যে পুজোয় একসময়ে সিংহকে ব্যাটারির সাহায্যে হাঁ করিয়ে তার মুখের মধ্যে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা করানো হত

কিশলয় মুখোপাধ্যায়: সময়টা তখন ৬ বছর হল আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। বিজয়া দশমীর গোধূলী বেলায় গ্রামের একটি শখের যাত্রা দল মুক্তকেশী বান্ধব নাট্য সমিতির বারান্দায় বসে আছে একদল তরুণ। চলছে দুর্গাপুজোর নিরঞ্জনের শোভাযাত্রা। এই সময় সেই তরুণ দলের মনে হল এই  পাড়াতে কোন বারোয়ারি পুজো হয়না। একটি বারোয়ারি পুজোর আয়োজনের ইচ্ছা হলেও দুর্গাপুজোতো হয়ে গেল। তখন সমবেত ভাবে ঠিক হল হেমন্তের দুর্গাপুজো অর্থাৎ জগদ্ধাত্রী পুজো করা হবে। মার্কণ্ডেয় পুরাণে বলা হয়েছে দুর্গা ও জগদ্ধাত্রী অভিন্ন। তাই দেবী পূজিত হন ‘ জগদ্ধাত্রী  দুর্গায় নমঃ’ মন্ত্রে।

নবাবের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নদী পথে ফেরার পথে রুকুনপুরের ঘাটে শুনলেন বিসর্জনের বাদ্যি। দিনটা ছিল বিজয়া দশমী। সেই রাতে ওই নৌকাতেই মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি শুরু করলেন জগদ্ধাত্রী পুজো। এ এক আশ্বর্য কাকতালীয় মিল। এখানেও সেই তরুনদল ঠিক করেছিল দেবীর জগদ্বাত্রীর আরাধোনা করবে, সেদিনও ছিল বিজয়া দশমী। দশমীর পর থেকে সময় হাতে বেশিদিন ছিলনা, কিন্তু ছিল অফুরান উৎসাহ, দৃঢ় সংকল্প আর উদ্যোম। সেই তরুনদল এবং পাড়ার সবাই পুজো করলেন ‘উমা হৈমবতী’ দেবীকে। উপনিষদে জগদ্বাত্রীকে এই নামেই ডাকা হয়েছে। সেই থেকে আজও পুজো হয়ে আসছে হুগলি জেলার গুড়াপের মাঝেরপাড়ায়। এবারের এই পুজো উদ্বোধন করলেন গুড়াপ থানার ও.সি. প্রসেনজিৎ ঘোষ ।

এই জগদ্ধাত্রী পুজো যখন শুরু হয় তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিলনা, কিন্তু ছিল আলোর খেলা বা ‘লাইটিং’। ব্যাটারীর সাহায্যে জ্বালান হত এই আলো। কিছু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন প্রতিমার মাথার পেছনে আলোর চক্র ঘুরতো। পাহাড়, পর্বত, জঙ্গল সাজিয়ে তার মধ্যে বসানো হত মাটির পশুরাজ সিংহ। সিংহকে ব্যাটারির সাহায্যে হাঁ করিয়ে তার মুখের মধ্যে আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা করানো হত। এছাড়া ছিল বাঘের গর্জন। আজকের দিনে এই স্মার্ট ফোনের যুগে ব্যাপারটা ঠিক উপলব্দি করা যাবেনা, কিন্তু একটি বিদ্যুৎহীন গ্রামে এরকম ‘লাইটিং’ ছিল প্রচণ্ড কৌতুহলের বিষয়। আশপাশ ও বহুদূর গ্রাম থেকে আসতো আলোর এই ঝর্ণাধারা দেখতে।

স্মার্তপণ্ডিত রঘুনন্দন তাঁর ‘দুর্গোৎসব’ বইতে লিখেছেন যে শুক্লানবমী তিথিতে সকালে সাত্ত্বিকী, দুপুরে রাজসিকী ও বিকেলে তামসিকী এই ত্রিকালীন পুজোই শ্রীশ্রী জগদ্ধাত্রী পুজো। এই পুজোয় নবমীর দিন সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী পুজো আর পরেরদিন দিন হয় দশমী পুজো এবং বিসর্জন। সোম থেকে রবি যে বারেই পরুক সেই দিনই প্রতিমা বিসর্জন হয়। তাই সর্বজনীন পুজো হলেও বাড়ির পুজোর আমেজ জড়িয়ে থাকে এই পুজোয়।

দেবী জগদ্ধাত্রী পশুরাজের কাঁধে বসে রয়েছেন। সালাঙ্কারা দেবীর গলায় ঝুলছে নাগযজ্ঞোপবীত। দেবী চতুর্ভুজা। চার হাতে রয়েছে শঙ্খ, চক্র, ধনুক ও তীর। প্রভাতের সূর্যের মতো তাঁর গায়ের রঙ। পুরাণে এই রূপ বর্ণনা করা হয়েছে। ডাকের সাজের এই প্রতিমাটি পুরাণের বর্ণিত রুপটিকে অনুসরণ করার চেষ্টা করা হয়। অতীতে মাটির ছাঁচে তাতে রাংতা দিয়ে প্রতিমার গয়না হতো।

দেবীকে মোহনভোগ অর্থাৎ লুচি ও সুজি ভোগ নিবেদন করা হয়। এছাড়া অন্যান্য নৈবেদ্য ও ফল থাকে। এখন ফাংশান হয়, হয় পঙক্তি ভোজন তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল নিরামিষ মেনু হয়। নিরঞ্জনের শোভাযাত্রাও হয় চিত্তাকর্ষক। বিসর্জন হয় যে পুকুরে তার নাম আহিরী।

error: Content is protected !!

Discover more from Sambad Pratikhan

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading