আজ মহান বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জন্মদিন উপলক্ষে তাঁকে নিয়ে লিখলেন অভিজিত দত্ত

১৮৬১ সালের ২রা আগষ্ট অবিভক্ত বাংলার খুলনা জেলায় বরণীয় বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জন্মগ্রহণ করেন। পিতা হরিশচন্দ্র রায়চৌধুরী এলাকায় পরিচিত ছিলেন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি হিসেবে । ছেলেমেয়েদের শিক্ষার জন্য তিনি দুটি স্কুল তৈরী করেন। পিতার তৈরী এমন এক স্কুলেই প্রফুল্লচন্দ্রের শিক্ষা শুরু। শৈশবে প্রফুল্লচন্দ্র বারবার নানা অসুখে ভুগতেন। ৯ বছর বয়সে কোলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি হতে এসে অসুস্থতার কারণে ভর্তি হতে পারে পারেন নি। কিন্ত অসুস্থতা তার লেখাপড়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হতে পারে নি। বিজ্ঞানের মেধাবী এই ছাত্রটি স্কুল ও কলেজ জীবন শেষ করে পিতার ইচ্ছাকে মর্যাদা দিতে বিদেশে পড়তে যান। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন পাশ করার দুবছরের মধ্যেই পেলেন ডিএসসি ডিগ্রি। এমন কী বিদেশে যে দুজন গিলক্রাইস্ট বৃত্তি পেয়েছিলেন তার একজন ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র রায়।
বিদেশ থেকে দেশে ফিরে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর সহকারী হিসাবে এক বছর কাজ করেন। এরপর শিক্ষকতা পেশায় নিযুক্ত হন। ইতিহাস ও বিজ্ঞানের মধ্যে তিনি অসাধারণ মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। তিনি বলতেন বিজ্ঞানের ইতিহাস না জানলে বিজ্ঞান পড়াই সার্থক হয় না। প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানচর্চার সেই সমৃদ্ধশালী ইতিহাস তিনি বারবার ছাত্রদের সামনে গৌরবের সঙ্গেই তুলে ধরতেন। তাদের সেই গৌরব অনুভব করার জন্য উৎসাহ দিতেন।
রসায়ন শাস্ত্রের এই বিজ্ঞানী প্রাথমিক গবেষণা শুরু করলেন খাদ্যে ভেজালের বিষয়ে এবং তার গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় এশিয়াটিক জার্নালে। তারপরই তিনি তার জগৎবিখ্যাত মারকিউরিক নাইট্রাইট আবিষ্কার করেন। সারাজীবনে তার তিনশোর বেশী গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। বাংলা ও ইংরেজীতে তিনি ৩৪টি বই লেখেন। স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য লিখেছেন প্রাণী বিজ্ঞানের উপর বই। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় কাজ, হিন্দু রসায়ন শাস্ত্রের ইতিহাস। ১৯০২ এ প্রথম খণ্ড এবং ১৯০৮এ দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়।
প্রফুল্লচন্দ্র কেবল মাথার কাজের চেয়ে ও হাতের কাজ কে বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই তিনি ডিগ্রির দিকে ছুটে যাওয়া মানুষজনকে বেশী পছন্দ করতেন না। তিনি ইচ্ছা করলে বিদেশে যেতে পারতেন ও সেখানে গবেষণা করে বিশ্বখ্যাত হতে পারতেন। কিন্ত দেশকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল বিজ্ঞান যেন সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় বিষয় হয়ে উঠে। বারবার তিনি স্বনির্ভরতার কথা বলতেন। তিনি বলতেন একটি জাতি যদি আত্মনির্ভরশীল হতে না পারে, তাহলে প্রতিদিন একটু, একটু করে পিছিয়ে পড়বে। আসলে পরনির্ভরশীলতাই দাসত্ব ও গোলামি বাড়ায়। মাত্র ৮০০টাকা সম্বল করে একটা অন্ধকার ঘরে প্রথম যে গবেষণা শুরু করেছিলেন তারই ফসল হল আজকের বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। তিনি বুঝেছিলেন শিল্প ছাড়া একটি দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। যারাই শিল্প করতে চেয়েছেন তাদের পাশেই দাঁড়িয়েছেন।
অতি সাধারণ ভাবে থাকতে ভালোবাসতেন তিনি। বিজ্ঞান কলেজেই একটা সাধারণ ঘরে থাকতেন। অবসর গ্রহণের সময় যা পেয়েছিলেন সবই বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করে গিয়েছেন। সারাজীবন জ্ঞানের চর্চা করা মানুষটি দেশ ও মানুষকে ভুলে যান নি। তিনি আগামী বিজ্ঞানচর্চার জন্য নিজের সবকিছুকেই উৎসর্গ করেছিলেন। বিপ্লবীদেরও তিনি নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। এইসব নির্লোভ,পরোপকারী, দেশভক্ত মানুষের কথা আজকের দিনের বিজ্ঞান গবেষকরা যতই জানবে দেশের পক্ষে ততই মঙ্গল। এই মহান মানুষটির মহাপ্রয়াণ হয়েছিল ১৬ই জুন ১৯৪৪ সালে।
