কাজী নজরুল ইসলাম – এক অনন্য প্রতিভা

কাব্য, গানে, কথায়, সাংবাদিকতা তাঁর মুক্তি সাধনার অন্যতম হাতিয়ার ছিলো যাঁর, সেই বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিবসকে স্মরণ করে তাঁকে নিয়ে লিখলেন কিশলয় মুখোপাধ্যায়

বলরে জবা বল

কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল।

মায়া তরুর বাঁধন টুটে

মায়ের পায়ে পড়লি লুটে,

মুক্তি পেলি, উঠলি ফুটে আনন্দ-বিহ্বল!

তোর সাধনা আমায় শেখা, জবা, জীবন হোক সফল।

কোটি গন্ধ কুসুম ফোটে বনে মনোলোভা,

কেমনে মা’র চরণ পেলি তুই তামসিক জবা!

তোর মত মা-র পায়ে রাতুল

হব কবে প্রসাদী ফুল

কবে উঠবে রেঙে

কবে তোরই মতো রাঙবে রে মোর মলিন চিত্ত-দল।

শিরোনাম- ” বাউল কবির টহল”। উপ শিরোনাম- ‘আসা যাওয়ার মাঝখানে একলা আছে চেয়ে।’

প্রথমটি শ্যামাসঙ্গীত আর দ্বিতীয় টি বিশ্বকবির পুজোর পর ভারত ভ্রমণের সাদামাটা একটি খবর। তবে এরকম চিত্তাকর্ষক হেডিং ও সাব হেডিং দিয়ে খবরটি ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯২২ সালে ধূমকেতু পত্রিকায় বেড়িয়েছিল। দুটোই লিখেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ছিলেন কবি, গীতিকার সঙ্গীত শিক্ষক  সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যাক্তি আর ছিলেন রসিক মানুষ। আজ থেকে একশ বছর আগের সময়টা বলা যায় কবি নজরুলের সময়। প্রায় ১৯২০ থেকে ১৯২৬-২৭ সাল পর্যন্ত কবি দেখিয়েছিলেন তাঁর প্রতিভা, তাঁর প্রতিবাদের ভাষা, তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা। কবি শুধু শ্যামা সঙ্গীতই নয়, কীর্তন, মুর্শিদা, ভাটিয়ালি, মুসলমান গান সবেতেই রেখেছিলেন প্রতিভার সাক্ষর।

একজন মুসলমান হয়ে শ্যামাসঙ্গীত লেখা সহজ কথা নয়। হিন্দু ও মুসলমান দুই সম্প্রদায় থেকেই নন্দিত আর নিন্দিত হয়েছেন। তাতে অবশ্য নজরুলের কিছু যায় আসেনি। তিনি তাঁর লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন। কাব্য, গানে, কথায়, সাংবাদিকতা তাঁর মুক্তি সাধনার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ালো। আর এর সাথে মিশল তাঁর তীব্র আবেগ। যোগ সাধক বরদাচরণ মজুমদারের কাছে যোগাসন শিখেছিলেন। তিনি লালগোলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিখেছিলেন সতীশ চন্দ্র কাঞ্জিলালের কাছে।

ছোটবলা থেকেই আধ্যাত্বিকতায় মন টেনেছিল দুখুমিঞার। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল বাংলা সঙ্গীতে ও কবিতায় তিনিই প্রথম গজল গানের প্রবর্তক। যেমন ‘ দিতে এলে ফুল, হে প্রিয়,/ কে আজি সমাধিতে মোর।/ এতদিনে কি আমারে/পড়িল মনে মনোচোর’। ওমর খৈয়ামের বেশিরভাগ গজল ইংরাজি থেকে অনুবাদ করা হয়েছ। সেখানে কবি নজরুল মূল ফার্সি থেকে প্রায় ১৯৭ টি খৈয়ামের গজল অনুবাদ করেছেন। যেমন ‘শূন্য আজি গুল বাগিচা’, ‘গোলাব ফুলের কাঁটা আছে’, ‘গুল বাগিচায় বুলবুলি তুই’। গান গুলো এত প্রাণবন্ত যে আমাদের “দীলে” ধাক্কা লাগে।

 

 

কবি নজরুলের শ্যামা সঙ্গীত জনপ্রিয় হবার কারন আবেগ। তিনি লিখেছিলেন ‘ ভক্তি আমার ধূপের মতো/ঊর্দ্ধে উঠে অবিরত/শিবলোকের দেব দেউলে/মা’র শ্রীচরণ পরশিতে’। শ্যামাসঙ্গীতও ছিল তাঁর প্রতিবাদের ভাষা। তাই ধূমকেতু পত্রিকায় শ্যামা মাকে তিনি নিয়ে এলেন উমা রূপে।

আর কতকাল থাকবি বেটী মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল ?

স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি-চাঁড়াল।

দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি,

ভূ-ভারত আজ কসাইখানা,-আসবি কখন সর্বনাশী?

দেব-সেনা আজ টানছে ঘানি তেপান্তরের দীপান্তরে,

রণাঙ্গনে নামবে কে আর তুই না এলে কৃপাণ ধরে?

৭৮ লাইনের কবিতার শেষ বাক্য হল

কৈলাস হতে গিরি-রানীর মা-দুলালী কন্যা অয়ি!

আয় উমা আনন্দময়ী।

ফলস্বরূপ রাজরোষে পড়লেন বিদ্রোহী কবি। অতপর জেল। একবছর কারাবরণ করে মুক্তি পেলেন। প্রথম প্রকাশিত কবিতার নামও ছিল ‘মুক্তি’। ১৯২২ সালের ১২ আগষ্ট ধূমকেতুর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হল। তার আগে সাংবাদিকতা শুরু সেবক পত্রিকায়। সাধারন খবর হেডিং ও সাবহেডিং এ কত প্রাণবন্ত লেখা যায়,  তা ধূমকেতু পড়লে বোঝা যায়। যেমন বেথুন কলেজের ছাত্রী কুমারী পূর্ণপ্রভা দাস ও কুমারী কল্যাণী দাস ঘাটালে বন্যাপ্লাবনে পীড়িত নরনারীর সাহায্যের জন্য ৩৬ টাকা সংগ্রহ করেছেন। সাংবাদিক নজরুল লিখলেন ‘কুমারী করুণা’। তারপর উপ শিরোনামে লিখলেন ‘ এস এস নারী/ আন হেম বারি।’ প্রচলিত ধারা থেকে একদম সরে গিয়ে স্বতন্ত্র ধারায় অনুবাদ করতেন। যেমন মূল খবরটি হল হায়দরাবাদের নিজাম বাহাদুরের চাকরি থেকে স্যার আলি ইমাম ইস্তাফা দিয়েছেন। এরপর চার লাইনের কবিতা – ‘যখন পিরীত ছিল/ বেসেছ ভালো/ আগে শুয়েছি তেঁতুল পাতে/ কুলায়না আর মনো পাতে।’

তিনি সংবাদের সঙ্গে মন্তব্য, টিকা টিপ্পনি আর দু লাইনের কবিতা জুড়ে দিয়ে পাঠক মহলে প্রভাব ফেলেছিলেন। যেমন – টাইমস জানতে পেরেছেন যে ব্যাভিরিয়াতে শিগগির বড় রকমের একটা রাজনৈতিক বিদ্রোহ দেখা দেবে। আমরা পূর্ণানন্দে তান ধরেছি- ‘গেয়েছি গান যখন যত/ আপন মনে খ্যাপার মতো/ সকল সুরে বেজেছে তার আগমনি- /সে যে আসে আসে আসে।’ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের বাংলা কথা পত্রিকায় লিখলেন ‘কারার ঐ লৌহকপাট’। ১৯২১ সালে বারীন্দ্র ঘোষের  বিজলী পত্রিকায় লিখলেন বিখ্যাত বিদ্রোহী কবিতা। তিনি সিনেমাতে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। সিনেমাটির নাম ধ্রুব। ১৯৩৪ সালে রিলিজ হওয়া সিনেমাটিতে কবি নজরুল নারদের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

ধূমকেতু পত্রিকা কী বলতে চায়? তিনি লিখেছিলেন সর্বপ্রথম ধূমকেতু ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। তাঁর লেখা দেশাত্ববোধ গান বা কবিতায় শুধু দেশ মাতৃকার কথা থাকতোনা সঙ্গে সাম্যবাদের রূপটিও দেখা গেছে। যেমন- দীন দরিদ্র রইবেনা কেউ, সমান হবে সর্বজন/ বিশ্ব হবে মহাভারত, নিত্য প্রেমের বৃন্দাবন।/ তাই গান গুলি গণসঙ্গীতে রূপ পেয়েছে।

কবি নজরুল জনপ্রিয় হয়ছিলেন হিন্দু ও মুসলমান বিভেদের সময়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ইংরেজদের শক্তি ভারতে বিস্তারের অন্যতম কারণ হল হিন্দু ও মুসলমান বিভাজন নীতি। তাঁর কলম সর্বদা এই বিভেদ মেটানোর চেষ্টা করেছে। তিনি লিখছেন-

ঘরে ঘরে তার লেগেছে কাজিয়া,

রথ টেনে আন, আনরে তাজিয়া

পূজা দেরে তোরা, দে কোরবান

শত্রুর গোরে গলাগলি কর

আবার হিন্দু মুসলমান

বাজাও শঙ্খ, দাও আজান।

 

তথ্য ঋণ: (ক) সঞ্চিতা- কাজী নজরুল ইসলাম, (খ) কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা- মুজফফর আহমেদ, (গ) সংবাদ বিদ্যা-  সম্পাদনা পার্থ চট্টোপাধ্যায়, (ঘ) কাজী নজরুল ইসলাম – বসুধা চক্রবর্তী
error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading