আজ আন্তর্জাতিক মা দিবস। এই নিয়েই লিখলেন কিশলয় মুখোপাধ্যায়

‘ও তোতা পাখিরে/ শিকল খুলে উড়িয়ে দেব /মাকে যদি এনে দাও..’। নির্মলা মিশ্রের সেই গান যা সবার মন আর হৃদয়কে নাড়া দেয়। একটি ছোট্ট শব্দ ‘মা’ কিন্তু অর্থ কত ব্যাপক। মা উচ্চারণে আসে এক অনাবিল আনন্দ আর মন ও প্রাণ স্নিগ্ধ হয়। বি.বি.সি. প্রায় ১০০ দেশের চল্লিশ হাজার মানুষের মধ্যে সার্ভে করে দেখেছিল যে সবচেয়ে প্রিয় শব্দ Mother বা মা। শ্রীরামকৃষ্ণদেব যথার্থ বলেছেন যে ‘ সন্তান মা নামে ডাকতে যত আনন্দ পায়, আর অন্য কোনও নামে তত আনন্দ পায়না’।
সন্ন্যাস জীবন যাপনে সাধাণত পূর্বাশ্রম সম্পর্কে সন্ন্যাসীরা নিরবই থাকেন। তবে স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রীশ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু এবং বেদান্তী শ্রী শঙ্করাচার্য্য মাতৃভক্ত ছিলেন। এই বিষয় প্রখ্যাত লেখক শংকরকে একটি সুন্দর কথা বলেছিলেন স্বামী রঙ্গথানানন্দ জী। তিনি বলতেন ‘ সন্ন্যাসীরা তো সন্তানের জন্ম দেননা কিন্তু সংঘকে বাঁচিয়ে রাখতে তো প্রয়োজন হয় নতুন সন্ন্যাসীদের। তাঁদের উপহার দেন গৃহীরা, কেউতো ভূমিষ্ঠ হয়েই সন্ন্যাসী হয়না, তাদের প্রস্তুত করতে হয়তো। গৃহীর সংসারে সেখানে জনক-জননীর মস্ত বড় ভূমিকা থাকবেনা’?
স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন ‘ আমার প্রাণের বিকাশের জন্য আমি মায়ের কাছে ঋণী’। মহাপ্রভু সম্পর্কে শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন ‘মা কি কম জিনিস গা? শ্রীচৈতন্যদেব কত বুঝিয়ে,অনুমতি নিয়ে তবে মার কাছ থেকে চলে আসতে পারলেন’। মহাপ্রভু জননী শচীদেবী যখন নিমাইকে সন্ন্যাস জীবনের অনুমতি দিচ্ছেন তখন তাঁর আটটি কন্যা সন্তান বাল্য কালেই মারা গেছে আর জ্যেষ্ঠ পুত্র বিশ্বরূপ তখন সন্ন্যাসী আর তাঁর কোন খোঁজ নেই ।আরেকটি কথা না বললেই নয় সমস্ত কাব্যগ্রন্থে মহাপ্রভু শচীনন্দনরূপেই সম্বোধিত হয়েছেন। আর শঙ্কর-জননী যখন বললেন ‘এই সংসারে তুমি ছাড়া আমারতো কেউ নেই। কে আমার সৎকার করবে’। শঙ্করাচার্য বললেন ‘কেন আমি। যেখানেই থাকি ঠিক চলে আসব’। শঙ্করাচার্যের মা বললেন ‘তুমি সন্ন্যাসী। কখন কোথায় আছ জানব কী করে ‘? তখন শঙ্করাচার্য বলেছিলেন সেই অমোঘ সত্য কথা। তিনি বললেন ‘মা শাস্ত্রবাক্য কখনও মিথ্যা হবার নয়। শাস্ত্রে আছে, জননী যখন বিদেশে অবস্থিত পুত্রের বিষয় স্মরণ করেন,তখন পুত্র জিহ্বায় মাতৃস্তন্যের আস্বাদ অনুভব করে’। এটাই সৃষ্টির শেষ কথা ‘ তুমি মাতা, আমি সন্তান, এ জীবন তোমারই দান।
সমাজে মাতৃত্ব মানেই সমস্ত ত্যাগস্বীকার এরকম একটা ধারনা দেওয়া হয়। কিন্তু এটাও আমাদেরকে তথা সমাজকে মনে রাখতে হবে মা ও মানুষ। তারও নিজস্ব জীবন ও যাপন রয়েছে ,কাজ রয়েছে। মা ভালো থাকলে সন্তানও ভালো থাকবে।
গিরিন্দ্রমোহিনী দাসী ‘মাতা’ কবিতায় লিখছেন ‘ ভুলে যাই সব ব্যাথা, ঘুমাইয়া ওই পূণ্য কোলে’। জীবনের সমস্ত দুঃখ কষ্ট মোচনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হল মায়ের আঁচল।
