আমাদের জীবন ও সাহিত্য

সাহিত্যের জন্য জীবন নাকি জীবনের জন্য সাহিত্য, আমাদের জীবনে সাহিত্য ও সংস্কৃতির অপরূপ মেলবন্ধনের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন জার্মানী থেকে কবি ও লেখক শঙ্খ সেন

ঈশ্বর দর্শনের সদিচ্ছে যথাযথ, সকল মানবের অন্তরের কামনা থাকলেও, কোনো আশ্চর্যজনক ঘটনা বলে কাম্য না করাই প্রকৃত পক্ষে যথাযত। আমি তার ব্যাতিক্রম হই বা কি ভাবে, চাহিদার স্বার্থকতায় লুকিয়ে থাকে না পাওয়ার আনন্দের ইতিবাচকতা।

অনুভূতি আমাদের চক্ষু উন্মোচন করায়। ঈশ্বরের সান্নিধ্য না পেলেও অন্তরের ভাবনা গুলোয় প্রকাশ পায় লুকিয়ে থাকা ইচ্ছে গুলো। ভালো থাকা আসলে মানুষের চিন্তাধারার মধ্যে জীবিত থাকে। কেউ যদি সব পরিস্থিতির উত্তম দিকগুলো বিচার করে তার জীবন আনন্দময় হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী বইতো কম হয় না।

জীবনের সকল লক্ষপুরনের পর একাকীত্ব আর ব্যস্ততার লড়াইের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়াই  জীবনান্তের মুল স্বার্থকতা হয়ে দাঁড়ায়।

জীবন না থাকলে প্রশংসার প্রত্যাশা না করাই পরম সুখ বল্লে কিছু ভুল হবে না।

নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি নিজস্ব বলেই সার্বজনিক গ্রহণ যোগ্যতার দোরগড়ায় গিয়ে আনাগোনা করে।

ফলে জীবন থাকা বা না থাকাকালীন জীবন থেকে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা না করে যদি জীবনের অনুভূতিগুলোয় হারিয়ে যাওয়া যায় এবং তার সঙ্গে যদি কলম সঙ্গ দেয় তার থেকে বড় কিছু পাওনা জীবন দিতে পারে বলে আমার মনে হয় না।

সেদিক থেকে দেখতে গেলে সাহিত্য হচ্ছে মানুষের হুঁশ। শুধু হৃদয় চললে একটা প্রাণ বেঁচে থাকে, মন কাজ করলে সেই প্রাণ মানুষে পরিণত হয়।

ঈশ্বর আমাদের সম্পর্ক দেন, ভালবাসা দেন, কিন্তু কেন আমাদের সব কিছু থেকে সরিয়ে নেন তার উত্তরে হয়তো মুনি ঋষিরা বলবেন, মায়া মুক্ত হতে গেলে জীবন ধারনের মধ্যে দুঃখ কষ্টের হিসেব আমাদের কর্মফলের পরিণতি, এ ছাড়া আরো অন্য কিছু ভাবার উপায় আমাদের নেই।

আমাদের বোধগম্য ছাড়া আমাদের কর্মের হিসেব কে মেলাবে?

আমাদের জীবন থেকে শেখা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। আধুনিক যুগে কোনটা ঠিক কোনটা ভুল বোঝাই হচ্ছে কঠিন ব্যাপার। এর হিসেব মিলবেই, আমার দৃঢ় বিশ্বাস।  জ্ঞান-অজ্ঞানের নীতিশাস্ত্রের পরিণতির সঠিক বিচার হবেই।

ঈশ্বর আমাদের সম্পর্ক দেন, ভালোবাসা দেন, আবার এটাও শেখান যে সব ছেড়ে আমাদের চলে যেতে হবে। মায়ার জালে না জড়ালে সংসার বৃদ্ধি হবে কি করে। পরবর্তী প্রজন্মের প্রদীপে আলো জ্বালিয়ে নিজের আলো নেভাতে এত কষ্ট হয় তবে কেন?

নিজ প্রমাণ ছাড়া এক অজানা ধোঁয়ার মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার ভয়? জীবনে সব থেকেও সব হারিয়ে যাওয়ার ভয়? জীবন গ্রহণ করে সব আনন্দ থেকে নির্লিপ্ত থাকার অভ্যাসটাই কি জীবনের পরম লক্ষ্য?

জীবন দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গীর কাঠামো ভিন্ন প্রকারের তাই তার যথাযত লেখনী আমাদের সবার কাছে জ্ঞান অর্জনের ভাণ্ডার।

নিজ ভাবনা চিন্তা আর লেখকের চিন্তাধারার সংযোগ ঘটে আমাদের মনে। মনোরঞ্জন যথাযত পাঠকদের পুস্তক ভুবনের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

ইদানিং যুগে বিশ্ব যুদ্ধের ভীতি, ভূমিকম্প দুর্যোগ, স্বাস্থ্যের দুশ্চিন্তা সারা পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে আছে।

তার মধ্যে সাহিত্যের কলমের ক্ষমতার দ্বারা মানব সভ্যতা পারস্পরিক বন্ধুত্বের প্রদীপ জ্বালাতে সক্ষম হতে পারে, এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

আজও আমরা বইমেলাতে এতো ভিড় দেখি, এখনো মানুষ নতুন বইয়ের গন্ধে মুগ্ধ হতে চায়, নতুন চিন্তাধারায় আলোকিত হতে চায়।

জীবন গ্রহন করলে কষ্ট গ্রহন করতে হবেই| সুখ দুঃখের ঊর্ধ্বে ওঠার চেস্টা করাই মানব জীবনের স্বার্থকতা| রিপু নিয়ন্ত্রণের প্রচেস্টা আমাদের আত্মবিশ্বাস আরো বাড়িয়ে দেয়| মানুষ যখন সাহায্য ছাড়া বাঁচতে পারে না তখন সাহিত্য মানুষের পাশে এসে দাঁড়ায়, মনে শক্তি যোগায়| জীবনের এই অদ্ভুত দৃষ্টিভঙ্গী যা যে কোনো সময় মানুষকে দুর্বল করে দিতে পারে সেখানে সাহিত্য এসে মানুষের হাত ধরে| সাহিত্য দর্শন জীবনের মূল উদ্দেশ্য খুঁজে বার করতে সাহায্য করে| কাব্য গ্রন্থ, কবিতা আমাদের মস্তিষ্ক ও শরীরের সঙ্গে এমন ভাবে জড়িয়ে আছে, যাকে জীবন থেকে বাদ দেওয়া অসম্ভব| আমাদের অস্তিত্ব’র মধ্যে দিয়ে ভূমণ্ডল কে চেনা সম্ভব এবং সেই অস্তিত্ব প্রখর করতে সাহিত্য আমাদের সাহায্য করে| সর্ব প্রকার ভাষা আমাদের শিক্ষা প্রদান করে থাকে। এমনকি ভাষাহীন সঙ্গীত তার সুরের মাধ্যমে আমাদের সঙ্গে কথা বলে যায়, আমাদের সঠিক শিক্ষা প্রদান করে যায়।

নিজ উপলব্ধি বৃদ্ধি করা ছাড়া এই জীবনের তাৎপর্য অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না, এবং সাহিত্যের সহযোগিতা ছাড়া এটা কখনই সম্ভব নয় বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। জীবনের গতি নানান প্রকারের হলেও, সেগুলো আসলে নানান মানসিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষের ওপর নির্ভর করে।

জীবনে ব্যাস্ততা এবং আনন্দ থাকলে মানুষ অনেক বেশি বাঁচতে পারে| সাহিত্য মস্তিস্কের বিকাশ ঘটায়। জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে মানুষের জীবন পরিপূর্ণ হয়| জীবনে যখন স্মৃতিগুলো ছাড়া নিজের বলে আর কিছুই থাকে না, তখন মনেই হয় যে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে দিয়ে নিজের অমরত্ব বজায় রাখার অনন্য উপায় হচ্ছে সাহিত্য। সাহিত্যই লেখকদের আজীবন বাঁচিয়ে রাখবে পাঠকদের মনে।

রইলে নাহয় তুমি বইয়ের পাতায়

রইলে নাহয় তুমি অক্ষরে ভাষায়

সাহিত্য সভায় রইবে তুমি ধ্রুবতারা হয়ে

জ্বলবে তুমি আজীবন মোদের প্রানের ছোঁয়ায়

অচিরে অন্তরে ভাবনার শৈকতে রইবে তুমি মনে প্রাণে কল্পনা শামুক হয়ে

বুদ্ধি দিয়ে ভবিতব্য বদলানো যায়না

সাহিত্য ছাড়া অন্তর প্রকাশ করা যায়না

তোমার প্রতিটি ঢেউ ছোঁবে বারংবার

জ্বালা বেদনা গ্লানি

ধুয়ে দেবে সবার

হ্যা সে পারবে আমায় নিয়ে যেতে দিগন্তের শেষে

মিলাবে মিশাবে মোদের

আদি অনন্তের মাঝারে

যদি শরীরের ওই হৃদস্পন্দনের ওপর বাঁচে জীবনের প্রতীটি আশা প্রত্যাশা,

তবে স্তব্ধ কর কাব্য,

স্তব্ধ কর গ্রন্থ,

তুলে নাও ঊর্ধ্বে মোরে যেথায়  বিকাশ ঘটবে সাবলীল ভাষার,

যেথায় জীবনের আত্মবিকাশ ফিরবে তবে

সাহিত্যে সংস্কৃতির মিলনসভায়।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading