পারমিতা চক্রবর্তী ভট্টাচার্য্য: একটি উল্লেখযোগ্য গাণিতিক ধ্রুবক (যার মান/ভ্যালু সবসময় একই থাকে) হল “পাই”/pi। এই π চিহ্নের দ্বারা পাই ধ্রুবকটি গণিতে প্রকাশিত থাকে। গণিতের সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই “পাই” এর মান জানা বাঞ্চনীয়। “পাই” কোনো পূর্ণ সংখ্যা নয় বরং একটি দশমিক সংখ্যা। খুব সুক্ষতার সাথে বিচার করলে “পাই” এর মান হল ৩. ১৪১৫৯২৬ ৫৩৫৮৯৭৯৩২৩৮৪৬২৬৪৩৩৮৩২৭৯৫০ ২৮৮৪১৯৭১৬৯৩৯৯৩৭৫১…এটা এভাবেই চলতে থাকবে, তাই তো “পাই” আমাদের কাছে এক অদ্ভুত approximation। আর যেহেতু অপূর্ন সংখ্যার ক্ষেত্রে সাধারণ প্রয়োগের জন্য আমরা শুধু দুই দশমিক সংখ্যা মাত্র বিবেচনা করি একটা কাছাকাছি মানে আসার জন্য, তাই যারাই অংক করেছেন তারা জানেন যে “পাই” এর মান হলো ৩.১৪, যা ৩ ও ৪ এর মাঝামাঝি একটি সংখ্যা।
আর তাই দেখতে পাওয়া যায় যে এই “পাই” এর অর্থ বোঝাতে ৩, ১ ও ৪ সংখ্যাটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আর ঠিক এই কারণে আজকের দিনটি অর্থাৎ ১৪ মার্চ (মাস/দিন ফরম্যাটে ১৪/০৩) প্রতি বছর পালিত হয় “পাই” দিবস হিসেবে। “পাই” এর নিখুঁত মানের দিকে তাকিয়ে যদি চার দশমিক স্থান অবধি ভাবা যায় তবে সেই বিচারে ২০১৫ সালের আজকের দিনটি ছিলো “সুপার পাই দিবস”, কারণ মাস/দিন/বছর ফরম্যাটে সেদিনটি ছিল ৩/১৪/১৫। আপাতত ২০১৫ নিয়ে আর মাথা ব্যাথা নেই, কারণ বছরটি বিগত। আবার আমরা “পাই”কে ৩.১৪ ধরে ১৪ মার্চ “পাই” দিবস উদযাপনের কথা বলবো, কিন্তু মজার ব্যাপার হল আজ সারাদিনের একটি বিশেষ মুহূর্তে উদযাপিত হতে হবে এটি, এমনই ভাবনা ভেবে বসে আছে বিশ্বের গণিতজ্ঞ সমাজ, তারা অংক কষে আরো নিখুঁত হিসেবে বলছেন “পাই”এর মান তো ৩.১৪১৫৯২৬ তাই এবার আরো বৃহত্তর অর্থে স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে ১৪ মার্চ (৩.১৪ এর জন্য) আর তারপর ১৫৯২৬কেও ধরা হল বেশ করে, তাই এদিকের সময়টা হলো ১৫ ঘন্টা ৯ মিনিট ২৬ সেকেন্ড।
এতো গেলো “পাই” এর উদযাপনের কথা, আর “পাই” নিয়ে সারা বিশ্বের মানুষের উন্মাদনার কথা। কিন্তু গণিতের জগতে কে এই “পাই” আর কেন তার এতো গুরুত্ব, এমন প্রশ্ন মনে জাগা স্বাভাবিক। আমি আপনি হয়ত বুঝব না এ আবার কোন কাজের উৎসব পালন আর এতে কি হবে। কিন্তু যে কোনো উদযাপনই হল মানুষের সৃষ্টি, সেই উদযাপিত জিনিসটির গুরুত্ব অনুযায়ীও পালন করা হয় দিনটিকে। তাই আমরা আমজনতা এই দিন নিয়ে এতো মাথা না ঘামালেও এটা খবর যে গনিতের জগতে এটি গুরুত্বপূর্ন। বরং আসুন খুব সংক্ষেপে জেনে নিই কেনো এর এতো তাৎপর্য।
খুব নিখুত ভাবে জানা না গেলেও মোটামুটি ভাবে বলা যায় যে খ্রিস্ট পূর্ব ১৮০০ সালের মত সময়ে, যখন ব্যবিলনীয় সভ্যতা পৃথিবীর বুকে তার প্রকাশ ঘটিয়েছে, তখনই বলা যায় এই পাই এর জন্ম। আজ্ঞে হ্যা, “পাই” প্রায় ৪০০০ বয়সী একটি প্রয়েজনীয় ধ্রুবক সংখ্যা, উন্নত ব্যবিলনীয়দের হাত ধরে যার গণিতের জগতে প্রবেশ। আমরা জানি বিজ্ঞান না গণিতে যখন যখনই কোনো হিসেবগত সমস্যার উদ্ভব হয়েছে তখন তখনই অনেক গবেষনার ফল হিসেবে বেশ কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার হয়েছে। ঠিক এমনি সমস্যা হয়ত এসেছিল কোনো গোলাকার ক্ষেত্রের পরিমাপগুলির হিসেব করার ক্ষেত্রে, বা পুরোনো দিনে মানুষ তো গ্রহ নক্ষত্রের চর্চাও করতো, সেক্ষেত্রেও তাদের গোলাকার গঠনের জন্য এমন সমস্যা আসতেই পারে।
“পাই” এর সংজ্ঞা থেকে সেটাই মনে করা যেতে পারে। সংজ্ঞা অনুসারে, বৃত্তাকার ক্ষেত্রের পরিধিকে তার ব্যাস দিয়ে ভাগ করলে যা পাওয়া যায় তাই হল “পাই”। কথাটি সত্য যে কোনো ক্ষুদ্র থেকে বিশালাকার গ্রহের মাপের বৃত্তের জন্য। আর এই ভাগফলটি হল সবসময় একই মানের , ভগ্নাংশে প্রকাশ করলে এটি ২২/৭ একেবারে নিখুঁতভাবে, এটাকেই দশমিকে আনলে কিছুটা আন্দাজ আসে সুক্ষতায়, ৩ এর একটু বড়ো সংখ্যা দিয়ে এভাবেই প্রকাশিত “পাই” (২২/৭, ৩.১৪)।
আর ঠিক এজন্যই বলা যায় কৌনিক পরিমাপের ক্ষেত্রে “পাই” ভীষণই গুরুত্বের দাবী রাখে। আর আমাদের এই ব্রহ্মান্ডকে পরিমাপের বিচারে জানতে “পাই” একটি অতি আবশ্যিক ধ্রুবক।
পরবর্তীকালে যুগে যুগে আরো গবেষণা হয়েছে বিভিন্ন গণিতজ্ঞ দ্বারা, প্রখ্যাত গবেষক অর্কিমিডিস নিজেও “পাই” নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন, নির্ধারিত হয়েছে “পাই”এর কাছাকাছি মান (কারণ যেহেতু “পাই” একটি ইররেশনাল নাম্বার তাই এর নিখুঁত মান পাওয়া যাবেনা), সির্দ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কৌনিক পরিমাপের ক্ষেত্রে “পাই” এর একক হবে “রেডিয়ান” দিয়ে প্রকাশিত। আজকে এই “পাই” দিবসে এটাই আমরা আশা রাখি যে, আগামী দিনের অনেক নতুন নতুন আবিষ্কার ও গবেষণার ক্ষেত্রে জটিল অংকের সমাধান হোক “পাই” এর হাত ধরে, তার ৪০০০ বছরের অভিজ্ঞতার হাত ধরে। “পাই” আজও সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক আর আধুনিক গণিত বিজ্ঞানে অপরিহার্য্য, তাই হয়ত আজ “পাই” দিবস পালন কোনো অবাক করা বিষয় নয়। “পাই” থেকে পাওয়া চলুক নিরন্তর।



