লাগাতার দোল

দোলের পরেও দোল, এই বাংলাতেই হয়, এই সম্পর্কে আলোকপাত করলেন কিশলয় মুখোপাধ্যায়

পলাশ ফুলের রঙের ছটা মনে করিয়ে দেয় বসন্ত কাল উপস্থিত। ফাল্গুন ও চৈত্র বসন্তের এই দুই মাসের আগমনে মনটা নেচে ওঠে খুশিতে। কারণ ফাগুনের উৎসব ‘দোল’। অধুনা হোলী বৃন্দাবনের ফাগুয়া। আবীরের নানা রঙে রঙীন হয় আমাদের মন। সারা দেশের সাথে হুগলি জেলার গুড়াপ ও তার সংলগ্ন এলাকায় ছয় দিন ধরে রঙের উৎসবে মেতে ওঠেন সকল গ্রামবাসীরা। পূর্নিমার দিন গুড়াপের বেনাথলি পাড়ায় হয় রাধাবল্লভ জীউ’র দোল উৎসব। অপর দিকে প্রতিপদের দিন হয় নন্দদুলাল জীউর হোলি। পঞ্চমীর দিন গুড়াপ প্রাচীন বাজারের অধিকারী পাড়ায় হয় গোপীনাথ জীউ’র ফাগ উৎসব, অষ্টমীর দিন হয় তেলাকোনায় সতীমা’র আবীর খেলা। নবমীর দিন হয় গুড়াপ মাধের পাড়ায় গোপালের মোয়া কাড়াকাড়ির দোল উৎসব। আর রামনবমীর দিন হয় গুড়াপ তাম্বুলি পাড়ায় বাবা শ্রীধর জীউ’র দোল উৎসব।

এই সকল অনুষ্ঠানগুলির কিছু কিছু নিয়ম ও পুজো পাঠ একই রকম। প্রত্যেকটিতে দোলের আগের দিন ‘চাঁচড়’ বা চলতি কথায় ‘ন্যাড়াপোড়া’ হয়। যেমন গোপীনাথের দোলে পঞ্চমীর আগের দিন অধিকারীদের বাঁধা কীর্তন গান গাইতে গাইতে নারায়ণ শিলাকে স্বাক্ষী রেখে দলবদ্ধভাবে গ্রামের পূর্বদিকে একটি স্থানে যাওয়া হয়। যেখানে খড় ও বাঁশ দিয়ে হোলিকা মূর্তি তৈরী করা হয়। এই মূর্তিকে অনেকে তৃণাবর্তাসুর বলে থাকেন। একে পোড়ানো হয়। কতকটা দিল্লীর রামলীলা ময়দানের রাবণ বধের ছোট সংস্করণ। অশুভ শক্তির বিনাশের জন্য এটি করা হয়। এইভাবে বাকী দোলগুলিতেও আগের দিন নিজ নিজ পাড়ার পুকুরের পাশে চাঁচড় উৎসব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয়। চাঁচড় উৎসব পালনের পর কীর্তন গাইতে গাইতে সকলে মিলে ফিরে আসে। দোলের দিন ভোরবেলা অনুষ্ঠিত হয় দেবদোল ও পূজাপাঠ। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য সতীমায়ের দোলে দেবদোল হয় না। পূর্ণিমার দিন বেনাথলিতে ভোরবেলা পূজাপাঠের পর রাধাবল্লভ জীউ’র দোল খেলা শুরু হয়। এখানকার উৎসবটি চট্টোপাধ্যায় বংশের। তবে বর্তমানে এটি পাড়ার উৎসবে পরিনত হয়েছে। সকালে রঙ খেলার পর রাধাবল্লভকে নিয়ে যাওয়া হয় চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ীতে। এরপর হয় ভোগারতি, তারপর পার্শবর্তী শিবমন্দিরে স্থাপন করা হয় প্রতিমাকে। এই উৎসব উপলক্ষে এখানে একটি মেলাও বসে। আবার রাত ন’টা নাগাদ আবীর খেলতে খেলতে মূল মন্দিরে নিয়ে আসা হয় রাধাবল্লভকে। এই সময় সাত থেকে নয় বার দাঁড়ানো হয়। তবে কেন এই যাত্রাপথের মাঝে মাঝে বিরতি তার কারণ কেউ বলতে পারেন না। বহু প্রাচীন কাল থেকেই এই প্রথা চলে আসছে। এরপর অভিষেকের পর উৎসব সমাপ্ত হয় ।

প্রতিপদের দিন দোল খেলতে যেতে হবে নাগ পাড়ায় শ্রীশ্রী নন্দদুলাল জীউ’র মন্দিরে। সকালে যথারীতি পূজার পর শুরু হয় দোল খেলা। দুপুরে মালসাভোগ দেওয়া হয়। সন্ধ্যবেলা ভাবগম্ভীর ঢল নামে এদিন এখানে। আগে মাটির পরিবেশে পরিবেশিত হয় হরিনাম। রাস্তা থাকাকালীন পরদিন সকালে তা এখানে আবির খেলার মাঝে পরিণত হত আবিরের রাস্তায় ৷ অনুষ্ঠান নন্দদুলালকে জলপানি দেওয়ার নিয়ম শেষ হতে হতে প্রায় রাত দু’টো বেজে রয়েছে। দোল খেলার পর মন্দিরে যায়, তারপর বিতরণ করা হয় ঢোকার সময় মন্দিরে দরজায় গোপীনাথের ভোগ। আটকানো হয় নন্দদুলালকে। তবে অষ্টমীর দিন যদি কেউ দোল খেলতে গুড়াপ মাঝের পাড়ায় নবমীর দোল। রাধারাণীর অনুমতি নিয়ে তবেই মন্দিরে ঢুকতে পারেন নন্দদুলাল জীউ। পুনরায় নাটমন্দিরে ফাগের ভৎসবে মেতে ওঠেন সকলে। এই সময়ে নন্দদুলালকে যে কেউ কোলে নিতে পারে। বছরে এই একবারই নন্দদুলাল ও রাধারাণীকে স্পর্শ করতে পারেন যে কেউ। এরপর অনুষ্ঠিত হয় অভিষেক। তারপর অন্নভোগের পর নন্দদুলাল ও রাধারাণীকে সিংহাসনে বসিয়ে দেওয়া হয় লুচি ও মোহনভোগ। এরপর তাদেরকে শয়নকক্ষে শয়নের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। অনান্য স্থানে দোল পূর্ণিমার দিলেই শুধুমাত্র দোল খেলা হয়। কিন্তু গুড়াপ বাসীদের পূর্ণিমার দিন সবে শুরু হ’ল।

এরপর পঞ্চমীর দিন দোল খেলতে হলে যেতে হবে গোপীনাথ জীউ’র মন্দিরে। কথিত আছে মথুরেশ গোস্বামী যে সব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার মধ্যে এই মন্দিরটি অন্যতম। শান্তিপুরের অধিবাসী বড় গোস্বামী বাড়ীর নিয়মানুসারে এই উৎসব হয়। ভোরবেলা যথারীতি একই নিয়মের পর শুরু হয় দোল উৎসব। সকাল ১১টা পর্যন্ত রঙের উৎসব চলে। তারপর বেলা ১২টা নাগাদ শোভাযাত্রা সহকারে দেবদেবীর মূর্তি জয়চন্ডী মন্দিরের কাছে দোল মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকালে এই উপলক্ষে একটি মেলা বসে এখানে। সন্ধ্যাবেলা গোপীনাথ প্রস্তুত হোলি খেলার জন্য। নারায়ণ শিলাকে নিয়ে আসা হয় মূল মন্দিরে। ওদিকে গোপীনাথ ও রাধারাণী জণসাধারণের সাথে আবির খেলতে খেলতে কীর্তণের মুচ্ছর্ণায় ফিরে আসেন মন্দিরে। এ দৃশ্য সত্যিই দেখার মত। অনেক জনগণের চান তবে তাঁকে যেতে হবে তেলাকোনায় সতীমার দোলে। আগে এখানে জাঁকজমক সহকারে মেলা বসত, তবে এখন জমক অনেকটা কমে গেছে । শুধু রয়ে গেছে প্রথা। নবমীর দিন দোল খেলা হয় গুড়াপ মাঝের পাড়ায় গোপালের মোয়া কাড়াকাড়ির দোলে। এরকম নামের উৎস সন্ধানে জানা গেল প্রাচীন কালে গোপাল ও রাধারাণীর যুগল মূর্তি ছিল এখানে। চুরি হয়ে যায় মূর্তি দুটি। কিছুদিন বাদে গোপালের মূর্তিটি পাশের এলাকা থেকে পেলেও রাধারাণীর মূর্তিটি আর পাওয়া যায় নি। পুনরায় মূর্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে গোপালের স্বপ্নাদেশ হয় রাধারাণীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে না । তখন থেকে মোয়া কাড়াকানির প্রথাটি চালু হয়। তবে বর্তমানে মোয়া তৈরীর দক্ষ কারিগরের অভাবে নারকেল দিয়ে প্রথাটি চালু আছে। পাড়ার প্রবীণরা বলেন, সে এক ছিল মোয়া কাড়াকাড়ির দৃশ্য, সে দিন আর এখন কোথায় ? না এখানেই গিরি গোবর্ধনের ফাগ উৎসবের এখানেই ইতি নয়৷ রামনবমীর দিনে শ্রীধর জীউ’র হোলি অনুষ্ঠিত হয়।

বর্তমানে নানা পরিস্থিতির চাপে পড়ে রঙ খেলা ক্রমশ কমছে। নেই অতীতের সেই বসন্তের আমেজ। সাধারণ মানুষের মনের রঙ ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। এটাই বাস্তব। গুড়াপও এর ব্যতিক্রম নয়। তার মধ্যেই আশার আলো গুড়াপে দোল উৎসবের সেই ট্রাডিশন আজও সমানে চলছে।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading