আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগে মফস্বল শহরের এক সাপ্তাহিক পত্রিকার পাতায় আবির্ভাব হয়েছিল শ্রীমান বুচুর। স্বভাব ক্রিটিক বুচু সেই সময়ে রীতিমতো আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলো সেই মফস্বল শহরে। কারনটা আর কিছুই নয়, সেই শহরে অনুষ্ঠিত এক মেলার সাংস্কৃতিক মঞ্চের অনুষ্ঠানের রসালো সমালোচনা। সেই শহরের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত সকলের তখন একটাই প্রশ্ন, কে এই বুচুর সৃষ্টিকর্তা? বহুবছর অন্তরালে থাকার পর আমাদের অনুরোধে বুচুর সৃষ্টিকর্তার হাত ধরে আবারও আবির্ভাব শ্রীমান বুচুর। বুচু এখন অনেকটাই পরিণত। আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই একসময়ের হুগলি জেলার অন্যতম সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘যোগাযোগ’ কে। আর পাঠককুলের উদ্দেশ্যে জানাই আগামীতে আপনারা বুচুকে কি রূপে দেখতে চান আমাদের লিখে জানান।
ফেবু এবং বুচু
পার্থ প্রতিম মজুমদার
আসুন বুচুর সঙ্গে আপনাদের আলাপ করিয়ে দিই।
শ্রীমান বুচু হল ভ্যাগাবন্ড ও কনফার্মড ব্যাচেলর। বুচুর জন্ম ক্রিটিক লগ্নে, অনেকটা চোখে আঙ্গুল দাদার মতো। বুচুর সেরকম কোন আয়ও নেই তেমনি কোন অভাবও নেই। বুচুর লেজাও নেই মুড়োও নেই যাকে বলে ঝাড়া হাত-পা।
এহেন বুচুর বিশ্বাস শিল্পকলার সব ক্ষেত্রেই সে পারদর্শী।
বুচুর একটা ঠেক আছে, ভোলাদার চায়ের দোকান। পাড়াটা পুরোনো,তাই শহরের মধ্যে হলেও পাড়া পাড়া ভাবটা এখনও যায়নি। খেলাধুলো থেকে রাজনীতি প্রায় সবকিছুতেই সে ভোলাদার চায়ের দোকানের নড়বড়ে টেবিল চাপড়ে ক্রিটিক হয়ে দু একবার মার খাবার প্রবল সম্ভাবনা থেকে ছাড় পেয়ে গেছে। শুধুমাত্র তার ৫২ কেজি ওজনের জন্য, মারবে আর কোথায়?
ভোলাদার চায়ের দোকানের এই ঠেকে ক্রমশঃ বোর হতে হতে হটাৎই বুচু সন্ধান পেলো ভার্চুয়াল ঠেকের। ফেসবুকের। আহা, আহা, এতদিন কোথায় ছিলে দাদা। এখন তার একটাই কাজ, সারাদিন ফেবু চালিয়ে বসে থাকা, আর ফ্রিতে মজা নেওয়া। এককথায় বুচু এখন ফেবু পাগল।
আহা কত পাগল, কত আধপাগল, ফ্রাস্ত্রেটেড দুমদাম দামড়া মুখের ছবি দিয়ে দেয়। আর কিছু পাবলিক আছে যারা নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে লাইক দেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে, যেন কেবা আগে প্রাণ করিবেক দান, এইরকম ভাব।
এরা যে কি জিনিস, সেটা বুচু ভালো করেই জানে। দুঃসংবাদ, মারা গেছে, তাতেও লাইক। তার মানে বেশ হয়েছে। মরে গেছে। যা কলা, এদের কি সব লাইক লগ্নে জন্ম!
বুচুর কাছে ফেবু একটা মহাসমুদ্র। আহা কত কিছুই ভেসে ওঠে ফেবুর পাতায়। একটার পর একটা ঢেউ আছড়ে পড়ছে, আর ভেসে উঠছে অগুনতি মনিমানিক্য।
কেউ পোস্তর বড়া রাঁধলেন। হাসি হাসি মুখে ছোট্ট ছোট্ট দুটো বড়ার সঙ্গে স্মাইল আর ক্যাপশন, “মিনি বড়ার রেসিপি”। যদি ফ্রেন্ড বেশী হয় তাহলে ঝড়াৎ করে নশো লাইক, ছশো কমেন্টস। আর ঝাঁপিয়ে পড়বে সব পোস্ত বিশেষজ্ঞরা।
কেউ নয় বছর আগে পাঁচমারি গিয়েছিলো। ফেবুর বাজারটা একটু ডাল যাচ্ছে তার। হালকা করে ভাসিয়ে দিলো সেই সব ছবি। আর যায়, আহা,উহু, উরিব্বাস, কেয়াবাত একেবারে হৈ হৈ ব্যাপার।
বুচু দেখে, দেখে, দেখতেই থাকে। ছোট্ট ডিঙি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সমুদ্রের বুকে।
সাংস্কৃতিক গন্ধমাখা প্রোফাইলের জন্য ফেবুতে বুচুর বন্ধুর সংখ্যা নেহাত কম নয়। তবুও সাবধানে পা ফেলতে হয়। টুকটাক লাইক আর সামান্য কিছু কমেন্টস দিয়েই চালিয়ে যায়।
এটুকু না করলে নাকি ফেবুতে মেম্বারশিপ রাখা যায় না।
তবে ওই যে জন্ম ক্রিটিক। একবার কিছুতেই লোভ সামলাতে পারছিলো না। এক ভদ্রমহিলা আদিখ্যেতা করে ছবি দিলেন ইলিশের – “আমার বেয়ান বাড়ির খোকা ইলিশ”। লিখতে যাচ্ছিলো, আর কি আপনি বেয়ানকে খোকা ইলিশ খাওয়ালেন না ধেড়ে ইলিশ খাওয়ালেন, তাতে আমাদের কি।
ফেসবুকে সব থেকে বেশি ফুটেজ খায় তো সেলেবরা। কার টয়লেটের কমোডের রং অলিভ গ্রীন, কার ঠাকুরঘরে কটা ঠাকুর, কে জল দিয়ে লেবু খায় না লেবু দিয়ে জল খায়, সব কিছু মুখস্থ সবার ফেবুর দৌলতে। আর যে হারে সেলেব সংখ্যা বাড়ছে, বুচু মাঝে মাঝে ভাবে সেও না একদিন সেলেব হয়ে যায়।
কেউ আবার বিবাগী উদাস দার্শনিকের মতো কিছু কোটেশন টুকলি করে টুক করে পোস্ট করে বসে থাকে বিড়াল তপস্বীর মতো।
ভালো লেখা, ভালো পোস্ট মাঝে মাঝে আসে, তাতেও চাপ। কোন পক্ষের কে লিখলেন মেপে বুঝে কমেন্টস করতে হবে। আরে বাবা, ফেবুতে “আমরা ওরা” বেশ ভালোই চলে। কেনরে বাপু ভালোর আবার পক্ষাপক্ষি কি? থাকবে থাকবে ফেবুতো আর দেশের বাইরে নয়।
স্বভাবদোষে বুচু আবার বোর হতে শুরু করলো। একঘেয়ে, পানসে লাগছে তার। ঘাঁটছে ঠিকই, কিন্তু মজা পাচ্ছে না। প্রতিদিনই অজস্র গান, কবিতা, নাটক ভেসে ওঠে ফেসবুকের পাতায়। ওগুলোর দিকে আর তাকায় না। পূর্বাশ্রমের তিক্ত স্মৃতির কথা মাথায় রেখে এড়িয়ে যায়। না হলে জম্পেশ করে ভার্চুয়াল কাঠি মানে সমালোচনা করার ইচ্ছে যে হয় না তা নয়। ফেবুতে আর যাই হোক দলবেঁধে মারতে তো আসবে না। বড়জোর ব্লক লিস্টে ফেলে দেবে এই আর কি।
ফেবু থেকে বেড়িয়ে আসবে আসবে করছে হঠাৎই একটা পোস্ট বুচুকে আটকে দিলো। বুচুর কোনও বন্ধু বান্ধব নেই। থাকার কথাও নয়। ওর বয়সী সবাইই সেই কবেই বিয়ে থা করে সংসার জীবনে আর কর্মজীবনে ব্যস্ত।
প্রকাশের ছবি দিয়ে একজন পোস্ট করেছেন, প্রকাশের কঠিন রোগ, অনেক টাকা দরকার। প্রকাশ বুচুর স্কুল জীবনের বন্ধু। চিনতে পারলো মুখটা। বয়স আর রোগের প্রকোপে যেটুকু পাল্টায় পাল্টেছে।
এরকম পোস্ট যে আগে আসে নি তা নয়। কিন্তু আর পাঁচটা পোস্টের মতো একটু থেমে, থমকে, আবার পরের পোস্টে এগিয়ে গেছে। কিন্তু আজ প্রকাশ বলেই কি থমকালো। কতই বা বয়স, ওরই তো বয়সী। কঠিন খুব কঠিন রোগ, অনেক টাকা দরকার, কিন্তু কি ভাবে?
ফেবুর জীবনে কোনোদিন যা করেনি, বুচু আজ তাই করলো। প্রথমে অনেককে শেয়ার করলো। তারপর নিজে একটা পোস্ট করলো মন থেকে, একদম কৈশোরের আবেগটা সাহায্যের আবেদন।
অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য, যাঁদের নিয়ে বুচু মনে মনে মজা করতো, ঠাট্টা করতো। তাঁদের মধ্যে কতজন কতভাবে এগিয়ে এলো সাহায্যের জন্য।
বুচুর চোখের সামনে কুয়াশার জাল কেটে আলোর ইশারা এসে পৌঁছোলো। যে ফেসবুক ছিল বুচুর খেনলা পিস্তল, সেই ফেসবুকই হৃদয়ের রঙে ভক্তি পিচকারি হয়ে গেলো। প্রকাশের কাছে অনেকটা না হলেও বেশ কিছুটা অর্থ পৌঁছে দিতে পারলো এই ভার্চুয়াল মাধ্যমেই।
অনুশোচনা আর তৃপ্তিতে ভরে গেলো মনটা। বুচুর মতো ভ্যাগাবন্ডও কাজ পেয়েছে কাজ। প্রথম কাজ ভালো করে দেখতে শেখা। আর “এলিয়েন” এর মাঝে লুকিয়ে থাকা মানুষগুলিকে খোঁজা।
বুচু বুঝতে পারলো, ফেসবুক আর কিছুই নয় এক মহাসমুদ্র। যে সমুদ্রমন্থনে গরল আছে আর অমৃতও আছে।
খোঁজো খুঁজে চলো অমৃতকে
মন্থন করো মহাসমুদ্র।

