অক্ষয় তৃতীয়া, এই পুণ্য তিথি কেন বিখ্যাত সেই নিয়ে লিখলেন সুফল তর্কালঙ্কার

বাঙালির কাছে বৈশাখের দুটি দিন বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ দিন, একটি পয়লা বৈশাখ অপরটি অক্ষয় তৃতীয়া। এই দুটি দিনেই বাঙালি মেতে ওঠে উত্সবে। পয়লা বৈশাখ দিনটিকে শুভ দিন হিসেবে ধার্য করে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে লক্ষ্মী-গণেশের পুজো করা হয়, অনুষ্ঠিত হয় হালখাতা। এই বিষয়টি আমাদের সকলেরই জানা। কিন্তু বৈশাখেরই অপর একটি দিন যেদিনটিও সমানভাবে সারা দেশে পালন করা হয় অন্যতম বিশেষ দিন হিসেবে। এই দিনেও এই বঙ্গের ব্যবসায়ীরা তাঁদের প্রতিষ্ঠানে লক্ষ্মী-গণেশের পুজো করে নতুন খাতা প্রতিষ্ঠা করেন।
বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিকেই অক্ষয় তৃতীয়া বলা হয়। অক্ষয় তৃতীয়া হিন্দু ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি বিশেষ দিন। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে এই পুণ্য তিথিতেই বেদব্যাস ও গণেশ মহাভারত রচনার কাজ শুরু করেছিলেন। আবার কথিত আছে এই দিনেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন ঋষি জমদগ্নি ও মাতা রেণুকার পুত্র বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম, এই কারণে দেশের অনেক প্রান্তে অক্ষয় তৃতীয়াকে পরশুরাম জয়ন্তী হিসেবেও মানা হয়ে থাকে। এই পুণ্য দিনেই গঙ্গাকে মর্ত্যে নিয়ে এসেছিলেন ভগীরথ বলে লোকশ্রুতি রয়েছে। এই দিনেই সত্য যুগের অবসান হয়ে ত্রেতাযুগের শুভ সূচনা হয়েছিল। মহাভারত অনুসারে এই দিনেই ভরা রাজসভায় দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করতে গেলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রক্ষা করেন তাঁকে। অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্য লগ্নেই ভারতের অন্যতম তীর্থক্ষেত্র কেদার-বদ্রী, গঙ্গোত্রী-যমুনেত্রী মন্দিরের দ্বার ছয়মাস পর উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় জনগণের দর্শনের জন্য। এই অক্ষয় তৃতীয়ার দিনেই মহাদেবের থেকে বর লাভ করে কুবেরের বিশাল ধন সম্পত্তি লাভ হয়েছিল বলে পৌরাণিক মত রয়েছে, তাই এই দিনেই পূজিত হন বৈভব-লক্ষ্মী। কৃষ্ণসখা সুদামা এই দিনেই দ্বারকায় শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করলে শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে বিপুল সম্পদের বর দান করেন এবং সুদামার সকল কষ্ট লাঘব করেন। এরকম নানা ঘটনার সাক্ষী অক্ষয় তৃতীয়া তিথি। সনাতন প্রথানুসারে ভারত, নেপাল সহ বিশ্বের নানা দেশের হিন্দু ও জৈনরা যে কোনও নতুন কাজের শুভ সূচনার জন্য এই দিনটি শুভ বলে মনে করেন। এছাড়াও এই দিনেই সোনা, রূপা কেনা অত্যন্ত শুভ বলে ধরা হয়। এই রাজ্যের হুগলি জেলার মহেশের জগন্নাথ মন্দিরে অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্যক্ষণে জগন্নাথদেবের চন্দনযাত্রা উত্সব পালনের মধ্য দিয়ে সূচনা হয় জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার।

অক্ষয় তৃতীয়া শুধুমাত্রই যে হালখাতা উত্সব তা কিন্তু নয়। পুণ্য এই তিথিতে হিন্দুরা বিশ্বাস করেন তাঁদের প্রিয়জন যাঁরা পরলোকে তাঁদের স্মরণ করার এক বিশেষ দিন এই অক্ষয় তৃতীয়া। ভারতের নানা প্রদেশে রীতিমত উত্সব হিসেবেই পালন করা হয় অক্ষয় তৃতীয়া দিনটি। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও আমদের পার্শবর্তী রাজ্য ওডিশাতেও এই দিনটি সমান মর্যাদা সহকারে পালিত হয়ে থাকে। এই দিন থেকেই পুরীতে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার রথ যাত্রার রথ বানানোর কাজের শুভারম্ভ হয়। ওডিশাতে অক্ষয় তৃতীয়া থেকেই খরিফ মরশুমে ভালো ফসল যাতে হয় তার জন্য পৃথিবী মায়ের পূজা করা হয়ও ধানের বীজ বপন করা হয়। এই অনুষ্ঠানকে ওডিশাতে বলা হয় আখি মুঠি অনুকুল।
অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানায় অক্ষয় তৃতীয়ার দিনটিকে সমৃদ্ধি দিবস হিসেবে পালন করে সোনার গয়না কেনেন। এছাড়াও সিংহচলম মন্দিরের দেবতা যিনি সারা বছর চন্দনের প্রলেপে ঢাকা থাকেন তাঁকে এই দিনেই চন্দনের স্তর সরিয়ে জনগণের জন্য প্রকৃত রূপের প্রদর্শন করা হয়।
ভারতের উত্তরাংশের রাজ্য উত্তরপ্রদেশেও যথাযোগ্য মোজারদার সঙ্গে পালন করা হয় অক্ষয় তৃতীয়ার নানা অনুষ্ঠান। এই দিনেই বৃন্দাবোনের সুবিখ্যাত বাঁকে বিহারী মন্দিরের ভগবানের পা দেখতে পাওয়া যায়, প্রচলিত রীতি অনুসারে এই দিনটিই হচ্ছে এই ধরার সৃষ্টির প্রথম দিন, তাই এদিন ভক্তকুল নিজেদের পাপস্খলনের জন্য গঙ্গায় ডুব দেন।
অক্ষয় তৃতীয়ায় মহারাষ্ট্রের নারীরা সৌভাগ্যের প্রতীক হলুদ ও সিঁদুরবিনিময় করে তাঁদের স্বামীদের দীর্ঘজীবন প্রার্থনা করে এবং এই দিনেই আবাহন করা হয় গৌরী মাতাকে।
অপরদিকে চৈত্র মাসের তৃতীয়া থেকে বৈশাখের তৃতীয়া এই এক মাস ব্যপী চলে উত্সব। এই সময়টিকে দেবী শক্তির বিশ্রামের সময় বলে গণ্য করে একটি দোলনার ওপর জলভর্তি কলস যাঁর মধ্যে আবাহন করা হয় শক্তি রুপী দেবীকে। একমাস ধরে চলা এই পুজোর সমাপ্তি ঘটে অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্য লগ্নে। আসলে এই প্রথার মাধ্যমে জল আমাদের জীবনে কত গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝানো হয়ে থাকে।

হিন্দুদের সঙ্গে সঙ্গে জৈনরাও সমান গুরুত্ব সহকারে পালন করে থাকে অক্ষয় তৃতীয়া। জৈন রীতিনুসারে এই দিনটি ভগবান আদিনাথের সঙ্গে মেলামেশার জন্য আদর্শ দিন হিসেবে গণ্য হয়। অক্ষয় তৃতীয়ায় জৈন সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ আখের রস পান করে সারা বছর বিকল্প দিন উপবাস পালন করার ব্রত নেন যেটি সমধিক পরিচিত বছরি-টোপ নামে। এদিন রাজস্থানবাসীরা পালন করেন আখা তিজ উৎসব। হিন্দু এবং জৈন উভয়ের কাছেই এই দিনটি শুভ দিন হিসাবে বিবেচনা করা হয় এবং এই দিনে ভালো কাজ ও নতুন কাজের শুভারম্ভও করা হয়।
পুণ্য এই দিনে ভরে উঠুক আনন্দ, মানুষের প্রত্যাশা সাফল্যলাভ করে মানব জীবনকে চিরস্থায়ী সুখ দান করুক এটাই মূলমন্ত্র অক্ষয় তৃতীয়া তিথির একথা বলাই যায়।
