পারমিতা চক্রবর্তী ভট্টাচার্য্য: ১৯৪৬ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে চিত্রগ্রাহক বাবার থেকে উপহার পাওয়া ক্যামেরা দিয়ে প্রথম সিনেমা বানিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। আজকের দিনেই (১৪ই ডিসেম্বর) ১৯৩৪ সালে ত্রিমুলঘেরীতে জন্ম তাঁর। হায়দ্রাবাদের ওসমানিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন, হায়দ্রাবাদেই তিনি গঠন করেন হায়দ্রাবাদ ফিল্ম সোসাইটি।
এর পর থেকে শুধুই ইতিহাস। প্রচুর তথ্যচিত্র, সিনেমা বানিয়েছেন তিনি, অজস্র পুরস্কার পেয়েছেন, দেশ বিদেশে বহুবার হয়েছেন সম্মানিত। পদ্মশ্রী (১৯৭৬), পদ্মভূষণ (১৯৯১), এমনকি ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকেও তার প্রাপ্তির ঝুলিতে রয়েছে।
সাত সাতবার তিনি পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার তার নির্মিত হিন্দি চলচ্চিত্রের জন্য। সম্প্রতি মুম্বই তে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হয়ে গেল ২০১৮ তেই, সেখানে স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেলেন শান্তারাম লাইফটাইম আ্যচিভমেন্ট পুরস্কার।
একবার ১৯৮৫তে মস্কোতে ১৪তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এবং আর একবার ২০০৯সালে ৩১তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি জুরি নির্বাচিত হন। ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের এই ঊজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হলেন শ্যাম বেনেগাল। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও গুরু দত্ত এর মাতামহী ও শ্যাম বেনেগালের পিতামহী দুই বোন ছিলেন।
আসলে প্রথাগত শিক্ষা সমাপন করেই তিনি এই জগতে চলে আসেন। ১৯৫৯ সালে কেরিয়ার শুরু করেন মুম্বই এর এক বিজ্ঞাপন সংস্হায় কপিরাইটার হিসেবে। ১৯৬২ তে তৈরী হয় তার প্রথম তথ্যচিত্র “ঘর বৈঠী গঙ্গা”, ১৯৭৩ সালে তার প্রথম চলচ্চিত্র তৈরী হয় অঙ্কুর। এই সিনেমায় উঠে আসে তার ভূমি তেলেঙ্গানার অর্থনৈতিক ও যৌন নির্যাতন মূলক প্রেক্ষাপট। জাতীয় পুরস্কারে সংবর্ধিত হয় তার প্রথম চলচ্চিত্র অঙ্কুশ। ১৯৭৬ এর ছবি “মন্থন (The churning)” , গুজরাটের দুগ্ধশিল্পের শ্রমিক বা কৃষকদের গল্প নিয়ে বানানো ছবিটি তিনি বানান মূলতঃ ভার্গেশ কুরিনের সাদা আন্দোলনের(White Movement of India ) দ্বারা অনুপ্রানিত হয়ে। তার বানানো অনেক চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে নিশান্ত, জুনুন, ভূমিকা।
এভাবে বরাবরই যেন মুল ধারার বাইরে চলচ্চিত্র পকিচালক তিনি। ছবিতে বারবার ফুটিয়ে তুলেছেন সাম্প্রতিককালের সামাজিক সমস্যাগুলোকে, আর সেকথা জুড়তে গিয়ে কোনো জমকালো আভরণ চাপাননি তার ছবির গায়ে, সেজন্যই হয়ত মুল ধারার বাইরের পরিচালক তিনি।
তবে এই রেকর্ড যেন একটু হলেও ভেঙেছে ২০০১ সালের “জুবেদা” এর মধ্য দিয়ে। বানিজ্যিক চলচ্চিত্রের তৎকালীন অভিনেত্রী করিশ্মা কাপুর ও সংগীত পরিচালক এ. আর. রহমানকে তিনি “জুবেদা” তে সংযুক্ত করে তার চলচ্চিত্রে এক অন্য নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। বক্স অফিস হিটের কথা ভেবে যারা ছবি বানাননা তিনি তাদেরই পথপ্রদর্শক বলা যায়। বানিজ্যিক হিট না হয়েও তার চলচ্চিত্র, সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে বারবার।
আর বানিজ্যিকভাবে সফল চলচ্চিত্র বানানোর পথে হাঁটেননি বলেই হয়ত আমরা তার থেকে পেয়েছি অসাধারন কিছু বায়োগ্রাফী। তার মধ্যে রয়েছে The Making Of The Mahatma, Netaji Subhas Chandra Bose – The Forgotten Hero (নেতাজীর ওপর করা তার এই বায়োগ্রাফীটি ইংরেজী ভাষায়)।
আবার অনান্য পরিচালকদের মতো শুধু যে পরিচালনাই করেছেন এমন নয়, বরাবরই তিনি চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়াশোনার মধ্যেই থেকেছেন, ফলে ১৯৬৬-৭৩ অবধি তাকে আমরা পাই F.F.T.I., Pune (Film and Television Institute of India) তে শিক্ষক হিসেবে আবার পরবর্তীকালে তিনি সেখানে বারদুয়েক চেয়ারম্যান হিসেবেও থেকেছেন।
চলে আসি ৮০ এর দশকে। আপামর ভারতীয় সেসময় সারাদিন যে যার কাজ করেন আর সন্ধ্যেবেলায় সপরিবারে দূরদর্শনের নেশায় মাতেন, তো হল কি , একদিন জোড় খোঁজ পড়ল…. খোঁজ, খোঁজ, খোঁজ, সোওওওজা চলে এল “ভারত এক খোঁজ”। ১৯৮৮ সে এক কিযে নেশা ধরলো ৮ থেকে ৮০, একদিন ও ধারাবাহিকের Prelude (বাংলা জানিনা, হয়ত শুরুর আবহ সঙ্গীত হতে পারে)টাও ছাড়তো না। জওহরলাল নেহেরুর “ডিসকভারী অফ ইন্ডিয়া” সবাই না পড়লেও শ্যাম বেনেগালের “ভারত এক খোঁজ” প্রায় সবাই দেখতেন। আবার নাসিরুদ্দিন শাহ, ওমপুরী, স্মিতা পাতিল, শাবানা আজমি , কুলভূষণ খারবান্দা, অমরীশ পুরী এদের মধ্যে মিল কোথায় বললে একটাই উত্তর হয়, মিল হল শ্যাম বেনেগাল। আবার অনেকে বলবেন এরা প্রত্যেকেই প্রথাগতভাবে অভিনয় শিখেছেন। দুটোই ঠিক, কারন বরাবরই চলচ্চিত্রজ্ঞ শ্যাম বেনেগাল FTII (Film and Television Institute of India,Pune) এবং NSD(National School of Drama ,Delhi) এর সাথে সংযুক্ত শিল্পীদেরই বেশী করে তার চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেছেন।
নিজের চলচ্চিত্রের ওপর তার তিনটি বইও আছে, আছে নিজস্ব প্রোডাকশন হাউস সহ্যাদ্রি। বানিয়েছেন ৯০০ টিরও বেশী বিজ্ঞাপন এবং ৭০ টিরও বেশী তথ্যচিত্র। সময় গড়িয়েছে, বয়স বেড়েছে, আর আরো অভিজ্ঞ হয়েছেন তিনি, তাই বয়সের পরোয়া না করে এখনও তিনি কাজে আছেন। অতি সম্প্রতি তার একটি বড়ো কাজও সমাপ্ত হলো। বাংলাদেশ সরকারের অনুমতিক্রমে শেখ মুজিবর রহমানের ওপর তিনি কাজ শুরু করেছিলেন। ফলাফল স্বরূপ এই বছরে মুক্তি পেল তার বানানো ছবি “Mujib : The making of a nation ” (“মুজিব : একটি দেশের উত্থান “)।
পরিশেষে একটা অভূতপূর্ব ঘটনা দিয়ে শেষ করবো। কেউ কখনো শুনেছেন যে একসাথে পাঁচ লক্ষাধিক লোক একসাথে একটি সিনেমা প্রযোজনা করছেন আর তাদের প্রত্যেকেই অত্যন্ত দরিদ্র। ঠিক এমনটিই হয়েছিল ভারতীয় চলচিত্রের ইতিহাসে আর এই অভূতপূর্ব ঘটনাটি ঘটে যে পরিচালকের চলচিত্রের জন্য তিনিই শ্যাম বেনেগাল। ভারতের গুজরাটে শ্বেত বিপ্লব বা white revolution এর কথা আমরা সবাই জানি। ১৯৭৬ এ এই দুগ্ধ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে হওয়া বিপ্লব এর চলচ্চিত্রয়িত রূপ হলো, তার সিনেমা ” মন্থন ” (Mathan-the chanting)। এর জন্য গুজরাটের প্রায় ৫,০০,০০০ কৃষক বা শ্রমিক প্রত্যেকে ২ টাকা করে দিয়ে সিনেমাটি প্রযোজনায় এগিয়ে আসেন। এমনকি সিনেমা মুক্তির পরও তারা দল বেঁধে গ্রাম থেকে শহরে এসেছিলেন কেন বলুন তো ? তাদের দ্বারা প্রযোজিত শ্যাম বেনেগালের সিনেমাকে তথাকথিত ভাবে বক্স অফিস হিট করাতে। শ্যাম বেনেগাল দেখিয়ে দিলেন যে সাধারন মানুষেরও যৌথ শক্তি কতো বৃহদাকার নিতে পারে। এজন্যই সমসাময়িক আর সবার চেয়ে শ্যাম বেনেগাল এক আলাদা প্রকোষ্ঠ রাখা থাকে চলচিত্র প্রেমীদের মনে।







