আমার দেখা পুজোর সেকাল একাল

সুনীতি কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় : যে সালের কথার বলছি, সেটা ১৯৬০ বা  ১৯৬২। সেই সময়ের দুর্গাপূজোর সঙ্গে আজকের অর্থাৎ একালের পূজোর একটা বিশাল পার্থক্য এসেছে। তখন আমরা মোটামুটি ছোটদের পর্যায়ে পড়ি। বয়েস তখন অল্পই। সারাবছর অপেক্ষা করে থাকতাম করে দুর্গাপুজো আসবে? মহালয়ার দিন থেকেই সাজসাজ রব পড়ে যেত। শরতের আকাশে পেঁজা তুলোর মত সাদা মেঘ ভেসে যাছে, শিশির ভেজা ঘাসে শিউলি গাছের তলায় সাদা একরাশ শিউলি ফুল ছড়িয়ে আছে, মাঠে মাঠে সাদা বকের মত কাশবনের দল হাওয়ায় দোলা দিয়ে জানান দিচ্ছে মায়ের আগমনী বার্তা।

মহালয়ার ঠিক একসপ্তাহ আগে থেকেই রেডিওর দোকানগুলোতে রেডিও সারাবার ভিড় লেগে যেত। পুরোনো রেডিও ঠিকমত চলছে কিনা সেটা একবার দেখে নেওয়া, শুধুমাত্র মহালয়ার অনুষ্ঠান শোনার জন্য। অনেকে আবার এই সময়ে নতুন রেডিও দোকান থেকে কিনে নিয়ে যেতেন। মহালয়ার আগের দিন রাত থেকেই বিছানায় শুয়ে ছটফট করতাম কখন ভোররাতে মহালয়ার অনুষ্ঠান শুনতে পাবো?

ভোররাতে প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই বেজে উঠত রেডিও। বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের সেই কন্ঠ, ‘যা দেবী সর্বভূতেষু…’।

পুজোর জামা কাপড় প্রায় মাসখানেক আগে থেকেই কেনা শুরু হয়ে যেত। যৌথপরিবার, সুতরাং প্রত্যেকেই কিছু না কিছু নতুন জামাকাপড় আশা করত। সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরে বিশাল দামি যে জামাকাপড় হতো তা নয়, তবে সবাই এসময় একখানা নতুন সুতী বস্ত্রের আশায় থাকতো।

সেই সময় ঠাকুরও যে বেশি হতো তা নয়। কিন্তু জমিদার বড়ি বা বনেদী বাড়িতে সাধারণত পুজো হত। বারোয়ারী পূজোমন্ডপগুলির সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। কাজেই এক পূজো মডপের সঙ্গে আর এক পূজো মডপের দূরত্ব ছিল একটু বেশি।

পূজোমন্ডপগুলির বেশির ভাগই বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে সেই সংগৃহীত অর্থের মাধ্যমে পুজো হতো। এই বারোয়ারীগুলির যারা চাঁদা আদায় করতেন তাঁরা অনেক নমনীয় ছিলেন। কাজেই দাতা এবং গহীতার মধ্যে একটা হৃদতা ছিল।

বাড়ির পুজোগুলির প্রতিমা হত মাঝারী মাপের, দুর্গার রঙ হতো বাসন্তী রঙের, আর অসুরের রঙ হত সবুজ। দুর্গার রণংদেহী মূর্তি আর অসুরের অস্ত্র হাতে যুদ্ধ শিল্পীর সৃষ্টিতে সারা মডপ যেন গমগম করতো।

তবে কিছু কিছু মন্ডপে ঠাকুরের রঙ বা মাপ একটু অন্য ধরনের হতো। বাড়ি বা জমিদার বাড়ির পুজোতে ছাগল বলি ও মোষ বলি হতো।

ষষ্ঠী থেকে নবমী সব বড়িতেই পূজোকে ঘিরে থাকতো একটা উৎসবের মেজাজ। সপ্তমী থেকে শুরু হত ছোটদের মন্ডপ ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখা, অবশ্যই পায়ে হেঁটে। যৌথপরিবারের ভাইবোন। খুড়তুতো, মামাতো, পিসতুতো ভাইাবোনেরা সব একসঙ্গে হাতে হাত ধরে পায়ে পা মিলিয়ে।

কে কটা ঠাকুর দেখেছে সেই নিয়ে পড়ে ছিল বন্ধুদের মধ্যে আলোচনা, পকেটে মায়ের কাছ থেকে আবদার করে আট আনা, বারোআনা বড়জোর দুটাকা যেটা কোন ঘুগনি কিংবা পাউরুটি আলুর দমে খরচা হতো।

আমাদের থেকে যারা একটু একটু বয়সে বড় ছিলো তাদের মধ্যে খুব সন্তর্পনে একটা গোপন প্রেম এই সময়ে তৈরি হত। ওপাড়ার টেঁপীর সঙ্গে এ পাড়ার লালুর, আবার ও পাড়ার ভোলার সঙ্গে এ পাড়ার কালীর। বাবা-মা তো বাদই দিলাম, পাড়ার বড়রা এটা জানতে পারলে সে এক সাংঘাতিক ব্যাপার।

মা, মাসিদের ঠাকুর দেখতে যাওয়ার সময় ছিল না। রান্নাঘর সামলতে তাঁরা ব্যস্ত থাকতেন। বাড়ির কাছাকাছি কোন পুজো হলে অথবা পাড়ার বারোয়ারী তলায় একবার ঠাকুর দর্শণ করে চলে আসতেন। ছোটদের মুখে বিভিন্ন ঠাকুরের বর্ণনা শুনে তাঁরা আনন্দ পেতেন।

সপ্তমী পরের দিন অর্থাত্‍ অষ্টমী পুজোর ছিল অন্য এক আকর্ষণ। সকাল সন্ধ্যে দু – বেলাই  ফুলোকো লুচি খাওয়ার পালা। মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক স্বছলতা কম থাকায় রেশন দোকান থেকে পাওয়া লাল আটা আর দোকান থেকে স্বল্প পরিমানে কেনা সাদা ময়দার সংমিশ্রনে লুচি ভাজা হতো, সহযোগিতায় থাকতো নারকেল কুচি দিয়ে ছোলার ভাল। মনে হতো যেন অমৃত। পরিবরগুলো যৌথ, সুতরাং খাবার পাতের সংখ্যাও ছিল অনেক। কিন্তু সব ভাইবোন বসে একসঙ্গে খাওয়াতে ছিল অনাবিল আনন্দ।

যে জামা প্যান্ট পড়ে সপ্তমী পুজোর রাত কাটতো, সেটাই পাট করে বিছানার তলায় রেখে দেওয়া হত ভাজ করে অষ্টমী পুজোর রাতের জন্য। আর অষ্টমী পুজোর রাত শেষ হলেই মা, পিসিরা নারকেল নিয়ে বসে যেতেন বিজয়া দশমীর জন্য সঙ্গে ময়দার ছোট ছোট নিমকি।

নবমীতে অনেকেই যাদের আর্থিক অবস্থা একটু স্বচ্ছল ছিল তাঁরা যেতেন মাংসের দোকানে। ওই দিন মাংসের দোকানে একটু বেশি ভিড় দেখা যেত। অবশ্যই ছাগলের মাংস, কারণ তখন হিন্দু পরিবার গুলিতে মুরগীর মাংসের চল ছিল না। যৌথ পরিবারে সবার পাতে পড়ত দু-টুকরো মাংস,  কিন্তু সেই খাওয়ায় ছিল একটা অন্যরকম আনন্দ।

নবমীর রাত থেকেই সবাই মনমরা। রাত পোয়ালেই বিসর্জনের বাজনা বেজে উঠবে “ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ ঠাকুর যাবে বিসর্জন”। তালে তালে একটু সিদ্ধি ঘেয়ে উদ্দাম নাচ যদিও সেটা ছিল সহনীয়।

দশমীর রাতে বাবা অথবা কোন বয়জেষ্ঠ্য বাড়ির দালানে একটা চেয়ারে ধোপদুরস্ত পোশাক পরে বসে থাকতেন। বাড়ির মাহিলারা অথবা পুরুষেরা একে অপরের ঘরে যেতেন। কোলাকুলি ও প্রণামের মধ্যে দিয়ে শুরু হত বিজয় দশমী।  হাতে বা ডিসে থাকতো নারকেল নাড়ু ও মিষ্টি। শেষ হতো বাঙালীর শ্রেষ্ট উত্‍সব।

দিন বদল হল। সেই দিনগুলো চলে গেল স্মৃতির পাতায়। বোঝা গেল না কখন আমরা সেই দিনগুলো অতিক্রম করে চলে এসেছি।

বনেদী বা জমিদার বাড়ির পুজো আস্তে আস্তে কমতে শুরু করল। যৌথ পরিবার গুলোতে ভাঙন শুরু হল। জমিদার বাড়ি বা বনেদী বাড়ি আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়ল। সুতরাং দুর্গাপুজোর বিশাল ব্যয় তাদেরকে পিছু হটালো। আবার অনেক যৌথ পরিবারগুলোর মধ্যে শরিকী বিবাদ শুরু হওয়ার ফল অনেক ক্ষেত্রে বাড়ি ঘর সম্পত্তি বিক্রি হয়ে গেল।

ঢুকে পড়ল প্রমোটার রাজ। বিশাল বিশাল ফ্ল্যাট তৈরি হল। ফ্ল্যাটের বাসিব্দারা আবাসিক বারোয়ারী দুগা পুজো শুরু করলেন। আবাসিক বরোয়ারী পুজো এবং পাড়ার সর্বজনীন বারোয়ারী পুজোই বেশি হতে থাকলো। শুরু হলো পাড়ায় পাড়ায় বরোয়ারী চাঁদা আদায়কারী আর চাঁদা দাতাদের মধ্যে চাঁদা নিয়ে সংঘাত।

বিশাল বিশাল মন্ডপ আর আলোর রোশনাই নিয়ে শুরু হল বারোয়ারী গুলোর মধে প্রতিযোগিতা, বিশাল বিশাল প্রতিমা, দুর্গার রঙের, অসুরের রঙের পরিবর্তন। মন্ডপে তারস্বরে গানের আওয়াজ। ঢাকি থাকে কিন্তু বুকে একটা যন্ত্রনা নিয়ে। মন্ডপে জায়গা করে নিল চটুল হিন্দী গান। মহালয়ার দিনে এখন বেশির ভাগ বাড়িতে ভোরবেলায় বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র’র গুরু গম্ভীর গলায় “যা দেবী সর্বভূতেষু” শোনা যায় না, শোনা যায় না রেডিওতে অনুরোধের আসরের সেই গান। মারা গেছে HIS MASTER VOICE” সঙ্গে এর সেই কুকুরটিও।

দেখা যায় না সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত ভাইবোনেদের হৈ হুল্লোড়, জামা কাপড় পরে হাতে টিনের বন্দুক নিয়ে আর পকেটে লাল টিপ ক্যাপ নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় মন্ডপে মন্ডপে ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য আজ অস্তমিত।

যেহেতু যৌথ পরিবার টুকরো টুকরো, তাই বেশির ভাগ বড়িতে দু-একটি ছেলে মেয়ে। তাদের জামা কাপড় থেকে আরম্ভ করে সব ব্যাপারেই প্রাচুর্য।  এখন বেশির ভাগ পরিবারেই একটি ছেলের সাথে একটি মেয়ে। হাতে দামি মোবাইল এক মন্ডপ থেকে আরেক মন্ডপ তাদের গন্তব্যস্থল। তাদের মধ্যে গুরুগম্ভীর ভাব, নেই কোন উচ্ছ্বলতা।

পরিবারগুলির মধে জায়গা করে নিয়েছে আধুনিকতা। পুজো এলেই স্বভূমি ছেড়ে বাইরে বেড়াতে যাবার প্রবনতা। পুজোয় অধিকাংশ বাড়িতেই রান্না বন্ধ। হোটেল অথবা রেষ্টুরেন্টে পুজোর কদিন খাওয়ার পরিকল্পনা। ছোটদের বাবা মায়ের সঙ্গে আর বড়দের বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে গাড়ি করে ঠাকুর দেখতে যাওয়া।

অষ্টমিতে ডালদা ঘিয়ের লুচির গন্ধ বা বিজয় দশমীর জন্য মা, পিসিদের নারকেল নাড়ু তৈরি করার তোড়জোর প্রায় নেই বললেই চলে।

দশমীর রতে মন্ডপে মন্ডপে সিদ্ধি খাওয়ার ধুম, ঢাকের সাথে সাথে আবাল বৃদ্ধবনিতার উদ্দাম নাচ আর নেই। সেই সংস্কৃতি এখন স্থান  করে নিয়েছে মদিরালয়ে। ঠাকুর বিসর্জনের সময় দোতলা সমান উঁচু কালো বক্সে অশ্লীল হিন্দী গানের সঙ্গে উন্মত্তের মত নাচ এখন দশমীর রাত দখল করে নিয়েছে।

ঠাকুরের বিসর্জনের শোভাযানায় সবার পিছনে ঢাকী বুকে একরাশ যন্ত্রনা নিয়ে শোভাযাত্রার পিছনে দিকে স্থান পেয়েছে আজ। বিজয় দশমীর রাতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রণাম অথবা কোলাকুলি একটা বাতিল  সংস্কৃতি বলে এখন বিবেচিত হয়।

আধুনিক সংস্কৃতিতে বিজয়ার পরদিন মোবাইলে বিজয়া দশমীর কুশল বিনিশয় করা। দশমীর পর দিন বাজার যাওয়ার পথে কারও সঙ্গে দেখা হলে দাঁত বের করে সীমাবদ্ধ হাসি বর্তমান আধুনিক সংস্কৃতিতে স্থান করে নিয়েছে।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading