
অভিজিৎ দত্ত: জিয়াগঞ্জ তথা মুর্শিদাবাদ জেলার সবচেয়ে প্রাচীনতম দুর্গা মন্দির জিয়াগঞ্জ, মহাজনপট্টির বাংলা মন্দির। অথচ অনেকেই এ সম্পর্কে সচেতন নন বা খবর রাখেন না। এই কারণে অনেকেই বাঙালিদের ইতিহাস ভুলে যাওয়া জাতি বলে নিন্দা-মন্দ করেন। যাইহোক বাংলা মন্দিরের দুর্গা পূজার ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ১০০৫ বঙ্গাব্দে বাংলা মন্দিরে দুর্গা পুজোর প্রচলন হয়। বর্তমান এ এই পূজো ৪২৫ বছরে পা দিল।
জনশ্রুতি অনুযায়ী ১০০৫ বঙ্গাব্দের বেশ কিছুকাল আগে থেকেই জিয়াগঞ্জ ভট্টপাড়া-মহাজনপট্টি এলাকায় লোকনাথ রায় বলে একজন নিষ্ঠাবান, অকৃতদার ব্রাহ্মণ সাধকের আর্বিভাব হয়েছিল। সেইসময় বাংলাদেশে নবাবদের শাসন চলছিল। তখন জিয়াগঞ্জের পূর্ব নাম ছিল বালুচর। বালুচরি শাড়ি এখান থেকেই বিখ্যাত হয়েছিল। পরবর্তীকালে ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে এই জায়গার নাম হয় জিয়াগঞ্জ। শতাধিক প্রাচীন জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ পৌরসভার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে ভাগিরথী নদী।ভাগীরথীর পূর্ব পাড়ে জিয়াগঞ্জ ও পশ্চিম পাড়ে আজিমগঞ্জ শহরটি বিদ্যমান। সেইসময় বাংলাদেশে মুসলমান নবাবদের রাজত্ব কাল।তখন এখানে বাংলা ভাষা শিক্ষার কোন স্থান ছিল না।এই অবস্থায় লোকনাথ রায় বালুচরের বালক-বালিকাদের শিক্ষার জন্য বর্তমানে যেখানে মন্দির আছে সেখানে জনগণের সাহায্য-সহযোগিতায় ‘বাংলা পাঠশালা ‘নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিনি নিজে এখানে শিক্ষকতা করতেন।

সেই সময় বালুচরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজোর জন্য কোন স্হায়ী বারোয়ারী মন্দির ছিল না।জনগণের এই সমস্যা দূর করার জন্য লোকনাথ রায় নিজে উদ্যোগ নিলেন এবং স্হানীয় জনগণের সহায়তাই খড়ের চালাঘর নির্মাণ করে পাঠশালার ঐখানেই ১০০৫ বঙ্গাব্দে বারোয়ারি দুর্গাপুজোর প্রচলন শুরু করলেন। তিনি নিজে এই পূজা পরিচালনা করতেন। তখন থেকেই এই মন্দির’ বাংলা মন্দির নামে পরিচিত। এই বাংলা মন্দির জিয়াগঞ্জ তথা মুর্শিদাবাদ জেলার দুর্গা পুজোর প্রথম বারোয়ারি মন্দির। কালক্রমে বালুচর নামটি কালের গর্ভে হারিয়ে যায় এবং জিয়াগঞ্জ নামটির প্রচলন শুরু হয়।
প্রয়াত লোকনাথ রায়ের অবর্তমানে বাংলা মন্দিরের বাংলা পাঠশালা ও দুর্গা পুজোর দায়িত্ব জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জের তৎকালীন কিছু প্রভাবশালী জমিদার, ব্যবসায়ী ও শিক্ষিত জনগণ একত্রিত হয়ে মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব নেন। এরপর এখানকার বাংলা পাঠশালাটি কিছুকাল চলার পর আর্থিক সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায় কিন্ত বাংলা মন্দিরের দুর্গা পূজা চালু থাকে। এইভাবেই কিছুকাল চলার পর জনগণের সহায়তায় এবং বাংলা মন্দির কমিটির পৃষ্টপোষকতায় মন্দির ও নাট মন্দির গড়ে তোলা হয়। সেইসময় বাংলা মন্দিরে কমিটির পরিচালনায় ভারতীয় নাট্য সমাজ নামে নাটক চর্চার একটি কেন্দ্র ছিল। সেই সময়কার তৎকালীন লালগোলার মহারাজের আর্থিক সহায়তায় নাট মন্দিরের পূর্বদিকে একটি বড় হলঘর নাট্যচর্চার জন্য গড়ে তোলা হয়। এই হলঘরের নাম রাখা হয়, লালগোলা কুটির। তখন ভারতীয় নাট্য সমাজের সদস্যদের দ্বারা অবিভক্ত বাংলায় ভালো ভালো নাটক অভিনীত হতো। কিন্ত সেই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে আর নেই। কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তবুও অতীতের বাংলা মন্দির কমিটির পরিচালনায় ও সেইসময়কার বহু মানুষের সহায়তায় বাংলা মন্দিরের স্হাবর-অস্হাবর সম্পত্তি গড়ে উঠেছে।

বর্তমান বাংলা মন্দির নিজস্ব নয় শতক জমির উপর নির্মিত। বর্তমান মন্দিরে মন্দির কক্ষ ছাড়াও রয়েছে পশ্চিম দিকে ফল ঘর, পূর্ব দিকে রান্নার ঘর, পিছন দিকে প্রসাদ বিতরণের জন্য গ্রীল দেওয়া লম্বা বারান্দা, মন্দিরের সামনে ভক্তজনের বসার জন্য বিরাট বারান্দা। মন্দির গৃহের উত্তর দিকে একটা হলঘর। নাট মন্দিরের পশ্চিম দিকে পূজার ডাকা নেওয়ার ঘর। বকুলতলা, শিবমন্দির ও ঢুলিদের থাকার ঘর।
বাংলা মন্দির মুর্শিদাবাদ জেলা তথা পশ্চিমবঙ্গের একটি ঐতিহ্যশালী ও প্রাচীন মন্দির এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব যথেষ্ট রয়েছে। বিখ্যাত লেখক ও নাট্যকার বিধায়ক ভট্টাচার্যের লেখা ঢুলি সিনেমার শুটিং এই বাংলা মন্দিরেই হয়েছে। বিধায়ক ভট্টাচার্যের পিতা হরিচরণ ভট্টাচার্য মহাশয় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই মন্দিরের পূজারী ছিলেন। তার মৃত্যুর পর বিধায়ক ভট্টাচার্য নিজেও কয়েকবার পূজো করেছেন। বাংলা মন্দিরের একটা ঐতিহ্য হলো, প্রাচীনকাল থেকে এখনও পর্যন্ত এই মন্দিরে ঢোল বাজে। ঢুলিরা প্রতিবছর এখানে এসে ঢোল বাজান।

বাংলা মন্দির সম্পর্কে লোকমুখে অনেক অলৌকিক কাহিনী শোনা যায়। শোনা যায় মন্দিরের বকুল গাছের কোঠরে একজোড়া বড় বিষাক্ত গোখরে সাপ আছে। তারা সারা মন্দিরকে দুষ্কৃতীদের হাত থেকে রক্ষা করে। প্রতিবছর বাংলা মন্দিরের প্রতিমা তৈরির সময় শিল্পীরা তা প্রত্যক্ষ করেছেন।
দ্বিতীয় যে অলৌকিক ঘটনাটি শোনা যায় তা হল, হরিচরণ ভট্টাচার্য মহাশয় বাংলা মন্দিরের পুরোহিত থাকাকালীন দুর্গা মা তাকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে খরমুজ ফল দিয়ে ভোগ দেবার কথা বলে। ওই সময় খরমুজের মরসুম ছিল না। তাছাড়া এখনকার মতো হিমঘরও ছিল না যে বারো মাসই সব জিনিস পাওয়া যাবে। পুরোহিতমশায় সহ সকলে খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। সেই সময় কয়েকটি ছেলে মন্দিরের ছাদে লতা গাছে দুটো খরমুজ রয়েছে বলে পুরোহিতমশায়কে জানায়। পুরোহিতমশায় ছেলেদের সঙ্গে ছাদে এসে লতা গাছ থেকে খরমুজ দুটো ছাড়িয়ে নিয়ে এসে মায়ের ভোগে উৎসর্গ করেন। খবরটি জানতে পেরে সকলেই খুব বিষ্মিত হয়। বাংলা মায়ের এই অলৌকিক ক্ষমতা বহু মানুষকে আকৃষ্ট করে।
