চৈত্র অবসানে আসে নতুন বছর। আর নতুন বছরের প্রথম দিনের আগের দিনটিতে আমরা পালন করি চড়ক বা গাজন উত্সব। দেবাদিদেব মহাদেবের এই উত্সব সম্পর্কে লিখলেন কিশলয় মুখোপাধ্যায়

‘হাতে ত্রিশূল রাঙা লাটি, পরিধানে বাঘের ছাল।
বৃষভ বাহনে শিব, ত্রিদশের নাথ।
জাগরে জাগরে ভাই, সত্যের কোটাল।
মুক্ত হইল ঠাকুরের পূর্বদ্ধার।’
শিব বন্দনা, শিবের গান বা গাজন উৎসব আর রয়েছে চড়ক উৎসব। চৈত্র মাস মানেই সারা বাংলায় শুরু হয় চড়ক ও গাজন। বারো মাসে তেরো পার্বণের শেষ পার্বণ হল চড়ক ও গাজন। একে নীল পুজোও বলা হয়। সেই জন্য বৈশাখ মাসে যে চড়ক হয় তাকে বলে বাসি চড়ক। আবার কোথাও কোথাও বলে পচা চড়ক। যেমন হগলি জেলার কোন্নগরে হয় বাসি চড়ক। সেরকম বরানগরের বিটি রোডের পাল পাড়ায় হয় পচা চড়কের মেলা।
গাজন সারা বাংলার আনাচে কানাচে অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত তারকেশ্বরের বাবা তারকনাথ। এখানে নীলষষ্ঠীর দিন নীলাবতীর বিয়ে হয়। অর্থাৎ শিব পার্বতীর বিবাহ। এদিন তাই মন্দিরে কোন ভোগ নিবেদন করা হয়না। শিবরাত্রীর দিনও এই নিয়ম পালন করা হয়। এই বাংলায় ‘বরমতী’ অর্থাৎ বারো অধ্যায় আর ‘গৃহভরণ’ অর্থাৎ ধর্মপূরাণ মতে গাজন, এই দুরকম গাজন প্রসিদ্ধ।

তারকেশ্বর ছাড়া চূঁচুড়ার ‘ষণ্ডেশ্বর জিউ’, আরামবাগের উদিবপুর গ্রামের ঘণ্টেশ্বর, নদীয়ার শান্তিপুরের জলেশ্বর শিবের গাজন, পশ্চিম মেদিনীপুরের কাষ্ঠখামার গ্রামে প্রায় ৬২ ফুট উচ্চতার শ্রী বটেশ্বর বাবার শিব মন্দিরের গাজন উল্লেখযোগ্য ।
চুঁচুড়ার শেষ ওলন্দাজ গভর্ণর অ্যান্টনি ওভারবেক ছিলেন ষণ্ডেশ্বর জিউর পরম ভক্ত। তিনি পিতলের বৃহৎ ঢাক উপহার দিয়েছিলেন। গাজনে যাঁরা সন্ন্যাসী হন তাঁরা নিজ নিজ গোত্র ত্যাগ করে শিবগোত্র গ্রহণ করেন। এরপর নানা কঠোর নিয়ম পালনের মাধ্যমে শিবের পুজো করেন। এরপর পয়লা বৈশাখের দিন শিবগোত্র ত্যাগ করে নিজ নিজ গোত্র গ্রহণ করেন।
কাটোয়ার কাছে সিঙ্গি গ্রামে শ্রী বুড়োশিব, পূর্ব মেদিনীপুর জেলার দাঁড়রা গ্রামের শ্রী ঈশানেশ্বর, বাঁকুড়া জেলার ডিহিপাড়ার শ্রী মধুকেশ্বর , বীরভূম জেলার মল্লারপুরের শ্রী মল্লেশ্বর, বৈদ্যবাটির শ্রী রাঘবেশ্বর, মহানাদের শ্রী অখিলেশ্বর, ভাণ্ডারহাটির শ্রী শৈলেশ্বর, গুড়াপের শ্রী গৌড়েশ্বর, রাজহাটির শ্রী বদ্রেশ্বর এবং গোটা উত্তর বঙ্গ সহ অজস্র গ্রামের আর মফস্বলের শিব মন্দিরে মহাসমারোহে হয় চড়ক, গাজন আর নীল পুজো। বাঙালির লোকপ্রিয় উৎসব। তাই বাংলার ছড়াতেও রয়েছে এই গাজন।
‘আমরা দুটি ভাই
শিবের গাজন গাই।
ঠাকমা গেল গয়া কাশি
ডুগডুগি বাজাই।
