কলকাতা ছাড়িয়ে বনেদী বাড়ির পুজো- পঞ্চম পর্ব

বৈদ্যবাটির হালদার বাড়ির দুর্গাপুজো

হুগলি জেলার প্রাচীন শহর বৈদ্যবাটি। এই শহরের শতাব্দী প্রাচীন পুজো হালদার বাড়ির দুর্গাপুজো নিয়ে লিখলেন সুনীতি কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

হুগলী জেলার বৈদ্যবাটি স্টেশনে নেমে সুপ্রসিদ্ধ নিমাইতীর্থ ঘাট যেতে যে পথ ধরে যেতে হয় সেই পথটির নাম নিমাই তীর্থ রোড। আর এই রাস্তার ওপরেই শতবর্ষ পুরোনো হালদার বাড়ির দুর্গাপুজো। যে পুজো আজও সমান আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এই এলাকার সকল জনগণের কাছে।

আর এই কারণে বৈদ্যবাটি শহরের সুপ্রাচীন এই বাড়ির পুজোর ইতিহাসের অনুসন্ধানে হাজির হয়েছিলাম এন টি রোড বা নিমাই তীর্থ রোডে আচার্য্যি গলির হালদার বাড়িতে। তাঁদের বাড়ির পুজোর সঠিক বয়স ও ইতিহাস সম্পর্কে জানাচ্ছিলেন এই পরিবারের বয়স্কা সদস্যা শ্রীমত্যা গীতারাণী হালদার। তাঁর কথায় জানা গেল, তাঁর শ্বশুর স্বর্গীয় শরত্‍চন্দ্র হালদার তাঁদের পরিবারে এই পুজোকে পুনরায় চালু করেছিলেন। অর্থাত্‍ তাঁদের পরিবারের পুজোর সঠিক বয়স যে কত তা তাঁরা নিজেরাই বলতে পারেন না।

বৈদ্যবাটি শহরের পার্শবর্তী শহর চাঁপদানী, এই চাঁপদানীর জমিদার ছিল মুখোপাধ্যায় পরিবার। চাঁপদানী মুখার্জী বাড়ির স্বর্গীয় শরত্‍ মুখার্জীকে হালদার পরিবারের স্বর্গীয় শরত্‍চন্দ্র হালদার একবার দুঃখ করে বলেছিলেন তাঁর পরিবারের বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রাচীন দুর্গাপুজো আবার তিনি চালু করতে চান। তাঁর অনুরোধে সাড়া দিয়ে চাঁপদানীর জমিদার স্বর্গীয় শরত্‍ মুখার্জী পুজোর দান সামগ্রী কিনে দেন হালদার বাড়ির পুজোকে পুনরায় শুরু করার জন্য। বৈদ্যবাটির হালদার বাড়িতে আবার আগমন ঘটে মায়ের। কিন্তু আর্থিক অনটনের কারণে কী ভাবে সঠিক রূপে দেবীর আরাধনা করা সম্ভব হবে এই ভেবে স্বর্গীয় শরত্‍চন্দ্র হালদার মায়ের কাছে কান্না-কাটি করতে থাকেন। সেকালে হালদার বাড়ির পিছনের দিকে ছিল গোয়ালঘর, আর ওই গোয়ালঘরে থাকতো বেশ কয়েকটি গরু। এদিকে স্বর্গীয় শরত্‍চন্দ্র হালদার যখন মায়ের কাছে কেঁদে নিজের অক্ষমতার কথা জানাচ্ছেন, তখন একটি ছোট্ট মেয়ে যাঁর গায়ের রঙ কালো, নাকে নথ, এসে স্বর্গীয় শরত্‍চন্দ্র হালদারকে বলেন তুই এখানে বসে কাঁদছিস, আর তোর গোয়ালের গরুগুলো যে না খেতে পেয়ে মরতে বসেছে।

এই কথা শুনে স্বর্গীয় শরত্‍চন্দ্র হালদার তাঁর এক আত্মীয়াকে বলেন গরুগুলকে খাবার দিতে। ওদিকে ওই আত্মীয়া যখন খাবার দিতে জন তখন তিনি গোয়ালঘরের সামনে পড়ে গিয়ে জ্ঞান হারান। ওইখানেই তাঁর মা দুর্গার ভর হয় এবং সেই ভরে তিনি বলেন, যে মহিলার সন্তান হবে না তাঁকে দেবীর মন্ত্রপুত ঘি খাওয়াতে হবে রবিবার। আর এর ফলে ওই রমণীর সন্তান হবে ও তাঁকে পুজোর অষ্টমীর দিন ঠাকুর দালানে নিয়ে এসে মাথা মুড়িয়ে দেবীর একশত আটটি নামের একটি নামে নামকরণ করতে হবে ওই সন্তানের। এর সঙ্গে সঙ্গে যে গরুর দুধ হবে না সেই গরুকে এই বাড়ির পিছনে থাকে শিবপুকুরের জল পান করালে ওই গাভীর দুধ হবেই, আর এর ফলে দেবীর দোয়ায় এই পরিবার পাবে দান সামগ্রী।

কিন্তু দেখা গেল সেই দান পেয়েও কিন্তু এই পরিবার ঠিক উপায়ে দেবীর পুজো করতে সক্ষম হচ্ছিলেন না।  একবার বৈদ্যবাটির বাসিন্দা স্বর্গীয় লক্ষ্মীনারায়ণ গুপ্ত তাঁর নিজের বাড়িতে বসে কাগজ পড়ছিলেন, এমন সময় একটু ছোট্ট মেয়ে এসে তাঁকে বলেন যে সে এখানে বসে কাগজ পড়ছে কিন্তু ফলের অভাবে হালদার বাড়িতে আমার পুজো বন্ধ হতে চলেছে। এই কথা শুনে তিনি ধামা ভরে ফল নিয়ে হাজির হন হালদার বাড়ি।

সেই থেকে আজও সমান ভাবে তাঁর পরিবার অষ্টমীর দিন হালদার বাড়ি পৌঁছে দেন মায়ের পূজার ফল। দেবীর আদেশে আজও বৈদ্যবাটির ভদ্রকালী মন্দিরে বোধনের পর থেকে পুজোর প্রতিটি দিন মায়ের নৈবেদ্য পৌন্ম্চে দেওয়া হয় স্থানীয় ভদ্রকালী মন্দিরে।

আজও নিয়ম মেনে বৈদ্যবাটির হালদার বাড়ির পুজোয় দেবীর কাঠামো পুজো হয় জন্মাষ্টমীড় দিন। বাড়ির বড় ছেলের হাতের মাপে বাঁশ কেটে সেই বংশে তেল, হলুদ লাগিয়ে গঙ্গা থেকে চান করিয়ে নিয়ে এলে পুরোহিত সেই বাঁশটিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন এবং দুর্গাপুজোর ষষ্টির দিন ওই বাঁশটিকে দেবীর কাঠামোর পিছনে বেঁধে দেওয়া হয়।

এই বাড়ির পুজোয় সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে যথাক্রমে ১৬, ২২ ও ২৬ টি নৈবেদ্য করা হয়। অষ্টমীর দিন হয় ধূনো পোড়ানো। পুজোর প্রতিদিনই যথাসম্ভব ভোগ বিতরণ করা হয়ে থাকে।

একসময় ঠকুর দালানটি ছিল হোগলাপাতায় তৈরী। ঠাকুরদালানের পিছনে ছিল বিশাল হোগলার বন আর বিশাল শিবপুকুর। এই বিশাল পুকুরে জোয়ার ভাটা খেলত।  বর্তমানে ঠাকুর দালানটি পাকা হয়েছে। হোগলার বন আর নেই। তবে মাঝের বিশাল শিবপুকুর আজও বর্তমান। এখনও দেখা যায় পথচলতি পথিক এই গলির মুখে দাঁড়িয়ে মাকে ভক্তিভরে প্রণাম করছেন।

তথ্য:  শ্রীমত্যা গীতারাণী হালদার ও সুখেন্দু প্রসাদ হালদার

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

Powered by Joinchat