গল্পমালা (বিদেহী)

গল্পমালায় ছোট গল্প নিয়ে হাজির হলেন কবি, গল্পকার, বাচিক শিল্পী ও অভিনেতা অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

সমরবাবুর শরীরটা কদিন ধরেই খারাপ যাচ্ছে। পিতৃপুরুষের তিনতলা ঢাউস বাড়িটা যেন গিলতে আসে। নিচের তলায় দু জন ভাড়াটে থাকেন। দোতলায় দক্ষিণের বড় ঘরটায় সমর বাবু একা। বিলকুল একা। গত বছর হঠাৎ করেই সুজাতা দেবী মানে সমরবাবুর স্ত্রী এক দিনের নোটিশে চলে গেলেন পরপারে। সেই থেকে সমর বাবু আরো কাহিল হয়ে পড়েছেন। তিন বছর আগে করোনা ছোবল মেরেছিল। কোনক্রমে বেঁচে ফিরেছেন। কিন্তু এখন যেন আর ভালোলাগেনা তাঁর।

সমরবাবুর এক পুত্র, এক কন্যা। পুত্র জাপানে সেটেল্ড। মেয়ের সংসার পুনায়। এখন আর কোনো দায়-দায়িত্ব নেই সমরবাবুর। একমাত্র মালতি দু বেলা এসে ঘর ঝেড়ে পুঁছে দেয় আর রান্নাটা করে যায়। এখন আর বিশেষ বাইরে বের হননা সমরবাবু। বাড়িতেই থাকেন। মাঝে মধ্যে পাড়ার বিজনবাবু আর নরেনবাবু বাড়িতে আসেন। গল্প গুজব করেন। মালতির হাতে চা খান। চলে যান।

সমরবাবু তাঁর দুঃখের কথা জানান বন্ধুদের। নিঃসঙ্গ জীবন আর ভালো লাগে না। রাত হলে একরাশ চিন্তার বোঝা ঘাড়ে চেপে বসে। ঘুম আসে না। স্ত্রী সুজাতার দেওয়ালে টাঙানো বাঁধানো ছবির দিকে তাকিয়ে থাকেন। ছেলে মেয়েরা তাদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বছরে এক বার আসে তারা। এই তো গত বছর মায়ের কাজ করতে এসেছিল।

সেদিন সন্ধ্যে বেলা বাড়ির পাশে গঙ্গার ঘাটে এসে বসেন সমরবাবু। সূর্য অস্তমত। লালচে আভা ছড়িয়ে আছে পশ্চিমের আকাশে। গঙ্গায় জোয়ার চলছে। পাড়ে এসে  ধাক্কা খেয়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ হচ্ছে। সমরবাবু উদাস নয়নে চেয়ে থাকেন সেই দিকে। একবার ভাবেন এ শরীর রেখে কী লাভ। ঝাঁপিয়ে পড়লেই তো হয় গঙ্গায়। নিশ্চিন্ত। কিন্তু কানে বাজতে থাকে আত্মহত্যা মহাপাপ।

সে রাতে চোখে ঘুম নেই সমরবাবুর। ভোরের দিকে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। ঘুম ভাঙতেই দেখলেন তিনি গঙ্গার ধারে শ্মশানে বসে আছেন। কাঠের চিতায় একটা দেহ পুড়ছে। সমরবাবু দেখছেন। দাউ দাউ জ্বলছে চিতা। দেহ পুড়ছে। পুড়ছে যাবতীয় অহংকার, সুখ দুঃখের দলিল। প্রেম, মান অভিমান ঘেরা অস্থির জীবন।

সমরবাবু আরো উদাসীন হয়ে বসে রইলেন। একসময় একে একে সব নিভে যাওয়া চিতায় জল ঢেলে চলে যাচ্ছে। চিতা থেকে একটা হালকা নীলাভ পাতলা ধোঁয়া আকাশমুখী। হঠাৎ সমরবাবু তাঁর কাঁধে কার যেন হাতের স্পর্শ পেলেন। তাকালেন। রাতের আলো আঁধারির অস্পষ্টতায় এক দিব্য পুরুষকে দেখতে পেলেন। সমরবাবু বিস্ময়ে অভিভূত। কেমন যেন একটা নিবিড় প্রশান্তি অনুভবে টের পেলেন। সৌম্য কান্তি পুরুষ একসময় বলে উঠলেন-চলুন এখানে আপনার কাজ শেষ।

এই সমাজ, এই সংসার, আত্মীয় পরিজন, পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধব সব ছেড়ে সমরবাবু হওয়ায় ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চললেন। নীচে পড়ে রইলো শ্মশান ভূমি, গঙ্গার অবিরাম বয়ে চলা, কুলু কুলু ধ্বনি আর একমুঠো ছাই।

 

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading