম বাজারজাত করে। এখন শহর থেকে গ্রাম— সর্বত্রই আইসক্রিম পৌঁছে গেছে শিশু-কিশোরের হাতের নাগালে।

এক সময়ের রাজদরবারের বিলাসিতার প্রতীক আজ সাধারণ মানুষের নিত্যসঙ্গী। গ্রীষ্মের দাবদাহ হোক কিংবা কোনো আনন্দঘন মুহূর্ত— আইসক্রিম সর্বদা একটুকরো স্বস্তি ও সুখের বার্তা নিয়ে আসে। প্রাচীন সভ্যতার হাতে তৈরি বরফ-মিশ্রণ থেকে শুরু করে আজকের ফ্লেভার-বহুল, চকচকে কন-এ পরিবেশিত আইসক্রিম — এ এক দীর্ঘ ও মজার ইতিহাস।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট।
error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading