কলকাতা ছাড়িয়ে বনেদী বাড়ির পুজো- প্রথম পর্ব

হাওড়া অমরাগড়ী রায় পরিবারের তিন শতাব্দী প্রাচীন দূর্গোৎসব     

তিন শতাব্দী প্রাচীন যে পুজোয় বলির সময়ে বাঘের ঘাড়ে লাফ দিয়ে পড়ে বাঘের মুন্ডচ্ছেদ করার পর থেকে বন্ধ বলি। সেই পুজো নিয়ে লিখলেন হাওড়া থেকে ‌অভিজিৎ হাজরা

৩০৪ অতিক্রম করে ৩০৫ বছরে পদার্পণ করা হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়ার অমরাগড়ী গ্রামের রায় পরিবারের পুজো। এই পুজো সম্পর্কে বিস্তারিত জানানোর আগে আপনাদের জানাই এই পরিবারের শ্রী শ্রী গজলক্ষী মাতা এস্টেট সম্পর্কের জানানো প্রয়োজন, আর এ প্রসঙ্গে  এই এস্টেটের বর্তমান সম্পাদক তথা এই পরিবারের অন্যতম সদস্য সৌরভ রায় জানান, তাঁদের এই এস্টেটটি গঠিত হয়েছিল বাংলার ১১২৬ বঙ্গাব্দের ১৫ ই বৈশাখ। বতর্মানে ৩০৫ বছরে পদার্পণ করেছে এই স্টেটটি। এই স্টেটের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন স্বর্গীয় শান্তি রায়। তিনি বাণিজ্য করতে বেড়িয়ে এই গ্রামে রাত্রী যাপনের জন্য নৌকা নোঙর করেন। সেই রাত্রে মা গজলক্ষী স্বর্গীয় শান্তি রায়কে স্বপ্নাদেশ দিয়ে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার আদেশ দেন।

সেই আদেশ পেয়ে তিনি অমরাগড়ী গ্রামে বসবাস শুরু করেন। গ্রামবাসীদের নিয়ে গড়ে তোলেন শ্রী শ্রী গজলক্ষী মাতা এস্টেট। তিনি বাইরে থেকে সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষজনদের এনে এই গ্রামে বসবাস করান এবং গ্রামটিকে একটি আদর্শ গ্রামে রূপান্তরিত করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত এই এস্টেট একই নিয়মে চলে আসছে।

রায় পরিবারের দুর্গাপুজোর আজও দেখতে পাওয়া যায় একচালার চামুণ্ডা মূর্তি।  মহালয়ার পরের দিন অর্থাৎ প্রতিপদ থেকে শুরু হয়ে যায় এই বাড়ির পুজো। দেবীর চন্ডীপাঠ, নিত্যদিনের সন্ধ্যারতির মাধ্যমে প্রতিপদের দিন থেকে পরিবারের দূর্গোৎসব পূর্ণমাত্রা এনে দেয়।

কথিত আছে প্রায় ১৮২ বৎসর আগে এই পুজোয় মহিষ বলি হত। বতর্মানে বলি বন্ধ। কারণ ১৮২ বৎসর আগে এই অমরাগড়ী এলাকাটি ছিল জল-জঙ্গল, পশু-জন্তুদের বাসস্থান। শোনা যায়, এক বছর দূর্গা পুজোর সন্ধিপুজোর সময় ছিল রাত্রে। কামার মহিষ বলি দেওয়ার জন্য বাড়ি থেকে রাত্রে বেরিয়ে ছিল। রাস্তায় কামারকে হঠাৎ বাঘে আক্রমণ করে। কামার বাঘের ভয়ে প্রাণ বাঁচানোর জন্য সামনের একটি গাছে উঠে পড়ে। অনেকক্ষণ কামার গাছে বসে আছে। এদিকে সন্ধিক্ষণের সন্ধিপুজোর বলির সময় এগিয়ে আসছে। বাঘ গাছের নিচে থেকে সরছে না। এদিকে পুজো মন্ডপে সন্ধিপূজার ঘন্টা পড়ছে। তখনও বাঘ গাছের নিচে থেকে সরছে না। তখন কামার উপায় না দেখে দেবীর নাম স্মরণ করে গাছ থেকে লাফ দিলে বাঘের ঘাড়ের উপর পড়ে। কামারের হাতে থাকা কাতানের আঘাতে বাঘের মন্ডুচ্ছেদ হয় ও সন্ধিপুজোরও বলি ওখানেই সমাপন ঘটে। সেই রাত্রে দেবী স্বপ্নাদেশ দিয়ে বলেন, “কিরে আমার বাহনকে মেরে ফেললি? তোরা বলি বন্ধ কর”। সেই থেকেই বলি বন্ধ হয়ে গেছে।

এই বাড়ির পুজোর পঞ্চমীর দিন বাড়ির মেয়ে, গৃহবধূরা প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টি নারকেল নাড়ু তৈরি করেন। সপ্তমীর দিন নবপত্রিকাকে পালকির মত দুলিয়ে দুলিয়ে মন্ডপে প্রবেশ করানো হয়। অষ্টমীর দিন একই  সময়ে সন্ধিপুজো, হোম, ধূনোপোড়া, আরতি, ১০৮ টি প্রদীপ জ্বালানো হয়। পূজার নবমীর দিন সন্ধ্যেবেলায় লুচি ও দানাদার ভোগ সবাইকে বিতরণ করা হয়। এই পূজার আরও একটি বৈশিষ্ট্য এই দূর্গা প্রতিমা দশমীর দিন দুপুর ১২ টার পর বিসর্জন হয়। এর কারণ ১৫২ বছর আগে এই রায় পরিবারের এক সদস্য দশমীর দিন দুপুর ১২ টার সময় মারা যান। সেই থেকেই অমরাগড়ী রায় পরিবারের দূর্গা প্রতিমা দুপুর ১২ টার পর বিসর্জন হয়ে আসছে। এই দূর্গা প্রতিমা বিসর্জন হয় মন্দিরের পাশের প্রতিষ্ঠা করা পুকুরে। অমরাগড়ী গ্রামে একটিই দূর্গাপূজা। এটি এখন আর রায় পরিবারের পূজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গ্রামের সবাই এসে প্রত্যহ পূজা দেন। পূজা মন্ডপে এসে ভিড় জমান। একে অপরের খোঁজ খবর নেন ও উৎসব মন্ডপকে মিলনস্থলের রূপ দেন।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading